আন্টার্কটিকায় পাড়ি দেওয়া প্রথম ভারতীয় নারী এই বঙ্গসন্তান

পর্বতারোহণেও তিনি কৃতিত্বের অধিকারী

সেই ৮০-র দশকের কথা। তখন বাঙালির ঘরে ঘরে আড্ডায় আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসত সুদীপ্তা সেনের নাম। প্রথম বাঙালি এবং যুগ্মভাবে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে তিনি পা রেখেছিলেন পৃথিবীর দক্ষিণতম মহাদেশ আন্টার্কটিকায়। এখনকার দিনের চেয়ে সেই সময়ে ঘরের বাইরে কর্মজীবনে অংশগ্রহণ করা মেয়েদের সংখ্যা ছিল অনেক কম। ওই পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি বিশ্বের দুর্গমতম, উচ্চতম, শীতলতম, শুষ্কতম, তথা নির্জনতম মহাদেশে পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন।

 
সুদীপ্তা সেনগুপ্তের জন্ম হয়েছিল মহানগর কলকাতায়। তাঁর বাবা ছিলেন একজন আবহবিদ। বাবার কর্মসূত্রে সুদীপ্তার ছোটোবেলায় অনেকটা সময় কেটেছে নেপালে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন সুদীপ্তা। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরের পরীক্ষায়। ১৯৭২ সালে লাভ করেন ডক্টরেট ডিগ্রি। পোস্ট ডক্টরেট গবেষণা করেছিলেন লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজে। ইন্টারন্যাশানাল জিওডায়নামিক্স প্রজেক্ট এবং সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। গবেষণা করেছেন ভারতীয় ভূবৈজ্ঞানিক সর্বেক্ষণ বা জিএসআই-তে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন স্ট্রাকচারাল জিওলজির অধ্যাপনা করেছেন। 

অল্প বয়স থেকেই পর্বতারোহণে তাঁর আগ্রহ ছিল। ১৯৬২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর রক ক্লাইম্বিং শিখেছিলেন। স্নাতকোত্তর পড়ার সময়ে হিমালয়ান পর্বতারোহণ সংস্থান ও নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং নামে ভারতের দু’টি সেরা পর্বতারোহণ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন । পিএইচডি শুরু করার আগে হিমাচল প্রদেশের একটি অনামি শৃঙ্গ জয় করেন তিনি। সেই পর্বতশৃঙ্গের নাম রাখা হয় ললনা। 

সুদীপ্তা প্রথমবার আন্টার্কটিকা পাড়ি দেন ভারতের তৃতীয় অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে। সেবারই দু’জন ভারতীয় মহিলা আন্টার্কটিকায় পা রেখেছিলেন। সুদীপ্তা সেনগুপ্ত এবং অদিতি পন্থ। গোয়া থেকে তাঁদের জাহাজ ছেড়েছিল ১৯৮৩ সালের ৩ ডিসেম্বর। জাহাজটি ছিল ফিনল্যান্ডের, নাম ‘ফিনপোলারিস’। আর ১৯৮৪-র ২৯ মার্চ ফিরে আসেন ভারতে। আন্টার্কটিকায় ভারতের প্রথম রিসার্চ স্টেশন ‘দক্ষিণ গঙ্গোত্রী’ তৈরি হয়েছিল সেবারই। আইসশেলফের ওপর বানানো সেই স্টেশন অবশ্য ধীরে ধীরে ডুবে যায় বরফে। ১৯৮৮ সালে আন্টার্কটিকার শির্মাকার পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠে ভারতের পরবর্তী রিসার্চ স্টেশন ‘মৈত্রী’। ভারতের নবম অভিযানে আবার কুমেরু যান সুদীপ্তা। সুইডিশ জাহাজ ‘থুলেলান্ড’-এ চড়ে যাত্রা শুরু করেন ১৯৮৯-এর ৩০ নভেম্বর। ফিরে আসেন পরের বছর ২৭ মার্চ। প্রথমবারের আন্টার্কটিকা যাত্রায় পুরোপুরি খুশি ছিলেন না সুদীপ্তা। আরেকবার কুমেরুতে গিয়ে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে আসেন।

ভারত সরকার সুদীপ্তা সেনগুপ্তকে ভূষিত করেছে আন্টার্কটিক পুরস্কার এবং ন্যাশানাল মিনারেল পুরস্কারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন ভাটনগর পুরস্কার। ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল সাইন্স অ্যাকাডেমির ফেলো হয়েছেন। এছাড়াও বেশ কিছু পুরস্কার এবং সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন সুদীপ্তা সেনগুপ্ত।
 

Developed by DXDasia