
উত্তরবঙ্গের এক গোপন স্বর্গ
আকাশটা ঘন নীল সোয়েটার পরে থাকে এই গ্রামে। মাঝেমাঝেই জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে কুয়াশার পাল। জানলার ওইপারে খাদ। এক পাহাড়ের কোলে এসে শুয়েছে অন্য পাহাড়। ছোট্ট ছবির মতো সাজানো হোম-স্টের বাইরে পা রাখলেই মনে হবে, এমন শান্ত জায়গা আজো আছে পৃথিবীতে? এ যেন এক লুকোনো স্বর্গ। তামাং গাঁও।

সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের বুকে একটা ছোট্ট গ্রাম। উচ্চতা সাত হাজার ফুটের বেশি। হোটেল তো ছেড়েই দিন, হোম-স্টের ভিড়ও এখানে মিলবে না। কোলাহলহীন এক টুকরো উপত্যকা যেন অপেক্ষা করে ছিল আপনি আবিষ্কার করবেন বলেই। এই গ্রামে সকালে ঘুম ভাঙায় পাহাড়ি ঝরনার শব্দ। তাকে সঙ্গত করে হিমালয়ের অসংখ্য পাখির ডাক। জবথবু শীতে জানলার পাল্লা খুলতেই ঘরে ছোটাছুটি শুরু করে সোনালি রঙের রোদ। বাইরে তখন সবুজ আর পাহাড় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
তামাং গাঁও খুব প্রিয় আত্মীয়ের মতো আপনাকে কাছে টেনে নেবে। তামাং গোষ্ঠীর মানুষদের বাস এই গ্রামে। তাঁদের পেশা চাষবাস। সারা বছরই তাই নানা ফসলে ভরে থাকে এই পাহাড়ি গ্রাম। আর ভরে থাকে পাহাড়ি মানুষদের উপত্যকা উজাড় করা হাসিতে, সারল্যে… শরতের পর থেকেই রোদটা ঘুরতে শুরু করে। বনের গাছ-গাছালিতে পাতা ঝরা শুরু হয়। বসন্তে রডোডেনড্রন গাছে ফুল আসে। পাহাড়ি মানুষগুলো একইভাবে বয়ে চলেন তুলো-মেঘের মতো। শীত বাড়লে আগুন পোহাতে পোহাতে সেই কোন আদিম সখ্যের আলপনা আঁকেন তালুতে তালু জুড়ে জুড়ে। দূরে তখন পাহাড়ের গা জুড়ে আলোর জোনাকি মিটমিট করে জ্বলছে।

যারা টুরিস্ট স্পটের ভিড় এড়িয়ে পাহাড়ে প্রাণভরে শ্বাস নিতে চান, তামাং গাঁও তাদের হাতছানি দেবেই। পায়ে হেঁটে না ঘুরলে এই গ্রামের সবটুকু মায়া ধরাও দেবে না। এখান থেকে সান্দাকফু একদিনের হাঁটাপথ। চাইলে পায়ে হেঁটেই ঘুরে আসতে পারেন তিনতালে জঙ্গল। হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়বে নাম না-জানা পাখি, বুনো ফুল, নীল ফড়িং। প্রতিটা বাঁকে বদলে বদলে যাবে দৃশ্য। গ্রাম ছাড়িয়ে খানিকটা উঠলেই আকাশ জুড়ে শুয়ে আছেন ঘুমন্ত বুদ্ধ। কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখতে চাইলে অবশ্য ভোরে যাওয়াই ভালো।
ভারি নরম এক আতিথেয়তায় আপনাকে বাঁধব এই গ্রাম। শীত এখানে চিরস্থায়ী। শীতকালে পারদ নেমে যায় মাইনাস ২-৩ ডিগ্রিতে। তবে, গ্রীষ্ম ও শরতে তামাং গাঁও বড়ো আরামদায়। তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করে ১০-২০ ডিগ্রির মধ্যেই। মাঝেমাঝে হঠাৎ ঘিরে ধরে কুয়াশা। তখন এই গ্রামকে দেখতে লাগে জাপানি জলরং পেইন্টিং-এর মতো।

চাইলে গ্রাম থেকে গাড়িতে ঘুরে আসতে পারেন ধোত্রে, চিত্রে, লামাধুরা, মেঘমা, টংলু। সিরি খোলা, মুংমুংখোলা, হ্যাংগিং ব্রিজ, রিমবিক মোনাস্টারি কিংবা গুম্ববা দাঁড়া ভিউ পয়েন্টও খুব দূরে নয়। এছাড়া, গ্রাম থেকে সামান্য বেরোলে পায়ে হাঁটা অজানা পথের হাতছানি তো আছেই।
আর আছে অপার শান্তি, ঘোর বুনে দেওয়া হাওয়া এবং হিমালয়। একবার গেলে তামাং গাঁও-এর নেশা আপনাকে ছাড়বে না কিছুতেই।

কীভাবে যাবেন?
ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি। স্টেশনের সামনে থেকেই মিলবে গাড়ি। বিমানে বাগডোগরা, সেখান থেকেও গাড়ি রিজার্ভ করে আসা যাবে এই গ্রামে। দার্জিলিং থেকেও শেয়ার গাড়ি পাওয়া যাবে।
কোথায় থাকবেন?
তামাং গাঁওতে থাকার জায়গা বিশেষ নেই। আছে একটি হোম-স্টে। ‘ফ্রি সোল’স স্টে’-তে থাকা-খাওয়া একইসঙ্গে। প্রাতঃরাশ, লাঞ্চ, সন্ধের জলখাবার, ডিনার আর চা/কফি ধরা থাকে প্যাকেজে। যোগাযোগ- ৯০৩৮৬৯৫৩০৮, ৯০৩৮২৩০২৫৩।
কখন যাবেন?
বর্ষা বাদে যে-কোনো সময়ে।
কী কী দেখবেন?
পায়ে হেঁটে গোটা গ্রাম। এছাড়া গাড়ি নিয়ে ধোত্রে, চিত্রে, লামাধুরা, মেঘমা, টংলু, সিরি খোলা, মুংমুংখোলা, হ্যাংগিং ব্রিজ, রিমবিক মোনাস্টারি কিংবা গুম্ববা দাঁড়া ভিউ পয়েন্ট।
