কোকুবুরু, শাল, পলাশরাজা আর একটা অলীক ক্যাম্প

সোনকুপির এই ক্যাম্পে গেলে নেশা ঘিরবেই

বাইরে তখন অকাতরে জ্যোৎস্না লুটোচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে ছৌনাচ। সিংহ, ময়ূর, কার্তিক, গণেশ, দুর্গা, অসুর। সঙ্গে গায়েন ও বাজনাদারের দল। সমস্ত শব্দ থেমে যাওয়ায় চারপাশ থেকে ফের উজিয়ে উঠছে ঝিঁঝিঁর ডাক। ক্যাম্পের মধ্যে বিরাট খোলা চত্বরে পাতা চাটিয়ায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বাইরে তাকালেই কেমন ঘোর লেগে যাচ্ছে। একথালা চাঁদের আলোয় এখনো দিব্বি দেখা যাচ্ছে সামনের কোকুবুরু পাহাড়। ক্যাম্পের বাইরে গা ছমছমে সেই জঙ্গলের পথটা। এই রাতে বাইরে যাওয়া বারণ। এমন সব রাতেই বোধহয় পরিরা নেমে আসে বন-পাহাড়ের মাটিতে।

পুরুলিয়ার সোনকুপি বানজারা ক্যাম্পে এমন সব ম্যাজিকের জন্ম হয় প্রায়শই। দিনে-রাতে সবসময়। বরাভূম স্টেশন থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে সোনকুপি গ্রাম। পথে যেতেই নজরে পড়বে ‘টাইগার মোড়’-এর মতো নাম। ড্রাইভার দাদা জানাবেন, স্থানীয়রা বলেন এটা নাকি বাঘের মামাবাড়ি। লোককথা আর চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতেই আপনি কখন পেরিয়ে যাবেন পাখিপাহাড়। খানিকটা পরেই পিচের রাস্তা থেকে একটা লাল মাটির পথ বেঁকে গেছে ডানদিকে। সেই পথ ধরে আরো কিলোমিটার দেড়েক ভিতরে ঢুকলে মাঠা বনের ভিতরে একটা বিশাল ক্যাম্প। ৬ বিঘে জায়গা নিয়ে অসংখ্য তাঁবু। সামনেই কোকুবুরু পাহাড়। তার একপাশে মাঠাবুরু। অযোধ্যা পাহাড়-সারির ভাঁজ শুরু হয়ে গেছে এখান থেকেই। ক্যাম্পের ঠিক বাইরেটা থেকেই বন। আর বনের মাঝে পায়ে হাঁটা পথ। ক্যাম্পে ঢোকার মুখে সেই উঁচু-নিচু ঢালবাহারি পথের মাঝে কোথাও ফাঁকা মাঠ, কোথাও শালগাছের সারি। বন্য নির্জনতা এক্কেবারে জড়িয়ে রেখেছে গোটা ক্যাম্পকে।

সব ছেড়ে হঠাৎ একটা বিশেষ ক্যাম্পকে নিয়ে কথা কেন? এই ক্যাম্পে এলেই উত্তরটা খোলতাই হবে। পুরুলিয়ার মাদকতা যেন উজাড় হয়েছে এখানে। ক্যাম্পের ভিতরে পলাশ আর কুলগাছের সারি। এখন ভরা বসন্তে পলাশ যেন রং লেপে দিয়েছে গোটা চত্বরে। মাঝখানে খোলা বিশাল জমিকে বেড় দিয়ে তাঁবু। লাক্সারি তাঁবুর সংখ্যা ২২টি। রয়েছে দুটি কটেজও। রাজকীয় হোটেল বা রিসর্টের বিলাসবহুল আমেজের চাইতে একদমই আলাদা এই ক্যাম্প-যাপনের স্বাদ। প্রকৃতিতে লেপ্টে থেকে বন, পাহাড়, পলাশের মাঝে তাঁবুতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা মুখে বলে বোঝানো যাবে না।

বিশাল চত্বরের এককোণে রান্নাঘর ও খাওয়ার জায়গা। ক্যাম্পের নিয়ম অনুযায়ী সবার জন্য একই মেনু। মাঝে একটি বেঞ্চিতে রাখা থাকে চা। যখন ইচ্ছে খান। দিনের আলোয় বেরিয়ে পড়াই যায় পুরুলিয়ার এই বন-পাহাড়ের পথ ধরে। চাইলে পায়ে হেঁটেই ওঠা যায় কোকুবুরু বা মাঠাবুরুর মাথায়। পথ চিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেই এককথায় রাজি অর্জুনদা। বনের ভিতরে চোরা পথ ধরে ধরে অর্জুনদা নিয়ে যাবে গাছ, ফুল চেনাতে চেনাতে। একদিকে হেলে থাকা গাছ দেখে প্রশ্ন জাগলে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে জানাবে, বুনো হাতির পাল এমনটা করেছে। পরশু রাতেই নাকি এসেছিল কোকুবুরুতে। ‘হাতি এলে কী হবে এখন’? শুনে অর্জুনদা হাসবে। ‘কিচ্ছু হবে না। আমি যেদিক ছুট লাগাব, আপনারাও লাগাবেন।’

এরপরে আর কিছুই বলা যায় না। একটা গা ছমছমে নেশা ঘিরতে থাকে ক্রমশ। মাঠাবুরুর চুড়ো থেকে দেখা যায় কত্তদূর। পাহাড়ের পর পাহাড় একদিকে। আর অন্যদিকে খেত, ছোট্ট ছোট্ট বাড়ি, সমতল। বসন্তের মাতাল হাওয়া দেয়। আমাদের সঙ্গেই লেজ নাড়তে নাড়তে উঠে এসেছে লালি। ও নাকি খুব রুগ্ন অবস্থায় ক্যাম্পে এসেছিল ছোটোবেলায়। এখন অর্জুনদার পিছু ছাড়ে না। ময়ূর দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে যায় বীরের মতো। ময়ূরটা সামান্য উড়ে চলে যায় দূরের পাহাড়ে। একঝলক সেই রঙের বাহার দেখতে দেখতে মনে হয়, এসবই রূপকথা।

দিনের আলোয় ক্যাম্পে বিছিয়ে থাকে পলাশ। চড়া রোদেও গরম লাগে না তেমন। রোদ নিভলেই শিরশিরে ঠাণ্ডা। চায়ে চুমুক দিতে দিতেই ছৌয়ের আসর। ক্যাম্পের বাইরে তখন আদিম অন্ধকার নেমেছে। চাঁদের আলোতে বনপথ আরো নেশা ছড়াচ্ছে। কিন্তু, আপনি শুনেছেন ওপারের জঙ্গলে লেপার্ড আছে। কখন এদিকেও যদি এসে পড়ে ছিটকে! ভয়ে ভয়েই আপনি হয়তো দাঁড়াবেন ক্যাম্পের শেষপ্রান্তে। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে বাঁশির সুর। সত্যিই আসছে! নাকি… 

২০১৬ সালে কলকাতার বরুণ ভট্টাচার্য আর গোবিন্দপুরের সুজিত কুমার মিলে শুরু করেছিলেন এই ক্যাম্প। যাঁরা প্রায়ই রুকস্যাক, তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ কাঁধে পাহাড়ে ছোটেন তাঁরা অ্যালপাইন ৩৬০ ডিগ্রির প্রতিষ্ঠাতা বরুণ ভট্টাচার্যকে একডাকে চেনেন। বানজারা ক্যাম্প শুরু হওয়ার সময় সোনকুপি বনগ্রামের ৩২টি পরিবারই সম্পূর্ণ নির্ভর করত বনের ওপর। এই ক্যাম্প তাঁদের কাছে জীবিকা-নির্বাহের আরো একটি নতুন জানলা খুলে দিয়েছে। সাত-আটটি পরিবারের মানুষ তো এখন সম্পূর্ণভাবে ক্যাম্পের ওপরই নির্ভর করেন। আর, কোকুবুরু-মাঠাবুরু-শালবনের মাঝে কীভাবে যে এমন একটা স্বর্গের খোঁজ পেলেন বরুণদারা, ভাবতে অবাক লাগে।  

ভাগ্যিস পেলেন। তবেই তো এমন ক্যাম্পযাপন সম্ভব হচ্ছে। এখানে বসে, ঘুরেই দিব্বি কাটিয়ে দিতে পারেন গোটা দুই-তিন দিন। পায়ে হেঁটে যেতে পারেন যেদিকে দুচোখ যায়। আবার, এখান থেকেই চাইলে ঘুরে আসতে পারেন ছৌয়ের মুখোশ তৈরির গ্রাম, বাঘমুণ্ডি এমনকি অযোধ্যা পাহাড়ও। বামনি আর ঠুরগা নদীর ঝরনাও দেখে আসতে পারেন। ড্যাম হওয়ার পর অযোধ্যার অনেকটাই এখন তার অতীত হারিয়ে চকচকে ট্যুরিস্ট স্পট। কিন্তু, ঠুরগা নদীর পাশে এখনো শালরাজার গপ্পরা হাওয়ায়-জলে কথা কানাকানি করে। এখানেও নাকি লক্ষাধিক গাছ কেটে পাওয়ার স্টোরেজ প্রকল্প হবে। এই প্রকল্প হলে এখান থেকেও হারিয়ে যাবে বন, পাহাড়, দেদার পাখি, ঠুরগার নিজস্ব গপ্পগুলো। এখনো বেঁচে আছে, চাইলে দেখে আসতে পারেন। পথেই পড়বে একাধিক সাঁওতাল গ্রাম। গ্রামের দেওয়ালে মোটিফ। হাঁস, দেশি মুরগি, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা ন্যাংটো খোকাটি। আপনি দু’দিনের পরিযায়ী। বহিরাগত। তবু মনে হবে, এখানে থেকে গেলে মন্দ হত না।

তারপর ফের আসা ক্যাম্পেই। যেখানে ঢুকলে বেরোতে ইচ্ছেই করবে না আর। 

কীভাবে যাবেন?

সোনকুপি বানজারা ক্যাম্পের সবচাইতে কাছের স্টেশন বরাভূম। ১৮ কিমি দূরত্ব। চক্রধরপুর, হাওড়া-রাঁচি ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস-সহ বরাভূমগামী যে কোনো ট্রেনে বরাভূম নেমে স্টেশনের পাশ থেকেই মিলবে গাড়ি। আগে থেকে বলা থাকলে ক্যাম্প থেকেও গাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পুরুলিয়া থেকে ক্যাম্পের দূরত্ব ৪৮ কিমি। গাড়িতে করে আসা যায় পুরুলিয়া থেকেও।

কখন যাবেন?

সেরা সময় বসন্ত। এখন গেলে পলাশরাজা স্বাগত জানাবে আপনাকে। তবে, চাইলে যেতে পারেন বর্ষায় এবং শরৎ-হেমন্তেও।  

কোথায় থাকবেন?

সোনকুপি বানজারা ক্যাম্প। যোগাযোগ- ৯২৩১৫৮১১৭৭

কোথায় কোথায় যেতে পারেন?

পায়ে হেঁটে এদিক-সেদিক। মাঠাবুরু, কোকুবুরু, পাখি পাহাড়। গাড়িতে চড়িদা, অয্যোধ্যা। 

মনে রাখবেন

বনগ্রামের পরিবেশ নষ্ট করার মতো কিছু করবেন না। সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখবেন। রাতে ক্যাম্পের বাইরে না বেরোনোই ভালো।

 

প্রচ্ছদের ছবি: শান্তনু চক্রবর্তী

অন্যান্য ছবি: লেখক

Developed by DXDasia