
এদের স্টলে ফুটে উঠেছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে জোরালো বার্তা
‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’-এর দেশ এই ভারত। যুগে যুগে এদেশের মণীষীরা সম্মিলন এবং মানবতার কথা শিক্ষা দিয়ে চলেছেন। এত বৈচিত্র্য, এত ভিন্নতা – তার মধ্যেই ফল্গুধারার মতো ঐক্যেরও ধারা বয়ে চলে। এটাই ভারত। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি – এদের ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হতেই পারে, এক সম্প্রদায় অন্যদের সঙ্গে এখানে আত্মীয়ের মতো বসবাস করে, সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, উৎসবে সবাই মেতে ওঠে একসঙ্গে। ধর্মীয় উৎসবগুলি এখানে সম্প্রদায়ের গণ্ডী ছাড়িয়ে সর্বজননীন হয়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িক হানাহানি যে এদেশে দেখা যায়নি, তা নয়, কিন্তু বারবারই সব রকম ঘৃণা আর বিদ্বেষকে অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত মানবতারই জয় হয়েছে। এটাই আমাদের গৌরব। এবারের কলকাতা বইমেলায় সেই সম্মিলনেরই ডাক দিচ্ছে ‘সৃষ্টিসুখ’-এর স্টল।

সেন্ট্রাল পার্কে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২০। বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের ঠিক পাশেই বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছে ‘সৃষ্টিসুখ’ প্রকাশনা সংস্থা। তাদের স্টল নম্বর ৩২৭। বইমেলায় তাদের নানা স্বাদের বই শুধু নয়, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে তাদের জোরালো বার্তাও নজর কেড়েছে সবার। স্টলের এই অভিনব সজ্জাকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন বহু মানুষ।
স্টলের দু’টি দরজা। একটি দরজার ওপরে লাগানো আছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবি। পাশে লেখা তাঁরই কবিতার দুটি পংক্তি, “হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”। পাকিস্তানের সংগ্রামী কবি ফৈয়জ আহমেদ ফৈয়জের লেখা বিখ্যাত উর্দু কবিতা ‘হাম দেখেঙ্গে’-র প্রথম কয়েকটি লাইন রয়েছে তার ঠিক নিচেই। আরেকটি দরজার ওপরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি, সঙ্গে তাঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতার বহুল আলোচিত লাইনগুলি, “ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে / অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে”। আছে লালন ফকিরের গানও, “জগৎ বেড়ে জাতের কথা / লোকে গৌরব করে যথা তথা। / লালন সে জেতের ফাতা ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে”।

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা রাখা আছে দু’টি দরজার পাশে। এক দিকে বাংলায়, আরেকদিকে ইংরেজিতে। সংবিধানের মূল দর্শন এবং রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরার জন্য সংবিধানে প্রস্তাবনার অংশটি রচনা করেছিল গণপরিষদ। পরে তাতে কিছু সংশোধন করা হয়, যদিও সংবিধানের মূল দর্শনের সঙ্গে ওই সংশোধনের কোনো বিরোধ নেই, বরং সামঞ্জস্যই আছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্রের মতো আদর্শগুলিই যে ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি – তা বইমেলায় আসা মানুষদের সামনে তুলে ধরেছে ‘সৃষ্টিসুখ’।
‘সৃষ্টিসুখ’ প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার রোহণ কুদ্দুস আমাদের জানালেন, “এই মুহূর্তে দেশের অশান্ত আবহে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়াটা খুবই জরুরি। তাই ‘সৃষ্টিসুখ’-এর স্টল আমরা সাজিয়েছি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং লালনের খুব পরিচিত কিছু পংক্তি দিয়ে। একই সঙ্গে আমরা অশান্তির শেষে নতুন দিনের আলো দেখার আশাতেও বসে, তাই ফৈয়জের ‘হাম দেখেঙ্গে’। আমাদের স্টলে ভিড় করছেন বহু ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণী। তাঁদের আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়া, এ দেশ সবার। তাই আমরা দু'টো দরজার পাশেই রেখেছি সংবিধানের প্রস্তাবনা – বাংলা এবং ইংরাজিতে”।
