দুই নকশাল নেতার অনুগামীদের সংঘর্ষে ভেঙে গেল সংগঠন

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫২তম পর্ব

কেসি অর্থাৎ কানাই চ্যাটার্জি এবং মাস্টারমশাই অর্থাৎ অমূল্য সেন ছিলেন ‘দক্ষিণ দেশ’ গোষ্ঠী তথা পরবর্তীকালের মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্রের অন্যতম নেতৃত্ব। কেসি’র রাজনৈতিক বিচরণক্ষেত্র ছিল মূলত শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে আর মাস্টারমশাইয়ের মূলত কৃষক সমাজের মধ্যে। সমীর রায়ের পরে আমি যাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম – তিনি ওই অমূল্য সেন তথা মাস্টারমশাই। ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ির ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার কিছু আগে যখন আমরা সিপিএমের পতাকাতলে কর্মরত, সেই সময় আমাদের মার্কসবাদী পাঠচক্রে মাস্টারমশাই একদিন এসেছিলেন। ভারতবর্ষে কৃষক ও কৃষক সমাজের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর আলোচনা আমাদের ধ্যানধারণাকে উদ্দীপিত করতে পেরেছিল সেই প্রথম। খুব সাদাসিধা জীবনযাপন করতেন মাস্টারমশাই। এখানে ওখানে যাওয়ার সময় তাঁর কোমরে টাইট করে জড়ানো থাকত একটা লুঙ্গি ও গামছা এবং তা জামা দিয়ে এমনভাবে ঢাকা থাকত, যা বাইরে থেকে বোঝার সাধ্য থাকত না। 

সিপিএম-এ আমার সঙ্গীসাথীরা, যারা ছিল আমার পার্টিশক্তির অন্যতম উৎস, তারা কেউই পার্টির মেম্বার ছিল না। তাদের মধ্যে একমাত্র আমিই পার্টির সদস্য ছিলাম। পার্টি থেকে আমার বিতাড়ন এবং এবং নিজেকে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবী’দের অবস্থানে নিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ওই সংগ্রামী সাথীরাও সিপিএমের সঙ্গ ছেড়ে প্রথম দিকে ‘দক্ষিণ দেশ’ গোষ্ঠী এবং আরও আরও পরে এমসিসি-র সঙ্গী ও সংগঠক হয়ে উঠেছিল। মাস্টারমশাই প্রায়ই আমাদের এখানে যাওয়া-আসা করতেন। আমাদের অন্যান্য কমরেডদের সঙ্গেও তাঁর গভীর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। 

আর কেসি তথা কানাই চ্যাটার্জি ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার মানুষ। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল তিলজলা, কসবা ইত্যাদি অঞ্চলের নাগরিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর তাঁর প্রধান ‘ঠাঁই’ হয়ে উঠেছিল শ্রমিক আন্দোলন। উষা ফ্যাক্টরি, নিউ অ্যাল্যানবেরি ইত্যাদি কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর ছিল মোটামুটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। শ্রমিক আন্দোলনে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সোচ্চার এই মানুষটি ছিলেন ছোটোখাটো মাপের। চলাফেরা ও জীবনযাত্রায় খুবই সাদাসিধে। উনি একদিন আমাদের বাড়িতে সারা দুপুর রাজনৈতিক আলোচনা করেন। পরবর্তীকালে আমার অন্তরঙ্গ কমরেডরা কেসি’কে ‘ছেলেধরা’ নামে অভিহিত করত। যুবক-যুবতীদের সঙ্গে আলোচনা করে কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি সংগঠনের পরিবৃত্তে তাঁদের টেনে আনতে পারতেন। মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের যে গভীরতা ছিল, কেসির সঙ্গে কখনও সেরকম কোনো গভীরতা গড়ে ওঠেনি। তবে, দু’জনেই ছিলেন রাজনীতি অন্ত প্রাণ পরিশ্রমী মানুষ। পরবর্তীকালে অনুভব করেছি, দু’জনে এক সংগঠন বৃত্তের মধ্যে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে যে তারা একাঙ্গীভূত, তা বলা চলে না কিছুতেই। কিন্তু তাঁদের মতামতের ঐক্য ও ভিন্নতার কোনো স্বাক্ষর তাঁরা কখনই স্পষ্ট করে সামনে রাখেননি। 

বর্তমানকালে আমরা দেখতে পাই, কানাই চ্যাটার্জির অনুগামীরা সিপিআই(মাওবাদী)-র সঙ্গে যুক্ত আর অমূল্য সেনের অনুরাগীরা কেন্দ্রীয় কমিটি, মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র (এমসিসি) নামে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করেন, ‘দক্ষিণ দেশ প্রকাশনী’ নাম দিয়ে বিভিন্ন পুস্তিকা ইত্যাদি প্রকাশ করেন। এঁরা এমসিসির প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের মধ্যে প্রথমে কমরেড অমূল্য সেন, দ্বিতীয় স্থানে কমরেড কানাই চ্যাটার্জিকে স্থান দিতেন। পরে কেসির অনুগামীরা অমূল্য সেনকে প্রথম স্থান থেকে সরিয়ে সেখানে কেসিকে স্থান দেওয়ায় এমসিসির মধ্যে বিরোধের সূচনা ঘটে। দুই অংশ আলাদা হয়ে যায়। 

(চলবে) 
ছবি – প্রতীকী 
 

Developed by DXDasia