কোথায় আমার স্বপ্নের গণফৌজ!

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫০তম পর্ব

ধান রোওয়া, আল বেঁধে জল আটকানো, জল ছাড়া ইত্যাদি কাজে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। সন্ধে হলে এধার ওধার পাঁচ-জন মিলে রাজনৈতিক আলোচনাও চলতে লাগল। কিন্তু কোথায় আমার ঘাঁটি এলাকা, কোথায় আমার স্বপ্নের গণফৌজ, তার দেখা পেলাম না। স্থানীয় যে সব রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে ওঠা-বসা, তাঁদের কাছ থেকে ওই সম্পর্কে কোনো আঁচ পেলাম না। ক’দিনের মধ্যে কেমন একঘেয়েমি পেয়ে বসল। সমীরদা মাঝে মাঝে আসেন যান। ‘দক্ষিণ দেশ’ পত্রিকা নিয়ে আসেন, সংগঠনের নানা খবরাখবর দেন। 

ওস্তাদের বাড়ির ‘এক উঠোন, বারো ঘর’-এর এক ঘরের বউ টিবি-তে আক্রান্ত। সমীরদা তাঁর জন্য কলকাতা থেকে ওষুধ নিয়ে আসেন। কিন্তু শুধু ওষুধ দিয়ে তো ওই রাজরোগের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সুতরাং, ঐখানে আমার উপস্থিতকালের মধ্যেই ওই বৌটিকে ক্রমশ কঙ্কালসার হয়ে উঠতে দেখলাম চোখের সামনে। গলা দিয়ে চিঁচিঁর বেশি কোনো শব্দ আমার মালুম হত না। তবে, সমীরদা তথা খগেন ডাক্তার আসলেই ঐ বৌটির কেমন চোখ দু’টো চকচক করে উঠত। হাড়সর্বস্ব দু’টো হাত বাড়িয়ে ওষুধ পাবার জন্য কেমন অস্থির হয়ে উঠতেন।

সমীরদা আসলে আমিও কম উৎফুল্ল হয়ে উঠতাম না। ওস্তাদের বৌ তখন ডাল রাঁধবার উপাদান সংগ্রহ করতে পারত সমীরদার কাছ থেকে টাকা নিয়ে। আর খালের পার ধরে এ গাঁ থেকে সে গাঁ যাবার খালে জাল মেরে মাছধরারা যে শামুকগুলো ফেলে যেত, ওস্তাদ সেই ছোটো ছোটো শামুকগুলো সংগ্রহ করত। ফুল্লরা পুঁই শাক দিয়ে শামুকের চচ্চরি বানাত। আমরা হাপুস-হুপুস করে মাংস খাওয়ার আনন্দ পেতাম। 

একদিন শুনলাম, কলকাতা থেকে কেসি অর্থাৎ কানাই চাটুজ্যে আমাদের কাজকর্মের অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য আসবেন। মগরাহাট স্টেশন থেকে তাঁকে নিয়ে আসার দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। মাইল পাঁচেক হেঁটে এক কোমর জলে ভরা ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে দুপুরেই মগরাহাট স্টেশনে পোঁছে গেলাম। ঘণ্টা দেড়েক বাদে কেসি ট্রেন থেকে নামলেন। আমরা ইঙ্গিতে উভয় উভয়কে চিনে নিয়ে মাঠের মধ্যে নেমে পড়লাম ‘শর্টকাটে’ গাঁয়ে পৌঁছবার জন্য। যাওয়ার পথে টুকটাক কিছু কথাবার্তা হল। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে সিপিআই(এমএল) পার্টির কর্মীরা ‘অ্যাকশানধর্মী’ কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে কেমন করে তাঁদের সংগঠনের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে, তাঁর উল্লেখ করলেন নানা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে। তাঁর কথাবার্তা আমাকে খুব বেশি একটা উদ্দীপিত করছিল না। 

একজন গ্রামের মানুষ একটা লম্বা বাঁশ কাঁধে নিয়ে জল অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন আগে আগে। বাঁশটা অতিরিক্ত লম্বা। টেনে নিয়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিল মানুষটির। আমি তাঁকে বললাম, “ও দাদা, আমি বাঁশটার পেছন দিকে কাঁধ লাগালে তোমার একটু সুবিধে হবে না?” তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। বাঁশটাকে কাঁধ বদলে নিলেন। আমিও বাঁশের আগার দিকের অংশে কাঁধ দিলাম। তারপর জল ঠেলে আমাদের এগিয়ে চলা, কত দূর যাবেন, কোন গ্রামে বাস, জমি কতটা, এবার চাষ কীরকম হল, বাড়িতে ক’জন আছেন – এরকম হাজারো আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা কখন যে তাঁর গ্রামের প্রান্তে পৌঁছে গেলাম, খেয়াল নেই। তিনি বাঁশটাকে নামিয়ে বললেন, “কাছেই আমার বাড়ি, চলুন না দু’টি পস্টিভাত খেয়ে যাবেন।  

এতক্ষণে ওই মানুষটির দিকে তাকিয়ে কেসি একটু কথা বললেন, “না চাচা, আমাদের একটা জরুরি কাজ সারতে হবে। পরে একদিন আসব না হয়”। গ্রামীণ মানুষটার চিবুকে এক চিলতে দাঁড়ি দেখে কেসি তাঁকে ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু উনি বিদায়কালে “নারায়ণ আপনাদের রক্ষা করুন” বলে শুভ কামনা জানিয়ে বিদায় নিলেন। 

(চলবে) 
 

Developed by DXDasia