আমি কীভাবে ‘সেরা বিপ্লবী’ হয়ে উঠলাম!

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫১তম পর্ব

রাতে কেরোসিন ল্যাম্পের আলোয় বসে গ্রামেরই চার-পাঁচ জন কমরেডকে নিয়ে কেসি আলোচনায় বসলেন। ‘সেরা বিপ্লবীরা গ্রামে চলুন’ – দক্ষিণ দেশ গোষ্ঠীর এই আহ্বানকে কার্যকর করতে আমাকে গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। (আমি ‘সেরা বিপ্লবী’ কী করে বনে গিয়েছিলাম তা ওঁরাই জানেন!) তিনি আমার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন – আমি সেখানে আসার পর থেকে কী কী কাজ সে পর্যন্ত করেছি, সংগঠনের বিস্তৃতি কতটা ঘটেছে, রাজনৈতিক আলোচনা সংগঠিত করছি কীভাবে, কৃষিবিপ্লবী চিন্তাধারা কৃষকদের মধ্যে কতটা ছড়িয়ে দিতে পেরেছি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যা বলেছিলাম, তা পরবর্তীকালে কবিতায় রূপ দিয়েছিলাম এইভাবে, “জনগণের সমুদ্রে মাছ হয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি কমরেড, / মাঠে কৃষকদের সাথে এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে / কোমরে টনটনে ব্যথা নিয়ে ধান রুইতে শিখেছি, / দক্ষিণের নদীর ভাঙা বাঁধ দিয়ে / যখন ধানখেতে হুহু করে জল ঢোকে / তখন কৃষকদের সঙ্গে আমরাও আরুণি হতে শিখেছি, / খেতের আলে বসে কাঁচা লঙ্কা আর নুন দিয়ে / পান্তা খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করছি / আর কয়েক পুরুষের পেচ্ছাবের গন্ধ জমে জমে / মোটা হয়ে ওঠা কাঁথা জড়িয়ে / কৃষকদের পাশে শুয়ে ঘুমের আনন্দে / সারাদিনের পরিশ্রমকে ভুলতে শিখছি…”।

কেসি কুঞ্চিত চোখে আমার কথাগুলো শুনছিলেন, আর কেমন যেন গুম হয়ে যাচ্ছিলেন। এক কৃষক কমরেড কেসি’কে জিজ্ঞাসা করেন, “আমরা কী নামে কৃষকদের মধ্যে কাজ করব কমরেড?” আর একজন জিজ্ঞাসা করলেন, “এখানে কৃষকদের মধ্যে কৃষিবিপ্লবী রাজনীতি কী করে প্রচার করব, একটু বুঝিয়ে দেবেন কমরেড?” কেসি আমার দিকে প্রায় কটমট করে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি এসব নিয়ে কিছুই আলোচনা করেননি দেখছি”। আমি উত্তরে বলেছিলাম, “আমাকে এসব বিষয়ে কী বলতে হবে, কী করতে হবে, কী করে করতে হবে, কিছুই শিখিয়ে এখানে পাঠাননি। আমি কী করে তা করব বলুন তো? আমি কৃষকদের মধ্যে থেকে কী করে ‘কৃষক’ হয়ে উঠব তার চেষ্টা করছি মাত্র এখন, এর বেশি কিছু করার বিদ্যা এখন পর্যন্ত আমার নেই”। 

কেসি তার একটু পরেই আলোচনার সমাপ্তি টেনে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লেন, এবং ভোরে উঠেই কলকাতা ফিরে গেলেন। পরে সমীরদার মুখে শুনেছি, উচ্চতম কমিটির কাছে তিনি এখানকার কাজের রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে বলেছেন, আমি নাকি এখানের শোধনবাদের চাষ করছি! 

আমার সম্পর্কে কেসি অর্থাৎ কানাই চ্যাটার্জির মনোভাব ইতিপূর্বেই খারাপ হতে শুরু করেছিল। আমি গ্রামে আসার আগে ‘দক্ষিণ দেশ’ পত্রিকায় একটা লেখা দিয়েছিলাম। তা ছাপা হয়েছিল ‘এক কোদাল মাটি খুঁড়লেই যেমন কুয়ো খোঁড়া যায় না, তেমনি ধৈর্য ধরে কাজ না করলে জনগণকে জাগ্রত করা যায় না’ নামে।  ১৯০৩-১৯০৪ সালে গ্রামে গ্রামে কৃষক সেজে বিপ্লব সংগঠিত করতে যাওয়া এবং ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির বিরুদ্ধে লেনিনের সমালোচনার উল্লেখ করে লিখেছিলাম, “লেনিনের এ সমালোচনার ৬৪-৬৫ বছর পরেও আমরা সেই ভুল নরদনিক রাজনীতির অনুসরণ করে চলেছি?” আমি গ্রামে আসার পর শুনেছিলাম, কেসি নাকি আমার ওই লেখার কঠোর সমালোচনা করে একটা লেখা লিখেছিলেন। সেখানে, “যার যা কিছু ভালো গ্রহণ করা উচিত” মন্তব্য করে পরোক্ষত চারু মজুমদারের অ্যাকশন সর্বস্ব রাজনীতির প্রতি সমর্থনই ব্যক্ত করেছিলেন। ‘দক্ষিণ দেশ’ গোষ্ঠী পরবর্তীকালে ‘মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র’ বা MCC নাম গ্রহণ করেছিল। তাঁদের যে অংশটি সিপিআই(এমএল)-এর কট্টর রাজনীতির সমর্থক হিসেবে কার্যরত অংশগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি করে ব্যক্তিহত্যার রাজনীতিকে প্রাথমিক গুরুত্ব দিয়ে তথাকথিত ঘাঁটি অঞ্চল ও গণফৌজ গড়ার কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা চারু মজুমদার ও কানাই চ্যাটার্জিকে ‘icon’ হিসেবে গ্রহণ করে কেন প্রচার চালান – সে সত্য বুঝতে এখন আর তাই আমার অসুবিধে হয় না। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia