চা শ্রমিক থেকে নৃত্যশিল্পী

সিমন কুজুর বর্তমানে নৃত্য কলা বিষয়ে বোলপুরের একটি মহিলা কলেজের মিউজিকের শিক্ষিকা

বাবা-মা চা শ্রমিক। একসময় তিনিও চা বাগানে পাতা তোলার কাজ করেছেন। সেখান থেকে আজ পি এইচ ডি শেষ করেছেন। বর্তমানে নৃত্য কলা বিষয়ে বোলপুরের একটি মহিলা কলেজের মিউজিকের শিক্ষিকা। ইতিমধ্যে জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা সহ পৃথিবীর ১৪টি দেশে গিয়ে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য ও আদিবাসী নৃত্যের তালিমও দিয়ে এসেছেন। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার গয়াগঙ্গা চা বাগানের মেয়ে সুচিতা কুজুর আজ তাই বিভিন্ন মহলে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছেন।

সুচিতার বাবার নাম সিমন কুজুর। এখন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ। আর মা জুলিয়া বেক। যদিও জুলিয়া আজ বেঁচে নেই। কিন্তু সুচিতা যখন স্কুল ছাত্রী সেই সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে চা বাগানে নিয়মিত চা পাতা তুলতে হত। ঘরে অভাব ছিল নিত্য সঙ্গী। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই একদিন তাঁর দেখা হয় ফাদার কল্যাণ কিশোর তিরকি-র সঙ্গে। ফাদার সেন্ট পিটার্স স্কুলের সামনে সেদিন শাস্ত্রীয় নৃত্য শেখাছিলেন। তারও নাচ শেখার ইচ্ছে হয়। তারপর একদিন মাটিগাড়া যীশু আশ্রমের কাছে ফাদার তিরকির কাছে গিয়ে নিজের কথা জানালেন। শুরু হয় নাচের তালিম নেওয়া। একদিকে আদিবাসী নৃত্য, আরেকদিকে ভারতনাট্যম। তাঁর নৃত্য প্রতিভা দেখে এগিয়ে আসেন আরেক ফাদার পউলুস। তাঁরা স্বপ্ন দেখেন দেশে বিদেশে ভারতীয় সংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকে মিলে ধরবে সুচিতা। কিন্তু ঘরে যার অভাব, যে কিনা বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত চা বাগানে পাতা তোলে সে কীভাবে দেশে বিদেশে নাম করবে? আসলে মনে অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর একটু আর্থিক সহায়তা পেলে সুচিতারা এগিয়ে যেতে পারে।

তা সম্ভব হয়েছে আজ। শিলিগুড়ি থেকে বেনারসে গিয়ে সেখানকার কলেজ থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্য শিখে প্রথমে বি এ, তারপর এম এ পাশ করেন সুচিতা। বিষয়, মিউজিক। তাতেও থেমে থাকেননি সুচিতা। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কদিন আগেই তিনি পি এইচ ডি ডিগ্রির জন্য তার গবেষণার বিষয় পেশ করে দিয়েছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়, আদিবাসী জীবন শৈলীতে নৃত্য পরম্পরা। আর এই পড়া শুরুর আগে তিনি পৃথিবীর ১৪টি দেশ নৃত্য দিয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময় করে এসেছেন। বিদেশিদের শিখিয়ে এসেছেন আদিবাসী নৃত্যের সঙ্গে ভারতনাট্যম।

গত বছরই তিনি বোলপুরের একটি মহিলা কলেজে মিউজিকের শিক্ষিকা হিসাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। সুচিতা জানালেন, আদিবাসী নৃত্যের সঙ্গে ভারতনাট্যম মিশিয়েও তিনি নতুন নৃত্য ধারার অনুষ্ঠান করেছেন বেঙ্গালুরু গিয়ে। মাদল, ধামসা, নাগারার সঙ্গে শাস্ত্রীয় নৃত্য মিশিয়ে আরও কিছু নতুন জিনিস দিতে চান। আর ফাদার কল্যাণ কিশোর তিরকি বলেন, সুচিতা নৃত্য প্রতিভা। তবে উত্তরবঙ্গের চা বাগানে আদিবাসীদের মধ্যে আরও অনেক এই রকম প্রতিভা রয়েছে। গয়া গঙ্গা চা বাগানের সালমা টপ্প, প্রিয়া মিঞ্জ-ও উত্তরবঙ্গ থেকে বেনারস গিয়ে শাস্ত্রীয় নৃত্যের ওপর বি এ পড়ছেন। একই ভাবে শান্তিরানি হাসদা বেনারস গিয়ে এম এ পড়ছেন একই বিষয়ের ওপর। চা বাগানে এই রকম আরও অনেক প্রতিভা রয়েছে। এদের প্রতিভার জন্য উত্তরবঙ্গের মাদল, ধামসার আদিবাসী নৃত্যও নতুন দিশা পাচ্ছে। অল ইন্ডিয়া সাঁওতাল ওয়েলফেয়ার ও কালচারাল সোসাইটির সম্পাদক সালভা সিং বলেন, সুচিতাদের প্রতিভা বিকাশে সকলকে আরও বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে। সুচিতারা পিছিয়ে পড়া হয়েও অনেক বাধা পেরিয়ে জীবনে সফল হচ্ছে। অথচ তারা প্রচারের আলোর বাইরে থেকে যান। তাদের এই লড়াই থেকে অনেকের শিক্ষা নেওয়ার দরকার রয়েছে।

Developed by DXDasia