বেগম রোকেয়ার শতবর্ষ পুরোনো ‘লেডিল্যান্ড’-এর খোঁজে স্পেনের পরিচালক

ইসাবেল হেরগুয়েরা পরিচালিত ‘সুলতানাস ড্রিম’

সে এক আশ্চর্য দুনিয়া। সেখানে পুরুষেরা থাকেন অন্তঃপুরে; ঘর-সন্তানের দেখভাল করেন। দেশ চালান মহিলারা। তাঁরা কাজ করেন প্রাকৃতিক উপহারের সদ্ব্যবহার করে। সব কাজ দু-তিন ঘণ্টায় শেষ করে ফেলার মতো প্রযুক্তি যাঁরা আবিষ্কার করেছেন, তাঁরাই আবার রাষ্ট্র পরিচালনাও করতে পারছেন। এমন সুচারু সে পরিচালনা যে বৃষ্টি ও সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে তাঁরা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন; এমন সমাজ গড়েছেন, যেখানে অপরাধ নেই। যেখানে শিক্ষার শক্তিই বড়ো, প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চলা যায় এবং যুদ্ধ বন্ধ করা যায় রক্তপাতহীন পথে। এই সমাজই তো মানুষের কাম্য!

“এত বছর আগে প্রকাশিত, এরকম একটা ‘র‍্যাডিকাল আইডিয়া’ নির্ভর লেখা পড়ে খুবই অবাক হয়ে গেছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিই—এ নিয়ে সিনেমা বানাব।” – ইসাবেল হেরগুয়েরা

আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে, পরিবেশ আর প্রকৃতি ধ্বংস করা উন্নয়নের হাত থেকে প্রজ্ঞাপূর্ণ সহাবস্থানের এমনই এক ‘লেডিল্যান্ড’, নারীবাদী ইউটোপিয়া কল্পনা করেছিলেন মুক্তচিন্তক-সমাজসংস্কারক, লেখক বেগম রোকেয়া। ১৯০৫-এ মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত, ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘সুলতানাস ড্রিম’ (Sultana’s Dream)-কে শুধুমাত্র নারীবাদী আখ্যান বলে থেমে গেলে চলবে না; সুস্পষ্টভাবে এটা একটা বিস্ময়কর কল্পবিজ্ঞানমূলক কাহিনি। ‘বিস্ময়কর’ এই কারণেই যে সেই সময়ের নিরিখে শুধু মহিলা বলে না, ২৪ বছর বয়সী একজন মুসলমান মহিলার ‘অঘোষিত’ নারীবাদী দৃষ্টিকোন থেকে লেখা এই কাহিনিতে ভবিষ্যতের যে যে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি অগ্রগতির কথা বলা আছে, তা হাবিজাবি চিন্তা নয়। একটি দূরদর্শী বাস্তবসম্মত কল্পনা, যা আজ বেশি করে প্রাসঙ্গিক। তাই, বিগত দু-এক দশক ধরে সারা বিশ্বে গবেষকরা তাঁকে নিয়ে কাজ করেছেন; নতুন করে আলোচিত হয়েছে ‘সুলতানাস ড্রিম’। ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের মাইলস কেলি পাবলিশিং কোম্পানি অনেক দিন টিকবে এমন কাগজে চীন থেকে ছাপিয়েছে এমন একখানা বই, যে বইতে এইচ জি ওয়েলস, জুল ভার্ন, মার্ক টোয়েন, এডগার অ্যালান পো আর হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের সঙ্গে আমাদের রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনও (সুলতানাস ড্রিম) আছেন। ২০২৪-এ এই কাহিনি ইউনেসকো ‘বিশ্বস্মৃতি’ বা ‘ওয়ার্ল্ড মেমোরি’র তালিকায় স্থান পেয়েছে। আবার এই উপন্যাস নিয়েই ৮৬ মিনিটের অ্যানিমেশন সিনেমা (‘এল সুয়েনিও দে লা সুলতানা’ ওরফে ‘সুলতানাস ড্রিম’) বানিয়েছেন স্প্যানিশ শিল্পী-পরিচালক ইসাবেল হেরগুয়েরা (Isabel Herguera)। ছবিটি গত ৪ ডিসেম্বর দেখানো হলো কলকাতার ম্যাক্সমুলার ভবন গ্যোটে ইনস্টিটিউটে। উপস্থিত ছিলেন ছবিটির নির্মাতা সহ অন্যান্য কলাকুশলীরা।

 

ইসাবেল বলছিলেন এই ফিল্ম-জার্নির কথা। বহুদিন ধরেই এদেশে যাতায়াত তাঁর। ২০১০/১১ সালে সুলতানাস ড্রিম বইটি খুঁজে পেয়েছিলেন দিল্লির এক আর্ট গ্যালারিতে। তাঁর কথায়, “এত বছর আগে প্রকাশিত, এরকম একটা ‘র‍্যাডিকাল আইডিয়া’ নির্ভর লেখা পড়ে খুবই অবাক হয়ে গেছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিই—এ নিয়ে সিনেমা বানাব।” প্রজেক্টের সূত্রপাত ২০১২ সালে ক্রাউডফান্ডিং প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সুলতানাস ড্রিম নিয়ে বেশ কয়েকটি কর্মশালার আয়োজন করেন সিনেমাটির নির্মাতারা। চিত্রনাট্য তৈরির জন্য অনুদানও পেয়ে যান বাস্ক সরকারের কাছ থেকে। আট বছরের গবেষণা শেষে ২০২০ সালে সুলতানাস ড্রিম নিয়ে কাজ শুরু করেন ইসাবেল। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় ছবির কাজ। ২০২৩ সালে স্পেনের সান সেবাস্তিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবার দেখানো হয় ছবিটি। এটি যেমন ইসাবেলের প্রথম ফিচার ফিল্ম, সেইসঙ্গে এই উৎসবে নির্বাচিত হওয়া প্রথম অ্যানিমেশন ফিচার ফিল্মও।

‘লেডিল্যান্ড’ আঁকতে ব্যবহার করা হয়েছে মেহেন্দি টেকনিক

স্পেন ও জার্মানির পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রযোজনা করেছে ছবিটি। ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও বাস্ক ভাষা। মৌসুমী ভৌমিকের লেখা একটি বাংলা লালাবাই (lullaby) এ ছবির অন্যতম সম্পদ। সেটির সংগীতায়োজন করেছেন তাজদার জুনায়েদ, গেয়েছেন দীপান্বিতা আচার্য। ছবির অ্যানিমেশনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে হাতে আঁকা, দ্বিমাত্রিক কালি এবং জলরঙ। ‘লেডিল্যান্ড’ আঁকতে ব্যবহার করা হয়েছে মেহেন্দি টেকনিক। ভারতে একদা জনপ্রিয় ‘অ্যাম্বিয়েন্স অব শ্যাডো থিয়েটার’ প্রক্রিয়া দেখা যায় এই ছবিতে।

জলরঙের ব্যবহার

কলকাতায় ছবির প্রদর্শনীতে ড্রয়িংগুলো নিয়ে এসেছিলেন ইসাবেল, দর্শকরা সেগুলো হাতে নিয়ে দেখার সুযোগও পেয়েছেন। আক্ষেপের বিষয়, সুদূর স্পেনের এক ব্যক্তি রোকেয়ার এই কল্পকাহিনি নিয়ে এত কাঠখড় পুড়িয়ে এরকম একটা ছবি উপহার দিতে পারলেন, আর এদেশের লোকেরা এ নিয়ে ভালো করে আলোচনা করে উঠতে পারলেন না। ‘অবরোধবাসিনী’-তে রোকেয়া বলেছিলেন, ‘আমরা বহুকাল হইতে অবরোধে থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি; সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের—বিশেষত আমার কিছুই নাই। মেছোনীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে “পচা মাছের দুর্গন্ধ ভালো না মন্দ?” সে কী উত্তর দিবে?’ -আমাদের দশা বোধহয় খানিক এরকমই।

স্পেন ও জার্মানির পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রযোজনা করেছে চলচ্চিত্রটি। সিনেমাটিতে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও বাস্ক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। মৌসুমী ভৌমিকের লেখা একটি বাংলা লালাবাই (lullaby) এ ছবির অন্যতম সম্পদ।

‘অ্যাম্বিয়েন্স অব শ্যাডো থিয়েটার’ ফর্ম

এই ছবিতে দৃশ্যগত দিক থেকে তিনটি গল্প আলাদা করে উপস্থাপন করেছেন ইসাবেল। তাঁর ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, বেগম রোকেয়ার জীবন এবং লেডিল্যান্ডের গল্পকে একত্রিত করে তৈরি হয়েছে এই ছবির চিত্রনাট্য। ইসাবেলের সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন তাঁর জীবনসঙ্গী জিয়ানমার্কো সেরা। ইসাবেলের মতোই এ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইনেস একজন শিল্পী-চলচ্চিত্র নির্মাতা। সে ভারত সফরে আসে। এদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তার বন্ধু, পরিচিত জনেরা। এক বইবিপণিতে এসে সে আবিষ্কার করে সুলতানাস ড্রিম; যা তার জীবনকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। সে বেগম রোকেয়ার স্মৃতিচিহ্ন এবং মিথের ‘লেডিল্যান্ড’ খুঁজে বেড়ায়। মাদ্রিদ থেকে আহমদাবাদ, পায়রাবন্দ থেকে কলকাতা। তবে, ছবিতে স্বতন্ত্র ভাষায় সুলতানার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন ইসাবেল। দর্শককে নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। যেকারণে ছবিটি শুধুমাত্র নারীবাদী ছবি হিসেবে থেকে যায় না। নারী-পুরুষের সম্পর্ক ছাপিয়ে এ ছবি হয়ে উঠেছে বন্ধুত্বের, মানবতার, ভালোবাসার। এ ছবি অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে আলাপ করায়, নিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। একটা খোঁজের দিকে। সুলতানা থেকে ইনেস, রোকেয়া থেকে ইসাবেল – জারি থাকে সেই স্বপ্নের খোঁজ, যা অবারিত থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। 

গ্যোটে ইনস্টিটিউটে সিনেমার প্রদর্শনীর পর দর্শকদের সঙ্গে কথাবার্তা; ইসাবেল হেরগুয়েরা, মৌসুমি ভৌমিক ও শেখর মুখার্জি (বাঁদিক থেকে)

Developed by DXDasia