সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন রবীন্দ্রনাথ লিখিত ‘শেষের কবিতা’র অমিত

প্রবীণ আর নবীনের মেলবন্ধন অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল সৌমিত্র অভিনীত ‘শেষের গল্প’ ছবিতে

মনে করুন, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস লেখার পর কেটে গিয়েছে বেশ কিছু বছর। এমন সময়ে ‘শেষের কবিতা’র অমিত আর লাবণ্যের যদি ফের দেখা হয়ে যায়। কী হবে তখন? কোন পরিস্থিতিতে একে অপরকে দেখতে চাইবে তারা? গাড়ির হঠাৎ ধাক্কায় শিলং পাহাড়ের তাদের সেই দেখার স্মৃতি আবার জেগে উঠবে? লাবণ্য কি অমিতকে আবার বলতে চাইবে ‘বিয়ে করবার মানুষ তুমি নও’! এই সব অনুসন্ধান করতে গিয়েই একটি আস্ত ছবির ভাবনা সাজিয়ে ফেলেছিলেন দুই তরুণ চিত্রনাট্যকার জয়দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সৌমিত দেব। ছবির নাম ‘শেষের গল্প’। যার ট্যাগলাইন ‘কবিতার না বলা অংশ।’ যেখানে রবীন্দ্রনাথ শেষ করেছিলেন এই ছবির যাত্রা তার কিছু বছর পর থেকে। যদি অমিত এবং লাবণ্য আজ বেঁচে থাকত এবং তাদের বয়স হত, তাহলে কী হতে পারত। ছবির পরিচালক জিৎ চক্রবর্তী বলেছেন, “অমিত একটি বৃদ্ধাশ্রম চালায়। তার স্ত্রী কেতকী মারা গিয়েছে। লাবণ্য অক্সফোর্ডে পড়াত। তার স্বামী শোভনলাল মারা গেছে। সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছে লাবণ্য। এইরকম একটা অবস্থায় দুজনের দেখা হয়। আমরা রবীন্দ্রনাথের মূল গল্প একই রেখেছি। শুধু পরিবেশটা বদলে গেছে। পারিপার্শ্বিক বদলে গিয়ে হয়েছে এখনকার সময়।”

গল্পে একটি সমান্তরাল ট্র্যাকও রয়েছে। ছবির অন্যতম প্রধান দুই চরিত্র আকাশ ও কুহু। এখানে চরিত্রগুলোর নাম বদলে গেলেও তাদের দেখা হওয়া থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই হয় অমিত-লাবণ্যের জীবনের ঘটনাক্রম অনুসারে। শুধু গল্পের শেষটা অজানা ভাবে সমাপ্ত হয়। দুটো ট্র্যাক আলাদা রেখে আসলে দুটো আলাদা প্রেক্ষিতে অমিত আর লাবণ্যদের ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আকাশ এবং কুহুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায় এবং দুর্গা সাঁতরা। এছাড়াও ছবিটিতে অভিনয় করেছেন খরাজ মুখোপাধ্যায়, কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়, পল্লবী চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। ছবিটির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জয় সরকার।

পরিচালক জিৎ চক্রবর্তীর এটিই প্রথম ছবি ছিল। প্রায় এগারো বছর ধরে তিনি টেলিভিশনে অভিনয় করেছেন। তাছাড়াও চার-পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও কাজ করছেন। জয়দীপ- সৌমিত- জিৎ, তিন বন্ধুর একটা হঠাৎ আড্ডা থেকেই জন্ম নেয় এই ছবির প্লট। কথায় কথায় পরিচালক বলছিলেন, “আমি যার সঙ্গে কাজ করেছি তিনি ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়ার মোস্ট অভিনেতা। আর পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি জুনিয়র মোস্ট পরিচালক।” প্রবীণ আর নবীনের মেলবন্ধন ছবিতে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। কারণ এমন একটি বিষয়নির্ভর কাজ বাংলার দর্শক সাদরে গ্রহণ করে নিতে সক্ষম হয়েছিল অনায়াসেই।

এর আগে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে ছবি করেছিলেন পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়। কিন্তু সারাজাগানো একটি লেখার চরিত্রদের যদি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বেড়ে যায়, অথচ অক্ষত থাকে তাদের পুরোনো ভালোবাসা! ধুর! ভালোবাসার আবার নতুন পুরোনো হয় নাকি! যা হয় সেটা হল, ভেসে যাওয়া, উড়ে চলা। এইভাবে প্রিয় চরিত্ররা বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসেন আমাদের পাশের বাড়ির একজন হয়ে। আবিষ্কারের পথটা ক্রমশ চওড়া হয়। অমিত-লাবণ্যেরা মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকে আজীবন।

অমিত এবং লাবণ্যের বয়স্ক চরিত্রে দেখা গিয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং মমতা শংকরকে। রবীন্দ্রনাথ সৌমিত্রবাবুর জীবনে, যাপনে কতখানি জুড়ে ছিল তা সকলেরই জানা। শেষ বয়সে এমন অনবদ্য চরিত্রে অভিনয় করে বেজায় খুশি হয়েছিলেন তিনি। ‘শেষের গল্প’ মুক্তির পর মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছিল বয়স্ক অমিত-লাবণ্য। সৌমিত্রবাবুর শক্তিশালী অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন বাংলার দর্শক।

Developed by DXDasia