
“পোশাক ছাড়ার সাথে সাথেই যৌনতা খসে পড়ে” পাঠ ও রেখাচিত্রে হিরণ মিত্র
জীবনস্মৃতি আর্কাইভের ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রতি (১৯ নভেম্বর, ২০২২) মুক্তি পেয়েছে ছবিটি। শিল্পী হিরণ মিত্রের বিশেষ এক ধরনের চিত্রকর্ম নিয়ে অরিন্দম সাহা সরদারের চলমান কথাচিত্র ‘শরীর-রেখা’। যেখানে শিল্পী তাঁর রেখা ও যাপনকে নগ্ন করেছেন, তুলির আঁচড়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বকণ্ঠে ব্যক্ত করেছেন তাঁর ভাবনায় নারী ও যৌনতা; বলেছেন, “পোশাক ছাড়ার সাথে সাথেই যৌনতা খসে পড়ে”। অরিন্দম তাঁর এই কথাচিত্রে কতটা ধরতে পারলেন একজন শিল্পীর এহেন আর্তি?
অরিন্দমের কথায়, “আমাদের এই প্রাচীন, ধুলোপড়া সমাজে কিছুক্ষণের জন্য একটু খোলা হাওয়া বইয়ে দেওয়া। এমনই চেষ্টা। একজন নগ্ন নারীর শরীর ক্রমশই রেখা বনে যাচ্ছে, প্রেমে ও ভালোবাসায়। তারই আখ্যান। সাধারণ ভাবে এই নিয়েই কথা বলা, আঁকা, তারই চিত্ররূপ। জীবন ও তাঁর আত্ম আবিষ্কারও বলা যায়।”

মানে’র ‘অলিম্পিয়া’, ফ্রান্সিস্কো গোয়া’র ‘দ্য ন্যুড মাজা’, মাইকেলঅ্যাঞ্জেলোর ‘দ্য ক্রিয়েশন অফ অ্যাডাম’, গুস্তাভ কিমিতের ‘দানে’, হেনরি মাতিস’র ন্যুড (সুভনির দে বিস্ক্রা), সালভাদোর দালি’র ‘গ্রাদিভা’, পল সেজানের ‘বাথারস অ্যাট রেস্ট’ এছাড়াও আমেদিও মদিগ্লিয়ানি, পল গঁগ্যা, ভ্যান গঘ, পিকাসো -সারা পৃথিবীর বিখ্যাত সব শিল্পীকৃত বিখ্যাত সব নগ্ন চিত্র আমরা দেখতে পাই। এই বাংলাতেই হেমেন মজুমদার থেকে শুরু করে যোগেন চৌধুরী, প্রহ্লাদ কর্মকার, প্রকাশ কর্মকার, প্রমুখ শিল্পীর ‘ন্যুড’ ছবি এঁকেছেন। এখানে শিল্পী প্রহ্লাদ কর্মকারের (শিল্পী প্রকাশ কর্মকারের বাবা) কথা বিশেষ করে বলতে হয় কারণ, প্রহ্লাদবাবু নামী শিল্পী তো ছিলেনই সেই সঙ্গে তাঁর স্টুডিওতে চালু করেছিলেন প্রথম ন্যুড স্টাডির ক্লাস। তাঁর বাড়ি ও স্টুডিও ছিল এখনকার কাঁকুড়্গাছি অঞ্চলে। দাঙ্গার সময় মৌলবাদীরা সেই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়, পুড়ে ছাই হয়ে যায় অসংখ্য চিত্রকর্ম। একে অপূরণীয় ক্ষতি বললেও কম বলা হবে।
শরীর ও নগ্নতা নিয়ে সমাজের যে ‘taboo’, তা আজও ভাঙা যায়নি। সমাজের এই অসম্পূর্ণ বোধ শিল্পীজীবনেও যেন বিষম পাথর হয়ে বসে আছে। শিল্পীরা যা লক্ষ্য করতে পারেন, সমাজ পারে না। অথচ শিল্পীর স্বাধীনতা খর্ব করার বেলায়, মুহুর্মুহু ফতোয়া জারি করার বেলায়, শিল্পকর্মের গুরুত্ব না বুঝে ছড়ি ঘোরানোর বেলায় সমাজ পা বাড়িয়ে রেখেছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, হিরণ মিত্রের ভাবনায় নারী শরীর ও যৌনতা নিয়ে অরিন্দমের এই কথাচিত্রটি একটি ইস্তেহারপত্র, এ কথা বলাই যায়। যেখানে কোনও হিংসা, বীভৎসতা নেই, প্রেম আছে। একজন শিল্পীর দৃষ্টিতে শরীর একটি ছায়া, শুধু ছায়া নয়, ছায়ার ছায়া। কখনো জলে, ঘাসে, জমিতে, কখনো শূন্যে, আকাশে। এই ছায়া স্থির অথবা অস্থির। প্রতি মুহূর্তে ভঙ্গি বদল হচ্ছে। অরিন্দম এই ছবিতে রাত আর ভোরের সঙ্গমের রাগ ‘যোগ’-এর ব্যবহার করেছেন। ব্যবহার করেছেন এমন একটি ‘ন্যুড’ ইমেজারি, যা কারো কারো ক্ষেত্রে একটা ‘জার্ক’। একটা থেরাপির মতো কাজ করবে। রেখার শরীর কাট টু মোনোক্রমে রক্ত-মাংসের নারী শরীরের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। এখানে সম্পাদক হিসেবে অরিন্দম তাঁর স্বাক্ষর রেখেছেন যেমন, তেমনই তৈরি করেছেন অন্য এক ভাষা। কথাচিত্রটি নির্মাণের পাশাপাশি এর আলোকচিত্রায়ণ, সম্পাদনা ও আবহ করেছেন অরিন্দম নিজেই। আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ছবিতে কোয়েলি সরকার অত্যন্ত নিষ্ঠায় 'যোগ' রাগটি গেয়েছেন তো বটেই সেই সঙ্গে রাগটি যে এই ছবিতে ব্যাবহার করা যায়, এই ভাবনা তাঁরই।

একটি ঘটনার কথা, যা আমি জানি, কিছুদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর কিছু ‘ন্যুড’ চিত্রকর্ম প্রকাশ করেছিলেন হিরণ মিত্র। তারপর অত্যন্ত লজ্জাজনক একটি অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁকে। কিছু মানুষ সেই ছবিগুলিকে এমনভাবে ‘vulgar’ আখ্যায়িত করেন যে শিল্পী তাঁর দেওয়াল থেকে ছবিগুলি সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। এই কথাচিত্রে হিরণ মিত্র এক নাগাড়ে নগ্ন রেখাচিত্র উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দর্শন পাঠ করে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “রেখা নগ্ন। সে শরীরের ধার ঘেঁষে নানা কারুকার্য তৈরি করে চলে। আমি সেই কারুকার্যে শামিল হই। রেখা আমাকে নির্দেশ করে। আকার ক্রমাগত পাল্টায়। আমি সেই আকারকে আবিষ্কার করি। … রেখা পাক খাচ্ছে। রেখা শরীরের সামনে পিছনে, ঘূর্ণির মতো ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। রেখা অপূর্ব হয়ে উঠছে। যেন প্রকৃতি আবিষ্কার। প্রকৃতির নানা মাঠ, প্রান্তর, উঁচু টিলা, গাছ-গাছালি, গভীর অরণ্য, সবই এই নগ্নতায় ধরা আছে। এর কোনও লজ্জা নেই। লজ্জা থাকতে নেই। লজ্জা একটা আরোপিত, সামাজিক প্রকাশ। একে দেখতে কেমন? পোষাক ছাড়ার পর, লজ্জাকে দেখা যায়? মুহূর্তেই লজ্জা, লজ্জায় মুখ নামায়। চোখ বোজে। পোষাক ছাড়ার সাথে সাথেই যৌনতাও খসে পড়ে। যৌনতা, পায়ের পাতার কাছে জড়ো হয়ে পড়ে থাকে অবহেলায়। রেখায় রেখায় সঙ্গম হয়। রেখা চিত্র-সন্তানের জন্ম দেয়। অজস্র চিত্র-সন্তান।” এছাড়াও আরও অনেক কিছুই তিনি বলেছেন এই চলমান কথাচিত্রে।

শিল্পী হিরণ মিত্র
নারীদেহ থেকে সামান্য পোশাক-স্খলন হলে অথবা পোশাকের দৈর্ঘ্য বিবেচনা করে ‘মেয়েরা ধর্ষনের জন্য দায়ী’ বলার মতো পরিসর যে সমাজে রয়েছে, আমি মনে করি সেখানে এরকম কাজের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটুক। একটি সৎ প্রচেষ্টা হিসেবে মনে রেখে দেওয়াই যায় ৬ মিনিট ব্যাপী ‘শরীর ও রেখা’।
রইল ইউটিউব লিঙ্কঃ
