
বর্ণ-জাতি ভেদাভেদ না রেখে সবাই এখানে আসেন, পছন্দ হলে কেনেন, সবুজের মাঝে খুঁজে বেড়ান নিজেকে
সোনাঝুরির সিকোয়েন্স মানেই দূর থেকে ভেসে আসবে মাদলের শব্দ। সাঁওতালরা মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন কাঠ। আশেপাশে ছড়ানো ছেটানো বাহারি হোটেল। শনিবারের হাট। একটু দূরেই খুব শান্তভাবে বয়ে যাচ্ছে কোপাই, যার ভালোবাসার নাম খোয়াই। ধূসর রঙের পরিবেশ। একবার গেলে আপনারও পা মেলাতে ইচ্ছা করবে মাদলের ধ্বনিতে। সারিবদ্ধ ইউক্যালিপটাস গাছের ডাল-পাতা আপনার কানে কানে এসে বারবার জিজ্ঞাসা করবে, “কেমন লাগছে আমাদের?” এই পৃথিবী আমাদের বড্ড চেনা। আবার চেনার মধ্যেই তো একরকমের অচেনার গন্ধ মিশে থাকে। পাতার কুহকে জড়িয়ে থাকবে দাদু-ঠাকুমার ভালোবাসা। গাছের গোড়ায় স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে কপোত কপোতির জোড়া নাম। এভাবেই রবি ঠাকুরের আদরের সোনাঝুরি প্রতি বসন্তে আমাদের রোদ দেবে, ছায়া দেবে, আশ্রয় দেবে। বাউলের গানে মন নেচে উঠবে। বন্ধুদের দল সদ্য লেখা কবিতা পাঠ করে শোনাবে। এ তো পুরোপুরি সিনেম্যাটিক জার্নি। প্রায় দুই দশক আগে শনিবার শনিবার করে এখানেই শুরু হয়েছিল গ্রাম্য হাট। হাতে করা জিনিস। যার পোশাকি নাম ‘খোয়াই বনের অন্য হাট’।


সে প্রায় শুরুর কথা। ভরা গ্রীষ্মের দুপুরে কেউ আসতেন ঢেঁকি শাক, কলা-মুলো, কড়াইশুঁটি নিয়ে। কেউ আবার শীতে পিঠেপুলি নিয়ে আসতেন। বিশ্বভারতীর অধ্যাপকেরা আসতেন আড্ডা দিতে। বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসে সবাই মিলে গল্প করতে করতে খেতেন। ভিড় ছিল না তেমন। হাতে গুনে একশো লোক। ঘণ্টা তিনেক সেই জমায়েত হত সেই হাটে। কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা হাতে করে সুন্দর সুন্দর জিনিস নিয়ে পসরা সাজাতেন। চারপাশে ঘেরা থাকত সাইকেল। তারপর গোধূলি নামতেই উদাস-বাউল সুর হাটে আনত অন্য মাত্রা। পাশে একফালি ক্যানেল নিজের মতো আয়েশ করছে। পিচের রাস্তাটি তখন ছিল লালমাটির। পূর্ণিমার চাঁদ পড়ত সেই ক্যানেলের জলে। গাছে গাছে খেলা করত চাঁদের বাঁধভাঙা আলো।


সোনাঝুরির হাট এখন অন্য রূপ নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেও সেজে উঠতে চাইছে বন্য গয়নায়। এখনও প্রতি শনিবার হাট বসে। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি খেলা করে একে অপরের হাত ধরে। সোনাঝুরিরা হারিয়ে যায়নি। তাদের হারাতে নেই। এই পৃথিবী জানে ইউক্যালিপটাসের ভালোবাসা, পাশাপাশি বেঁচে থাকা। এখন প্রতি শনিবার ভিড়ে মিশে যায় টোটোদের দল। গাছের নিচে তৈরি হয়েছে মাচা। কাতারে কাতারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। শ্যামবাটি ক্যানেল পার হতেই শুরু হয় সরু পিচ রাস্তা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন খোয়াইকে নতুন করে সাজানোর কথা। খোয়াই-এ একটি ইকো ট্যুরিজম পার্ক করারও ঘোষণা করেন তিনি। প্রতিবছর এখানে পর্যটকের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। রাজ্য সরকার তাই বাড়তি সুবিধা দিতে চায়। এই কারণেই রোদ, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কিছু ছাউনি, বসার ব্যবস্থা, জলের ব্যবস্থা এবং শৌচালয় করা হবে। নতুনভাবে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে খোয়াই, সোনাঝুরিতে।

কথা মতোই পৌষমেলার আগে মেলার মাঠ সেজে ওঠার সঙ্গেই সাজছে ‘খোয়াই বনের অন্য হাট’। রাজ্য পর্যটন দফতর, জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব বাঁশের মাচা। মোট ১০টি মাচা তৈরি করা হচ্ছে। খোয়াইয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কোনও গাছ না কেটেই তৈরি হচ্ছে এই মাচা। কোথাও ইউক্যালিপটাস, কোথাও আবার সোনাঝুরি গাছকে ঘিরে নিচে বাঁশের মাচা, উপরে বাঁশেরই ছাউনি দিয়ে তৈরি হচ্ছে পর্যটকদের বসার জায়গা। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে একটি বাউল মঞ্চও। সেখানেই মেলার কদিন পরিবেশিত হবে বাউল গান।


আসলে এই হাটের উদ্দেশ্য ছিল সকলের মধ্যে একপ্রকার সহজ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা। যোগাযোগের একমাত্র সেতু হল হাট। বর্ণ-জাতি ভেদাভেদ না রেখে সবাই এখানে আসবেন, পছন্দ হলে কিনবেন, সবুজের মাঝে খুঁজে পাবেন নিজেকে। আর তার সঙ্গে প্রতিবেশী গ্রাম থেকে আসা মানুষগুলোর রুজিরুটি একটু হলেও চওড়া রাস্তা দেখবে। এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই কলাভবনের এক প্রাক্তনীর উদ্যোগে শুরু হয়েছিল খোয়াই বা সোনাঝুরি হাট। সোনাঝুরি নতুন আলো দেখছে। গ্রাম ছাড়া এই রাঙা মাটির পথ ধরে কোনো এক উদাস বাউল এখনও আসেন গান শোনাতে। প্রেমিক-প্রেমিকাদ্বয় এখনও সাইকেলের প্যাডেলে তুফান তুলে রোজ একবার ঢুঁ মেরে যান। বিদেশীরা পা মেলান সাঁওতালদের নাচে। মাদলের বোলে আজও নেচে ওঠে আট থেকে আশির প্রাণ। শান্তিনিকেতন আসলে আমাদের স্বভাবে জুড়ে আছে। হৃদয়ে অভাব এলে একবার সোনাঝুরি-খোয়াই-এ পা দেবেন, তারা আপনাকে আপন করবেই। আপনার স্বভাবে তারা চড়ুই পাখি হয়ে ডানা মেলবে। মেলবেই।
