অচল ল্যান্ডফোনের যুগে এখনও কেউ কেউ ডায়াল করেন অঞ্জনের বেলা বোস’কে

অঞ্জন দত্তের ‘বেলা বোস’রা দেশ-কাল পেরিয়ে সবার অলক্ষ্যেই আসলে চিরকালের হয়ে গেছে

নতুন ছবি সম্পর্কে বলতে গিয়ে কমবেশি সব পরিচালকই বলেন, ‘এমন ছবি আগে হয়নি…’। কিন্তু তিনি অবলীলায় বলেন, তাঁর ছবি কোন্ কোন্ ‘রেফারেন্স’ থেকে তৈরি। একটুও রাখঢাক না করে তিনি জানান তাঁর পরিচালিত ‘ব্যোমকেশ’ বানিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে, কিন্তু সেটা তাঁর সেরা কাজ নয়। গল্পের খাতিরে কোনো নতুন ‘এক্সপেরিমেন্ট’ তিনি সেখানে করতে পারছিলেন না। তাই নিশ্চিত সাফল্যের পরেও ‘ব্যোমকেশ’-এর লেগাসি ছেড়ে তিনি বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতের গিটারে বাঙালি বোহেমিয়ান হয়, তাঁর কালো চশমার আড়ালে-আবডালে তাঁকে নিয়ে নানা কথার জোয়ার এলেও তাঁকে উপেক্ষা করা যায় না কোনোমতেই। এমনই সোজাসাপটা, মেজাজি, নিজস্ব চালচলনে স্বতন্ত্র এক অভিনেতা, গীতিকার, চিত্র পরিচালক, গায়ক অঞ্জন দত্ত।

মৃণাল সেনের ছবিতে অঞ্জন দত্ত

নব্বই দশকের শুরুর দিকে জীবনযাত্রার নিজস্ব ছন্দেই বাংলা গান জীবনমুখী নামের এক বিশেষ ছাঁচকে ছুঁয়েছে। সেইসময় যে ক’জন বাঙালি তাঁর লেখা ও সুরে বুঁদ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অঞ্জন দত্ত এক বিশেষ জঁনার। সেই থেকে বাঙালির প্রথম কলেজ প্রেম, বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা প্রেমিকার সাহস, মিথ্যে কথার জঞ্জালে ঘেরা শহরেও গড়ে ওঠা ‘তোমার আমার লাল নীল সংসার’-এর চির দোসর অঞ্জন দত্ত। অথচ, এই মানুষটি নাকি হতে চেয়েছিলেন অন্যরকম। “গান গেয়ে আমার নামডাক হয়েছে। গান গেয়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি কাছে এসেছি, ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু সত্যি কথা হলো, জীবনে যা হতে চেয়েছি, তা হতে পারিনি। সত্যি এ জীবনে আমি ভালো অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম কিন্তু তা হতে পারিনি।” 

১৯৮১ সাল থেকে সিনেমায় অভিনয় অঞ্জনের। ‘যুগান্ত’, ‘অন্তরীন’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘একদিন আচানক’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-সহ সমসাময়িক বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সিনেমায় অভিনেতা অঞ্জন দত্তকে দেখা গেলেও এ কথা সত্যি অভিনেতা অঞ্জন থেকে মানুষ অনেক বেশি মেতে থাকে গায়ক অঞ্জন দত্তে, পরিচালক অঞ্জন দত্তে। নিজেই তাই হয়তো বলেছেন, ‘গান না গাইলে হারিয়ে যেতাম।’ 

'খারিজ' চলচ্চিত্রে অঞ্জন-মমতা

অঞ্জনের গানের চরিত্ররা তাঁর ছোটোবেলা, তাঁর বড়োবেলার দোসর। অঞ্জন দত্তের সিনেমারা তাঁর চারপাশ ও আত্ম-জিজ্ঞাসার ‘সিগনেচার’। তাই হয়তো, অঞ্জনের সিনেমা ও তাঁর গান প্রায় একইরকম। আর ওই ‘মনোটনি’ই অঞ্জনের বৈশিষ্ট্য, ওইটিই তাঁর স্বতন্ত্রতা। কলকাতায় জন্মালেও মাত্র ছ’বছর বয়সে দার্জিলিংয়ে চলে যাওয়া, কুয়াশা ঢাকা সাদা সেন্ট পলস্ স্কুলটায় কাটানো প্রায় ‘অ্যাংলো’ ভাবের ছোটোবেলা, কিশোর বয়সে গানের দিদিমণির প্রেমে পড়া, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করা, জীবনের একাকিত্ব, সহজতা এসব কিছুই ছুঁয়ে যায় অঞ্জন দত্তের গানকে, তাঁর সিনেমাকে। ‘মাথার ভেতর এলভিস প্রিসলি আর খাতার ভেতর ম্যারি এ্যান’-কে নিয়ে বাঙালিকে স্বপ্ন দেখার ‘ব্যারাম’ উপহার দেন অঞ্জন। প্রেমহীন বৃষ্টির বিকেলেও অঞ্জন দত্ত পাশে এসে বসেন। কেবল কথা দিয়েই ভিজে যাওয়া দুজোড়া চটি, জামা, জুতোর জলছবি আঁকেন অজান্তে। 

অঞ্জন দত্তের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি

ফসিল হতে বসা ল্যান্ডফোনের এই যুগে এখনও অঞ্জন দত্ত বারবার বাধ্য করেন ‘২৪৪১১৩৯…’ ডায়াল করতে। অঞ্জন দত্তের ‘বেলা বোস’রা দেশ কাল পেরিয়ে সবার অলক্ষ্যেই আসলে চিরকালের হয়ে গেছে। শুধু কি বড়োরা! অঞ্জন দত্তের ঝুলিতে ছোটোরাও আছে। একলা ফ্ল্যাটে বন্দি ছোটোবেলাকে অঞ্জন মুক্তির স্বাদ দেন, ‘আমি বলি কি একটা চালাকি করে দেখ না/ জানলা দিয়ে ঐ আকাশটাকে দেখ টিভি দেখ না’। 

জীবনের সব ভালো মন্দ, ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়েই অঞ্জন দত্ত নিজেই নিজের সামনে দাঁড়ানোর ‘ধক’ দেখান। তাঁর ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’ তাই নিছক সিনেমা হিসেবে না থেকে আত্মদর্শনের এক বিরাট সুযোগ করে দেয় অঞ্জনকে। স্কুলে পড়া বয়সেই মিউজিক টিচার ব্ল্যাকলির উৎসাহে স্কুল প্লে-তে অভিনয় করতেন অঞ্জন। সেই স্মৃতি তো ছিলই। এরপর কলেজে পড়ার সময়ও ইংরেজি নাটকের ক্লাস অঞ্জন দত্তের ভিতর অভিনয় শেখা, অভিনয় করার ইচ্ছেটাকে লালন করে গেছে সযত্নে। প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের কাছে অভিনয় শিখেছেন অঞ্জন। ‘থিয়েটার’ বলে নিজের একটি নাটকের দলও খুলেছিলেন। এরপর আর্থিক প্রয়োজনেই ‘স্টেটসম্যান’-এ চাকরি নেওয়া, নাটকের রিভিউ লেখা, থিয়েটারের সূত্রেই সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া, মৃণাল সেনের সঙ্গে কাজ করা, সেরা নবাগত অভিনেতার স্বীকৃতি পাওয়া, অভিনয়ের টানেই জার্মানিতে দীর্ঘদিন থাকা ও অভিনয়ের খুঁটিনাটি শেখা এইসবই পরবর্তীতে অঞ্জন দত্তের সিনেমা এমনকি তাঁর গানেও খুব বেশি করে প্রভাব ফেলেছে। 

অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ছবি 'দ্য বং কানেকশন'

“সব প্রজন্মেই প্রথা ভাঙার একটা প্রবণতা থাকে। এই প্রজন্মের ছেলে মেয়ের মধ্যেও আছে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে কোথাও যেন তারা প্রথার সঙ্গেই জড়িয়ে যায়। আধুনিকতার ক্রাইসিস ভেঙে ফেলেও পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা, একাকিত্বের টানাপোড়েন প্রতিটি ঘরের সমস্যা। সেটাই আমার ছবির বিষয়।” এভাবেই নিজের ছবিকে ব্যাখ্যা করেন অঞ্জন। 

অঞ্জন দত্ত নির্দেশিত ও অভিনীত থিয়েটার প্রযোজনা 'সেলসম্যানের সংসার'

‘বো ব্যারাকস ফরএভার’, ‘দ্য বং কানেকশন’, ‘চলো লেটস গো’, ‘ম্যাডলি বাঙালি’, ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’… তালিকাটা দীর্ঘ, কিন্তু সবেতেই অঞ্জনোচিত এই ধাঁচটি বেঁচে থাকে। বয়সে বড়ো হলেও দেরিতে কাজ শুরু করার জন্য অঞ্জন দত্ত ছবিতে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল, সৃজিত মুখার্জি, মৈনাক ভৌমিক প্রমুখের সমসাময়িক। অঞ্জন নিজেই বলেন, ‘এই সঙ্গটা আমি উপভোগ করি। আর সে জন্যই হতাশা আমাকে গ্রাস করেনি।’ ছেলে নীল ও স্ত্রী ছন্দাকে নিয়ে অঞ্জনের মেজাজি সংসার। দুম করে বলে দেওয়া কথার বাণকেও অঞ্জন ফিরিয়ে নিতে পারেন ‘সরি’ বলে। ভুল হলে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াতে জীবনকেই আরও একটু সম্মানিত করা যায় এমনটা এখনও মনে করেন ষাটোর্দ্ধ এই চির তরুণ। এই অঞ্জন দত্তই তো তাই বলতে পারেন, ‘শেষ বলে কিছু নেই। শেষ যেখানে, জেনো শুরু সেখানে।’
 
শুভ জন্মদিন শেষ না হওয়া শুরুর স্বপ্নকারিগর। চিরসবুজ শুভেচ্ছা আপনাকে।

Developed by DXDasia