
পাখির চোখ পঞ্চকেদার – প্রথম পর্ব
আকাশের গায়ে কান পাতলে, প্রতিনিয়ত এখানে শোনা যায় ‘ওম্’কার। কলকল করে বয়ে আসা উচ্ছ্বল তরঙ্গে, এখানকার প্রকৃতি গল্প বলে চলে অবিরাম। সে গল্পে মিশে থাকে হাজার হাজার বছরের মিথ, মিশে থাকে কিংবদন্তি অথবা প্রাচীন পুরাণ। ইট, কাঠ, পাথরের দৌরাত্ম্য বাড়লেও, এ জায়গা অধ্যাত্মপিপাসু মানুষের কাছে আজও পরিচিত ‘দেবভূমি’ (Devabhumi) বলে। আর প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় পর্যটকের কাছে, এর পরিচিত পোশাকি নাম ‘উত্তরাখণ্ড’ (Uttarakhand)। গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে অবস্থিত উত্তরাখণ্ডের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, রোমহর্ষক ট্রেক রুট হল ‘পঞ্চকেদার’ (Panchakedar)। কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর এই পাঁচটি শৈব ক্ষেত্রের সমাহার এই ‘পঞ্চকেদার’। তীর্থের পুণ্যের সঙ্গে প্রকৃতির ভয়াল সৌন্দর্যকে চাক্ষুস করতে প্রতি বছর দলে দলে মানুষ চলেছেন পঞ্চকেদারে। প্রকৃতির প্রতিশোধের আগুনে পুরোনো পরিচিত পাহাড়ি রাস্তা ধসে গেছে কখনও, প্রিয়জন হারিয়ে গেছে, জনপদও হারিয়ে গেছে কখনওবা। তবু, মানুষই আবার ঠিক খুঁজে বের করেছে নতুন বিকল্প, নতুন পথ। কতটা দুর্গম এই যাত্রাপথ, কতদিন সময়ই বা লাগে এই পাঁচ শৈবতীর্থকে ছুঁতে, কতটা প্রাচীন এই পাঁচ কেদার ধাম, কী তাদের সৃষ্টিরহস্য, সেইসব খুঁটিনাটি জানতে জানতেই চলুন ঘুরে দেখি ‘পঞ্চকেদার’।

পর্বঃ ১
মহাভারতের সঙ্গে বিশেষভাবে নাকি জুড়ে আছে এই ‘পঞ্চকেদার’ (Panchakedar)। প্রচলিত কিংবদন্তি ও বহু পুরোনো মিথ, চাঁদে যেমন কলঙ্ক আছে, তেমনই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর কলঙ্কের দাগ লাগে পঞ্চপাণ্ডবের মনে। যুদ্ধের ভয়াবহ ফল, আত্মীয় পরিজন বিয়োগ, রক্তের বৃষ্টি এসবের মাঝেই পাঁচ ভাইকে ঘিরে ধরে এক গ্লানিবোধ। মহর্ষি বেদব্যাসের পরামর্শে, স্বজন হত্যার এই পাপস্খালনে কাশী বিশ্বনাথ দর্শনে গেলেন তাঁরা। এদিকে দেবাদিদেবও তাঁর ভক্তদের ধৈর্য আর পবিত্রতার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। তাই সেখানে দর্শন দিলেন না শিব। ঘুরে ঘুরে বেড়ালেন মন্দাকিনী ও অলকানন্দার মাঝ বরাবর বিস্তীর্ণ এই কেদারখণ্ডে। পঞ্চপাণ্ডবও নাছোড়বান্দা, তাঁরাও পিছু নিলেন মহাদেবের। শিব যখন বৃষরূপ ধারণ করলেন তাঁর এই পাঁচ ভক্তের থেকে আড়াল হতে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমও গুপ্তকাশীতে জাপটে ধরলেন সেই ষাঁড়কে। বৃষরূপী শঙ্করের অঙ্গ টুকরো হয়ে তখন ছড়িয়ে পড়ল পাঁচটি জায়গায়। কেদারে বৃষের পিঠের দিক, মদমহেশ্বরে নাভিমূল, তুঙ্গনাথে দুই বাহু, রুদ্রনাথে মুখ এবং কল্পেশ্বরে জটা – এইভাবেই শিব শরীরে পুণ্য হল কেদারখণ্ডের পাঁচটি অংশ। পঞ্চপাণ্ডবের সদিচ্ছায় এরপর এই পাঁচটি জায়গাতেই শিব ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। জন্ম নেয় পঞ্চকেদার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আদিগুরু শঙ্করাচার্যের হাতে, অষ্টম শতাব্দীতে এই পাঁচকেদারের বর্তমান যে মন্দিরগুলি রয়েছে তার সিংহভাগেরই পুনর্প্রতিষ্ঠা। হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের সম্মিলনে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরগুলির গঠনশৈলীতে তাই বৌদ্ধ মন্দিরের ছোঁয়া।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আদিগুরু শঙ্করাচার্যের হাতে, অষ্টম শতাব্দীতে এই পাঁচকেদারের বর্তমান যে মন্দিরগুলি রয়েছে তার সিংহভাগেরই পুনর্প্রতিষ্ঠা। হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের সম্মিলনে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরগুলির গঠনশৈলীতে তাই বৌদ্ধ মন্দিরের ছোঁয়া।
পঞ্চকেদারের প্রথম কেদার ধাম পৃথিবীখ্যাত কেদারনাথ (Kedarnath)। জনশ্রুতি, বৃষরূপী শিবের পিঠের কুঁজ পড়েছিল এখানে। ষাঁড়ের পিঠের আকারের ত্রিকোণাকৃতি শিলার তাই পুজো হয় নিয়মিত। এই জায়গাটিরই পূর্বনাম ছিল কেদারখণ্ড। আর সেই খণ্ডের অধিষ্ঠিত দেবতা হিসাবে মহাদেবের এখানে নাম হয় কেদারনাথ। একদিকে ২২ হাজার ফুট উঁচু কেদারনাথ পর্বত, আর একদিকে ২১ হাজার ৬০০ ফুট উঁচু স্পেন্ডকুণ্ড এবং অন্য আর একদিকে ২২ হাজার ৭০০ ফুট উঁচু ভারত কুণ্ড পর্বত দিয়ে ঘেরা এই মন্দির হিন্দু ধর্মাচারণের এক লোকপ্রিয় শৈবক্ষেত্র। বিখ্যাত চারধাম যাত্রার অন্যতম প্রধান এই ‘ধাম’, দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম জ্যোতির্লিঙ্গও বটে।

কেদারনাথ পঞ্চ নদীর মিলনস্থলও। মন্দাকিনী, মধুগঙ্গা, ক্ষীরগঙ্গা, সরস্বতী এবং স্বর্ণগৌরী এই পাঁচ নদী মিলেছিল কেদারনাথেই। সব নদীগুলির অবশ্য এখন আর অস্তিত্ব নেই। তবে মন্দিরের ডান পাশ দিয়ে মন্দকিনী আজও প্রবল বেগে বহমান। প্রবল শীত এবং বরফপাতের জন্য কেদারনাথ মন্দির প্রতিবছর নভেম্বরের শুরু থেকে মে মাসে অক্ষয় তৃতীয়ার আগে পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এই ছ’মাস কেদারশিলার প্রতীক পুজো হয় উখীমঠের ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরে। পাঁজি দেখে পুণ্য লগ্নে এই উখীমঠ থেকেই কেদারনাথের ডোলিযাত্রা শুরু হয় কেদারখণ্ডের উদ্দেশ্যে। সমুদ্রতল থেকে ৩৫৮৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই কেদারনাথে শীতে যেমন প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে, বরফ জমে কয়েক ইঞ্চি পুরু হয়, বর্ষাতেও তেমনই হয় অঝোরে বৃষ্টি। ২০১৩ সালের ১৭ জুন, আগের তিনদিন ধরে হয়ে চলা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতেই কেদার পর্বতের চোরাবারি গ্লেসিয়ার ফেটে বিধ্বংসী বন্যায় বিপর্যস্ত হয় কেদারখণ্ড। ধ্বস নামে বহু জায়গায়। মন্দাকিনীর স্রোত কেড়ে নেয় হাজার হাজার প্রাণ। সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক বিরাট শিলাপাথর ঢাল হয়ে দাঁড়ায় কেদারনাথ মন্দির চত্বরের পেছনে। ফলে তীব্র জলস্রোতের হাত থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে যায় মন্দিরটি। অক্ষত থাকে মূল মন্দিরের সবটাই। মন্দাকিনীরও গতিপথ পাল্টে যায়।

শোনপ্রয়াগ (Sonprayag) থেকে গৌরীকুণ্ড (Gaurikund) হয়ে কেদারনাথ পৌঁছনোর ট্রেকিং পথেরও সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয় সেই বিপর্যয়ের পর। আগে হরিদ্বার থেকে দীর্ঘক্ষণের পাহাড়ি পথে গৌরীকুণ্ড পৌঁছে ১৪ কিলোমিটার চড়াই পথে পায়ে হেঁটে অথবা ঘোড়া, ডুলি বা পিট্টুতে চড়ে পৌঁছাতে হত কেদারনাথ। কিন্তু প্রকৃতির রোষে গৌরীকুণ্ড থেকে জঙ্গল চটি, চিরবাসা ভৈরব, রামওয়াড়া, গরুর চটি হয়ে কেদারনাথ পৌঁছনোর পায়ে চলা সেই পথ আজ প্রায় অনেকাংশেই ধ্বংস হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে মন্দাকিনীর তীরে অবস্থিত গোটা রামওয়াড়া গ্রামটাই। ২০১৪ সাল থেকে উত্তরাখণ্ড সরকার, নেহেরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং এবং ইন্ডিয়ান আর্মির অক্লান্ত পরিশ্রমে কেদারনাথের যে নতুন পথটি চালু করেছেন তা হল, শোনপ্রয়াগ থেকে গৌরীকুণ্ড পৌঁছে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে জঙ্গল চটি, ভীমাবলি, আপার ও লোয়ার লিঞ্চোলি, বেসক্যাম্প পেরিয়ে কেদারনাথ মন্দির। আগে যে পথ ছিল ১৪ কিলোমিটার, মন্দাকিনীর রোষে সেই পুরোনো পথ ধসে গিয়ে নতুন তৈরি পথ বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমবেশী ১৬ কিলোমিটার। ফলে আগের চেয়ে যাত্রাপথের সময়ও কিছুটা বেড়েছে। তবে নতুন এই রাস্তা অনেকটাই প্রশস্ত এবং তুলনায় সুগম। কিন্তু এখনকার কংক্রিটের হাঁটা পথে চলার একমাত্র সমস্যা বর্ষার জলে পিছলে গিয়ে পা হড়কে যাওয়ার ভয়। নতুন সেই পথ কতটা দুর্গম, হরিদ্বার থেকে কেদারনাথ পৌঁছনোর এই দীর্ঘপথে কতক্ষণই বা সময় লাগবে, সেই হালহকিকত নিয়েই হাজির থাকব পরের পর্বে।
চলবে…
__________________
*কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর – পঞ্চকেদারের রোমহর্ষক ভ্রমণকাহিনি এবার বঙ্গদর্শনে। পড়ুন পিয়ালী বসুর ধারাবাহিক। প্রতি শুক্রবার, দুপুর ৩টেয়।
