
ছোটো থেকেই সংগীতশিল্পী হবার সাধ, লড়াই চলছে এখনও
স্কুলে পড়ার সময় ক্লাসে প্রতিবছরই ভালো ফল করতেন তিনি। স্কুলের সহপাঠী থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা সবাই তাঁকে প্রশ্ন করতেন, বড়ো হয়ে তুমি কী হতে চাও, তোমার স্বপ্ন কী। রোমি জবাব দিতেন, সংগীতশিল্পী হতে চাই। সবাই অবাক হয়ে যেতেন। সকলে ভাবতেন, এত 'মেধাবী' মেয়ে অথচ সংগীতশিল্পী হওয়ার কথা কেন বলে!
রোমি মুখার্জী, স্কুলের পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই সংগীতশিল্পী হওয়ার যে লড়াইয়ে নেমেছেন, আজও তা চলছে। পড়াশোনা বলতে বায়ো টেকনোলজিতে এমএসসি পাশ করেছেন। মুম্বাইয়ের একটি বড়ো বেসরকারি সংস্থায় এখন কর্মরত। সংগীতশিল্পী হওয়ার দৌড়ে ভয়ানক লড়াই চালিয়ে রোমি এখন ধীরে ধীরে পা রাখতে শুরু করেছেন মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে।
মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওতে ভাড়া থাকেন রোমি। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন।
রোমির বাড়ি শিলিগুড়ি আশিঘর মোড়ে। বাংলা থেকে মুম্বাইয়ের মতো শহরে গিয়ে টানা লড়াই চালিয়ে জায়গা করা সহজ কাজ নয়। রোমি সেই জায়গা তৈরির জন্য দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি পায় হিন্দি ছবি 'লিটল বয়'। সেখানে একটি ডুয়েট গান 'রাব্বা মেরে রাব্বা'তে সংগীতশিল্পী দেব নিয়োগীর সঙ্গে নিজের গলাকে জায়গা করাতে পেরেছেন রোমি। ছবিতে অন্য গানগুলি গেয়েছেন সোনু নিগম-সহ অন্যান্য শিল্পীরা। এছাড়া মুম্বাইতে থেকেই গুজরাটি ছবি ‘হদ থাই গাই’ এবং মারাঠি ছবি ‘এক রুপাইছি যাত্রা’তে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এই শিলিগুড়ি কন্যা।
মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওতে ভাড়া থাকেন রোমি। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই গান নিয়ে চর্চা চালিয়ে যান। বিগত পাঁচ বছর ধরে রোমি মুম্বাইতে রয়েছেন। ফিল্মের সঙ্গীত জগতে নিজের জায়গা করার জন্য অনেক ঝুঁকিও নিতে হয়েছে তাঁকে। অনেক সময় ভুল লোকের পাল্লায় পড়েছেন। অনেকরকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেও পড়তে হয়েছে। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেসব পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। তবে লড়াই ছাড়েননি। শুরুর দিকে নিজেরা দু-তিনজন শিল্পী মিলে একটি ব্যান্ডও তৈরি করেছিলেন। সেই ব্যান্ড নিয়ে তাঁরা আমন্ত্রণ না পেলেও সরাসরি কোথাও পৌঁছে নিজেরাই গান গাওয়া শুরু করে দিতেন। এভাবে একদিন অভিনেতা শহিদ কাপুরের রিসেপশন পার্টিতে গিয়ে গান গাওয়া শুরু করেন। আবার একদিন সোনু নিগমের জন্মদিন শুনে এক ঘণ্টার মধ্যে গান বানিয়ে পৌঁছে যান সোনু নিগমের বাড়ির সামনে। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষী বাড়িতে প্রবেশ করতে দিতে চান না। অনেক অনুনয়বিনয় করে সোনু নিগমের বাড়িতে প্রবেশ করে তার ওপর তৈরি সে গান গেয়ে ছবি তুলে আসেন। এভাবে মুম্বাইয়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপেও নিজেরা গান তৈরি করে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রচার পান।
সংগীত জগতে নিজের জায়গা করার জন্য অনেক ঝুঁকিও নিতে হয়েছে তাঁকে।
গত ৪ মার্চ বেসরকারি সংস্থা থেকে ছুটি নিয়ে শিলিগুড়ির বাড়িতে আসেন রোমি। মুম্বাই ফিরে যাওয়ার আগে আটকে পড়েন লকডাউনে। এখনও শিলিগুড়িতেই আছেন। সেখান থেকেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে করোনা দুর্যোগের জেরে ঘরবন্দি অবস্থা থেকেও মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতার শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে করোনার ওপর বিভিন্ন ইতিবাচক তৈরি করে যাচ্ছেন।
বলিউডের বিখ্যাত গীতিকার আরাফত মেহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তৈরি হয়েছে সংগীত ‘আলবিদা রহে গিয়া’। শিলিগুড়ি থেকে সেই গানে সুর দিয়েছেন রোমি। সুশান্ত সিং রাজপুত সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন, করোনার এই দুর্যোগ পর্বে আরও অনেকে প্রয়াত হয়েছেন। অনেকে করোনায় মারা গিয়েছেন। আবার এই পর্বেই চিন সীমান্তে কয়েকজন ভারতীয় সেনা জওয়ান শহিদ হয়েছেন। তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি হয়েছে 'আলবিদা রহে গিয়া'। এভাবে করোনার ওপর শিলিগুড়িতে ঘরবন্দি অবস্থায় আরও কিছু সংগীত সৃজন করেছেন রোমি। কোভিড-১৯ পজিটিভিটি মিউজিক্যাল ক্যাম্পেনেও নিজের অবদান রাখছেন শিলিগুড়ির এই শিল্পী।
একসময় তিনি ইন্ডিয়ান আইডল এবং নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া আইডল সংগীত প্রতিযোগিতাতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবার এর মধ্যে সামাজিক কাজও করছেন। মুম্বাইয়ের বাঙালিদের সামাজিক কাজ করার একটি সংস্থায় রোমি তাঁর কাজের অবদান রেখেছেন। রোমি বলেন, স্বপ্ন আমার এটাই যে একদিন সংগীত জগতে সবাই আমাকে এক ডাকে চিনবেন। সেই স্বপ্নের জন্যই এখন লড়াই সাধনা চলছে। শুধু গান করাই নয়, মিউজিক কম্পোজার হিসাবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেসব মিউজিক হারিয়ে গিয়েছে, সেসব আবার নতুন করে করতে চাই। রোমির ইচ্ছে, নিজেকে সংগীত জগতে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে থাকা প্রতিভাবানদের সুযোগ করে দেওয়া।
অসমের বঙ্গাইগাঁওতে রোমির জন্ম। বাবা বিকাশ মুখার্জী রেলে চাকরি করতেন। সেখানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে শিলিগুড়ি চলে আসেন। এরপর ভুবনেশ্বরে বায়োটেকনোলজিতে বিএসসি, তারপর পুনে থেকে এমএসসি। টানা পাঁচ বছরের লড়াইয়ে সামান্য কিছু জায়গা করেছেন। এখনও অনেক পথ চলা বাকি।
