
বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা নিয়ে থাকেন টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে
এক বছর আগেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। করোনার প্রথম ঢেউয়ের লকডাউনের আগে প্রায় প্রতিদিন বাড়িতে মাছ-মাংস রান্না হত, চার চাকার গাড়িতে দূর-দূরান্তে রোগী দেখতে যাওয়া হত। এখন সেসব বন্ধ। চার চাকার গাড়িটায় এখন ধুলোর পাহাড়। এখন একদিন বাড়িতে পঞ্চাশ টাকার মাছ এলে দু’তিনদিন তা দিয়েই চলে। এভাবেই শিলিগুড়ি ইসকন মন্দির লাগোয়া বানেশ্বর মোড়ের বাসিন্দা তথা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডাঃ স্বপন রায়ের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে করোনা।
রোজগার কমে যাওয়ায় জীবনে আমূল পরিবর্তন এলেও গরিব মানুষদের জন্য বিনা পয়সায় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাজ থেকে তিনি এক পা-ও পিছিয়ে আসেননি, বরং করোনাসংকটে আরও বেশি করে গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। শিলিগুড়ি শহর লাগোয়া জলপাইগুড়ি জেলার বেলাকোবার বনবস্তি নোধাবাড়ি, আমবাড়ি, ফারাবাড়ি সর্বত্র তিনি ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসাবে জনপ্রিয়। তাঁর এই বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার জন্য বহু মানুষ তাঁকে সেলাম জানাচ্ছেন। শুধু বিনা পয়সায় রোগী দেখা নয়, বিনা পয়সায় গরিব মানুষদের জন্য ওষুধও বিলি করছেন তিনি। বিভিন্ন অঞ্চলে শিবির করে নিরলসভাবে মানুষের সেবা করে চলেছেন ডাঃ স্বপন রায়।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবেন। কিন্তু তাঁর বাবা ছিলেন সামান্য প্যান্ডেল শ্রমিক। অভাবী ঘরের ছোট ছেলেটি পাড়াপড়শিদের কাছে বড়ো হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের কথা জানালে অনেকেই টিপ্পনি কেটে বলতো, “গরিবের ঘর থেকে ডাক্তার হওয়া কি সহজ কথা? গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল!” তাঁদের কথায় মনে ব্যথা পেলেও মনের জেদ আরও বেড়ে যেত তাঁর। এভাবেই তিনি যখন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হচ্ছেন, একদিন তাঁর বাবা অসুস্থ হয় পড়েন। বাবাকে চিকিৎসার জন্য শহরের বড়ো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, কিন্তু হাজার টাকা ভিজিট আর দুহাজার টাকার ওষুধ কেনার সামর্থ ছিল না তাঁর পরিবারের। মারা যান তাঁর বাবা। তখন থেকে মনে আরও বেশি করে জেদ চেপে বসে, ডাক্তার তাঁকে হতেই হবে এবং বিনা পয়সায় গরিব মানুষের চিকিৎসা করতে হবে। সেই জেদ থেকেই হোমিওপ্যাথি কলেজে পড়াশোনা এবং ডাক্তারি পাশ করা।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ডাঃ স্বপন রায় শিলিগুড়ি শহর লাগোয়া বনবস্তিগুলিতে গিয়ে গরিব মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। এমনকী গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়া থেকে শুরু করে স্ত্রী’র সোনার গয়না পর্যন্ত বন্ধক রেখেছেন তিনি। চিকিৎসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র তাঁকে এভাবেই সংগ্রহ করতে হয়েছে শুরুতে। এখন এই করোনা দুর্যোগের সময় তিনি সেইসব ওষুধ দিয়েই জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্টের রোগী সামাল দিয়ে চলেছেন। বহু মানুষ তাঁর সেবায় সুস্থ হয়ে উঠছেন। চার চাকার গাড়ি ছেড়ে তিনি এখন দুচাকার বাইক নিয়ে বনবস্তিতে চলে যান রোগী দেখার কাজে। তাঁর কথায়, শিলিগুড়ি শহর থেকে একশ দেড়শ কিলোমিটার ভিতরে অবস্থিত বস্তিগুলির বাসিন্দারা শহরে আসার গাড়িভাড়াটুকু জোগাড় করতে হিমিশিম খান, তাঁরা শহরে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন কি করে? আমি এইসব মানুষদের কাছে বিনা পয়সায় ওষুধ পৌঁছে দিতে চেষ্টা করি।
সামান্য টিনের ছাউনি দেওয়া সামান্য ঘরেই থাকেন স্বপনবাবু। ঘরে তাঁর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা রয়েছেন। সংসার চলে কি করে? এই প্রশ্ন করলে ৪১ বছর বয়সী ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসাবে জনপ্রিয় ডাঃ স্বপন রায় বলেন, ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়ি। যাঁদের সম্বল আছে, যাঁরা আমায় অনকল-এ দেখাতে চান, তাঁদের থেকে সামান্য কিছু ভিজিট নিই। আর সেই টাকাতে কোনো মতে ডালভাত জুটে যায়। তিনি আরও বলেন, “বিনা চিকিৎসায় কোনো গরিব মানুষের মৃত্যু হতে দেবো না।” সপ্তাহে একদিন ডুয়ার্সের পদ্মশ্রী করিমূল হকের হাসপাতালেও বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির করেন তিনি। মন্ত্রী, বিধায়ক সকলের কাছে একটি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে লিখিত আবেদন পেশ করেছেন। তাঁর ধারণা অ্যাম্বুলেন্স পেলে গরিব মানুষের চিকিৎসা আরও ভালোভাবে করা যাবে এবং অনেকের প্রানও বাঁচানো সম্ভব হবে।
