
কাঁটা তারের ওপারে, নিজের শিকড়ের সন্ধানে দেশের স্বনামধন্য ক্যামেরাম্যান অমিত সেন
“In all of us there is a hunger, marrow-deep, to know our heritage to know who we are and where we have come from. Without this enriching knowledge, there is hollow yearning. No matter what our attainments in life, there is still a vacuum, emptiness and the most disquieting loneliness.’’ -Alex Haley (Roots).
আমি এখন কলকাতার বাসিন্দা। বাসিন্দা বলতেই আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে আমার শিকড়টি কোথায় বাঁধা আছে। পূর্ব পুরুষদের কাছে শুনেছি আমাদের আদিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলাদেশের বরিশালা জেলার বেউখির গ্রামে। চলচ্চিত্র বিষয়ের ছাত্র হওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন ও ফিল্ম বানানোর সুবাদে অনেক বার বাংলাদেশে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু বরিশালে যাওয়া হয় নি কখনও। তাই বলতে পারি যে, খুঁজিনি নিজের শিকড়। কলকাতায় অনেক মানুষ আছেন যাঁদের আদিবাস ছিল বরিশাল। তাঁরা তাদের পূর্বপুরুষের কাছে শুনেছেন বরিশালের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভৌগলিক অবস্থা এবং পূর্ব পুরুষের ভিটে ছাড়ার গল্প। কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সুগন্ধা, কচা, বিষখালি বা পয়রার বাঁকে বাঁকে মিশে থাকা গান আর পুঁথির পাঁচালি চালের সুরও তাঁদের খুব চেনা। একই সাথে তাঁরা অবাক হয়ে চিনেছেন মায়ার শুভ্রতার সাথে মিশে থাকা অজ্ঞতা নিমজ্জিত লোলুপ হিংস্র বর্বরতারও। বাধ্য হয়েই বুঝে নিয়েছেন ভূ-রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় তাঁরা শিকড়হীন ছিন্নমূল এবং ভিনদেশি নাগরিক। ভিসা নিয়ে আজ বাংলাদেশে মানে স্বভূমিতে, জন্ম ভিটেতে ঢুকতে হয়।
চলচিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত প্রায় সব ছবিতেই দেশ ভাগের যন্ত্রণার প্রতিফলন দেখতে পাই। কোমল গান্ধারে পদ্মা পারে থমকে যাওয়া রেললাইনের হল্টে দাঁড়িয়ে অনুসূয়ার (সুপ্রিয়া চৌধুরি) ভৃগুর (অবিনাশ বন্দোপাধ্যায়) উদ্দেশ্যে বলা সেই বেদনাভরা আক্ষেপ, ‘জানেন ওপারে না পূর্ববাংলা, এটা পদ্মা… ওপারে কোথাও আমার দেশের বাড়ি।’
আর কালক্ষেপ করলে চলবে না। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে সোজা চলে এলাম ঢাকা। দল বাঁধলাম সম মনভাবাপন্ন চিত্রনির্মাতা রাসেল আহমেদ, তরুন ফোটোগ্রাফার ঈয়ন আর তরুণ সঙ্গীত শিল্পী নাজমু্ল হুদা-র সঙ্গে। সবারই উদ্দেশ্য এক, বরিশালের বেউখির গ্রাম, আমার পূর্বপুরুষের ভিটে।
ঢাকার সদর ঘাট থেকে স্টিমার ছাড়ল, বরিশালের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। স্টিমারে রাত কাটিয়ে খুব ভোরে আমরা বরিশালে এসে পৌঁছালাম। কীর্তনখোলা নদীর পারে তখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ জমা হচ্ছে, যা ঢাকা হয়ে সম্ভবত বিদেশে পাড়ি জমাবে। একটা মাইক্রো বাসে চড়ে সবুজের বুক চিড়ে পিচ্ রাস্তা দিয়ে ছুটে চললাম শহর ছেড়ে ঝালকাঠির দিকে। গাড়িতে সবাই তখন – নাজমুলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান ধরেছে- “গঙ্গাবুড়ি গঙ্গাবুড়ি শোনো, ত্রতো সুন্দর নামটা তোমার কে দিয়েছে বল…”। (কফিল আহমেদের গান)
দেশ ভাগের আগে বেউখির ছিল সমৃদ্ধশালী এক গ্রাম। ওই সময় সেনগুপ্ত আর দাসগুপ্ত পদবির হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা ছিলো এখানকার সংখ্যা গরিষ্ঠ বাসিন্দা। বরিশালের ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশার এই গ্রামে তখন বারোমাসে তেরো-পার্বনে ঢাক বাজত। মোট চোদ্দটি বাড়িতে সারা বছরই উৎসবের আমেজ মুখরিত থাকত বেউখির। ১৯৫০ এর দাঙ্গার পর ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে প্রতিটি গ্রামের হিন্দু ঘর বাড়ি। পরিবারের সদস্যদের প্রাণ আর সম্ভ্রম রক্ষায় পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিতে শুরু করেন এই গ্রামের বহু বাসিন্দা। যেমন আমার প্রপিতামহ উষাকান্ত সেনগুপ্ত তার সহধর্মীনিকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন। আর কখনও ফিরে যাঁননি।
যেতে যেতে সবাই আঙুল তুলে বলে- ‘ঐ দেখা যায় ধানসিঁড়ি নদী দূরে…।’ সঙ্গে সঙ্গে গায়ে একটা রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। গাড়ি ঘুড়িয়ে চল্লাম নদী দেখতে। সেটা আর এক অভিজ্ঞতা। বেউখির গ্রামের খোঁজ নিতে নিতে পৌঁছালাম কীর্তিপাশা গ্রামে। সেখানে বিশাল এক জমিদার বাড়ি। বাড়ির খানিকটা অংশ প্রাইমারি স্কুল হিসবে ব্যবহৃত আর বাকিটা জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত। এই জমিদার বাড়িরই ছেলে তপন রায় চৌধুরি।
একটা পর্যায়ে এসে মাইক্রো বাস ছেড়ে দিতে হল। রাস্তা ক্রমশ সরু আর নরম হয়ে আসছে। হেঁটে হেঁটে এগিয়ে চলছি, যত্রতত্র কানের কাছে অনুরননিত হচ্ছে ছোটবেলায় বাবা, কাকা, ঠাকুমার কাছে শোনা নানারকম সব গল্প, নানা সব কাহিনী, যেন আবার তা স্বচক্ষে দেখছি। অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছানো গেল।
এই সফর আমার নস্টালজিয়া নিমজ্জিত। এই ভূ-খন্ডে ঠিক কবে থেকে জনবসতি শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিত ভাবে বলা না গেলেও নাম দেখে বোঝা যায়, কৈবর্ত বা জেলে সম্প্রদায়ের লোকেরা আবাদ করেছিলো। এক সময় কৈবর্ত জেলেদের ঝালো বলা হত এবং তাদের পাড়াকে বলা হত ঝালোপাড়া। অনেকের ধারনা ঝালোপাড়া থেকেই ঝালকাঠি নামের উৎপত্তি। কবি বিজয় গুপ্ত তাঁর মনসা মঙ্গল’ কাব্যে জেলে সম্প্রদায়কে ঝালো নামে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বরূপ সেনের একটা তাম্রলিপিতে ঝালোকাঠির নাম রয়েছে। বাংলার দশটা গ্রামের মতই ছায়া ঘেরা সুনিবির গ্রাম বেউখির এখন এতটাই শান্ত যে কলকল করে বয়ে চলা জলস্রোত বা তা কেটে ছুটে চলা নৌকার শব্দও সুতীব্র তীক্ষ্ণতায় কানে লাগে। ঘোরলাগা এক গভীর নীরবতা ভাঙে, আমাদের হাঁটার শব্দ ও কথোপকথনে।
হঠাৎ বৃষ্টি নামার জন্য কিছুক্ষণের অপেক্ষা। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের বাড়িতে এক ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম – ‘এই স্কুলের মাষ্টার মশাই ছিলেন আমার ঠাকুরদা উষাকান্ত সেনগুপ্ত। তাদের বাড়িটা কোথায় বলতে পারবেন? আরও কিছুটা এগোনো আরও কিছুটা উত্তেজনা। ঈয়ন ক্যামেরা বন্দি করে চলেছে নানা মুহুর্ত।
অবশেষে পৌঁছানো গেল নির্দিষ্ট ঠিকানায়। একটা বাড়ির সামনে হাঁক দিতেই বেড়িয়ে এলো একটা বাচ্চা ছেলে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম বাড়িতে বড় কেউ আছে। ছেলেটির বাবা মিঠু সেনগুপ্ত বেড়িয়ে এলেন। আত্মপরিচয় দিলাম। বললাম ‘আমার ছোট কাকা তপন সেনগুপ্ত, কিছু বছর আগেও ঘুরে গিয়েছিলেন বেউখির। আমি তার মেজদার ছেলে’। উনি চিনতে পারলেন, আতিথিয়তার ত্রুটি রাখলেন না। তারপর একদিকে আঙুল তুলে একটা ঢিপি আর ছোট্ট খোপ দেখিয়ে বলেন, ‘ওই আপনাদের ভিটে’। দুরু দুরু বুক্ষে এগিয়ে গেলাম কয়েক পা। ঠাকুরদা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আনুমানিক পঞ্চান্ন/ষাট বছর আগে, আর ভিটে ভেঙে ফেলা হয়েছে পঁচিশ বছর আগে। কিন্তু এখনও সেখানে ভাঙা সিঁড়িটা রয়েছে। কেমন সম্মোহিত অবস্থায় সিঁড়িটার উপর ধপ্ করে বসে পড়লাম। ভাবছিলাম যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, যদি তাঁকে নিয়ে আসতাম, আবার ভাবলাম না এনে ভাল হয়েছে। মন ঠিক রাখতে পারতেন না। ভাবতে ভাবতে চোখের জল বেড়িয়েও যেন বেরলোনা। তার চেয়ে আনন্দ হল বেশি। হাঁটু গেড়ে বসে নরম মাটিতে হাত বোলালাম। তুলে নিলাম একতাল মাটি।
কলকাতায় ফিরে পুত্র বুনোর হাতে দিলাম সেই মাটির তাল। সে জিজ্ঞেস করল ‘এটা কী’? বলালাম ‘এটা আমার পূর্বপুরুষ, তোমার পূর্বপুরুষের ভিটের মাটি।’ হ্যাঁ বাংলাদেশের বরিশালের বেউখির গ্রামে আমাদের ভিটে ছিল, এখনও আছে, থাকবে।’
