বাংলাদেশে পথে নেমে পথ দেখাচ্ছে স্কুলপড়ুয়ারা

ইতিহাসে প্রথমবার দেশের খোলনলচে বদলাতে পথে নামল স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা

কত অদ্ভুত অদ্ভুত দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে এখন বাংলাদেশের রাজপথে। ‘এখন’ বলতে বিগত এক-দেড় সপ্তাহ ধরে। ঢাকার রাস্তায় উজাড় হয়ে নেমেছে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীদের ঢল। অধিকাংশই স্কুল-পড়ুয়া। হাতে প্ল্যাকার্ড। অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছেলে-মেয়েগুলো স্লোগান দিচ্ছে, ছড়া কাটছে, একসঙ্গে গান গাইছে তালি দিয়ে, চিৎকার করে বলছে –‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।

জাস্টিস! ঠিক কোন সুবিচার চাইছে এই একরত্তি ছেলেমেয়েগুলো? কেনই বা তাদের পাশে ভিড়ও বেড়েই চলেছে। এমনই ভিড় যে তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসনও। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে পুলিশ। তাদের দাবির সামনে খাবি খাচ্ছেন তাবড় তাবড় নেতা-মন্ত্রী। বাংলাদেশ যেন দুলে উঠছে। শাহবাগ আন্দোলনের পর ফের একবার।

কিন্তু, প্রশ্নটা থেকেই গেল। কীসের সুবিচার চেয়ে এত হট্টগোল, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ? স্কুল ফেলে এত এত পড়ুয়া রাস্তায় নেমে এল যার নেশায়…

উত্তরটা সহজ– পথদুর্ঘটনার প্রতিবাদ, সেই ঘটনায় সুবিচারের দাবি, সামূহিকভাবে পথনিরাপত্তার দাবি।

দুর্ঘটনা কোন দেশেই না ঘটে? তার জন্য মাঝেমাঝে বিক্ষোভও হয়। তাৎক্ষণিক জ্বলে ওঠার পর সেই রাগ, প্রতিবাদ স্তিমিতও হয়ে আসে। যত সভ্যতা গড়াবে, আধুনিক হবে রাষ্ট্র, তত গাড়ি বাড়বে, চাপ বাড়বে রাস্তায়। ফলে, দুর্ঘটনাও স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটবে। এ যেন শাশ্বত সত্য হয়ে গেঁড়ে বসছে আমাদের মগজে। ফলে, এইসব দুর্ঘটনাকেও একপ্রকার মেনে নিতেই শিখছি আমরা। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর কানে এলেও বিশেষ হেলদোল হয় না আর। কিন্তু, সেখানেই বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক ঘটনা বিস্ময়ের ঘোর বুনে দিচ্ছে। দুর্ঘটনার প্রতিবাদে এমন স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্রবিক্ষোভও হয়? টানা চলতেই থাকে! উল্টে সমর্থনও বেড়ে চলে রোজ। আশ্চর্য বৈকি!

২৯ জুলাই, রোববার, তিনটে বাসের রেষারেষিতে খোদ ঢাকার বুকে প্রাণ হারায় দুজন স্কুল-পড়ুয়া। ছাত্রমৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই আঘাত লাগে সমাজের সংবেদনে। ফুঁসে উঠেছিল ছাত্রছাত্রীরাও। সেই আগুনেই ঘৃতাহুতি দিলেন নৌমন্ত্রী তথা সড়কমন্ত্রী। সাংবাদিকদের বললেন, এমন তো হয়েই থাকে। সাফাই গাইতে ভারতের মহারাষ্ট্রের এক পথ দুর্ঘটনায় ৩৩জনের মৃত্যুর প্রসঙ্গও টানেন তিনি। এর পরেই বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার রাজপথে। দলে দলে ছাত্রছাত্রী নেমে আসে রাস্তায়। প্রথমে বিক্ষোভ সামলাতে মারমুখী হয়ে উঠেছিল পুলিশ। তাতে বিক্ষোভ আরও বেড়ে ওঠে। চেহারা নেয় বড় গণআন্দোলনের।
কিন্তু, মন্ত্রীর এমন অসংবেদনশীল বক্তব্য, বিক্ষোভকারী পড়ুয়াদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের পরেও এই আন্দোলনের চরিত্র বুঝতে ধাঁধা লাগতে পারে। এত রাগের কোনও থইও নাই মিলতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিকের ঘটনা এই বিস্ফোরণের মুখটাই খুলে দিয়েছে শুধু। এর পূর্বপট নির্মিত হচ্ছিল আগে থেকেই। বহুদিন ধরে।

যানজট ঢাকার এক আবহমান সমস্যা। মীরপুর ১০ থেকে ফার্মগেট—আধ ঘণ্টার রাস্তা যানজটের ভিড়ে যেতে লাগে সোওয়া একঘণ্টা। যানজটের মধ্যেই বেআইনি গাড়িদের ভিড় বেড়েছে। এই অবস্থা ঢাকার সর্বত্র। শুধু যানজটই না, বিগত কয়েক বছরে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্ঘটনাও। প্রশাসন নির্বিকার। ছোটোখাটো বিক্ষোভ, প্রতিবাদে সামান্য আঁচড়ও লাগেনি সেই শীতল উপেক্ষার গায়ে। উল্টে, এই গোটা প্রেক্ষিতটিকেই আরও জটিল করে তুলছিল যানবাহন-কেন্দ্রিক একাধিক অভিযোগ এবং শেষাবধি সড়কমন্ত্রীর ঔদ্ধত্য। এইসবই জমাট হচ্ছিল ঢাকার মানুষদের মনে। গত রোববারের ঘটনা সব বাঁধ ভেঙে দেয়।

তবে, দুর্ঘটনা নিয়ে আলোড়ন সব স্তরে হলেও এই প্রতিবাদের ঝড় প্রথমে ডেকে এনেছে কিন্তু ছাত্রছাত্রীরাই। আরও স্পষ্ট করে বললে, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। এবং, সেটাই এই আন্দোলনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু গুরুত্বপূর্ণ না, ঐতিহাসিক।

কলেজ পড়ুয়াদের আন্দোলন এর আগেও একাধিকবার দেখেছে বাংলাদেশ। শাহবাগ আন্দোলনের সামনের সারিতেই ছিল কলেজছাত্ররা। শুধু বাংলাদেশ কেন, এপার বাংলা সহ গোটা ভারতবর্ষ, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকাও বারবার উদ্বেলিত হয়েছে ছাত্রআন্দোলনে। ছাত্রআন্দোলন কীভাবে গোটা শাসন ব্যবস্থাকে নড়িয়ে দিতে পারে, তার দৃষ্টান্তও আমরা আগে দেখেছি ফ্রান্সের এক গ্রীষ্মে। আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে। সেইসমস্ত আন্দোলনের থেকে বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক আন্দোলন চরিত্রগতভাবে আলাদা। আলাদা তার বয়সের সীমায়। আলাদা প্রতিক্রিয়ার রঙে, ছাঁদে। কলেজ না, মূলত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাই এই আন্দোলনের সামনের সারিতে। তারাই সবচাইতে আগে নেমেছে রাস্তায়। মৃত বন্ধুদের মৃত্যুর সুবিচার চেয়েছে। পুলিশের লাঠির সামনে দাঁড়িয়ে ভয় না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। এবং, এতেই থেমে না থেকে নিজেরাই নেমে পড়েছে সড়ক নিয়ন্ত্রণে।

ব্যাপারটা অভাববনীয় লাগছে না? চারপাশের স্কুল-পড়ুয়াদের দিকে তাকান। পড়ার চাপ, কোচিং ক্লাসের ভিড়, কেরিয়ার নিয়ে অভিভাবকদের প্রত্যাশা, ভিডিও গেমস, খেলাধুলো, ভালো রেজাল্ট করে একটা স্মার্ট ফোনের আকাঙ্ক্ষা— এত্তসব পাহাড় ডিঙিয়ে তারা উত্তাল হয়ে উঠছে দেশের কোনও খোলনলচে বদলে দিতে, কষ্টকল্পনা মনে হচ্ছে না কি? কিন্তু এটাই যে ঘটছে এখন বাংলাদেশে। ক্লাসরুম, বন্ধু, পরিবার, খেলার মাঠ, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, সেলফি, স্মার্টফোনের দুনিয়া ছেড়ে হাজারে হাজারে কিশোর-কিশোরী উত্তাল হচ্ছে পথনিরাপত্তা নিয়ে। ঘরে বসে থেকে নয়, রাস্তায় নেমে। স্লোগান উঠছে, ‘৯ টাকায় এক জিবি ডেটা নয়, নিরাপদ সড়ক চাই।’ এবং এই দাবি কিন্তু শুধু ছাপোষা সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের থেকেই উঠছে তা নয়, উঠে আসছে তথাকথিত উচ্চবিত্ত স্কুলপড়ুয়াদের ভিতর থেকেও। আশ্চর্য না?

এখানেই শেষ নয়, আরও অসংখ্য সব অলীক দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে ঢাকার রাজপথে।

ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই নেমে পড়েছে সড়ক নিয়ন্ত্রণে। প্রত্যেকটা গাড়ির লাইসেন্স, বৈধ কাগজপত্র চেক করছে ছেলেমেয়েগুলো। পুলিশ-র্যা বের গাড়িও বাদ যাচ্ছে না। অবৈধ গাড়ি হলেই আটক। সে যতই প্রভাবশালীর গাড়িই হোক না কেন। খোদ মেয়রের গাড়িও আটকেছে। মেয়র পুলিশকে ফোন করলে, পুলিশ জানিয়েছে তারা অসহায়। রং সাইড দিয়ে যাওয়ার সময় একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর গাড়িও আটকে দিয়েছে তারা। আটকে দিয়েছে এক বাস বোঝাই আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নকেও। বাস ড্রাইভার লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। পড়ুয়ারা সাদা কালি দিয়ে কালো বাসের গায়ে লিখে দিয়েছে, ‘লাইসেন্স নাই।’

পুলিশ, মন্ত্রী, আমলা, মেয়র, আর্মিদের ওপরেই বেশি রাগ কচিকাচাদের। কারণ, ওঁরাই যে রাষ্ট্রের মাথা বা শক্তিশালী অঙ্গ। দুর্নীতি, বেনিয়ম, নিস্পৃহতার দায়ও তাই ওঁদের। একটা জোর সবক শেখাতেই যেন এই ঢল নামা রাজপথে।

সবক কখন বদলে যায় নতুন সব শিক্ষায়। সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক চোদ্দ-পনেরো বছরের কিশোরী এক চৌমাথায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে। কেউ তাকে শিখিয়ে দেয়নি ট্রাফিকের নিয়ম। কিন্তু সব গাড়ি মেনে চলছে তার নির্দেশ। কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই।

শুধু যান নিয়ন্ত্রণই নয়, রাস্তাও মেরামত করতে লেগে গেছে ছাত্রছাত্রীরা। সব মিলিয়ে বয়ান স্পষ্ট, নিছক প্রতিবাদের জন্যই প্রতিবাদ নয়, আপাদমস্তক সুনাগরিক হওয়ার পাঠ নিতে চায় এরা। ভুল বললাম, পাঠ দিতেও চায়। প্রশাসনকে, রাষ্ট্রকে, অন্য সব নাগরিককে।

এই আন্দোলনের একটি পোস্টার কাঁপিয়ে দিয়েছে সমাজকে। একটা পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা ছেলের হাতের পোস্টারে লেখা- ‘আম্মুর আদেশ, গুলি না খেয়ে ফিরবি না!’ আরেকটা পোস্টার– ‘মা, বিচার না পেয়ে বাড়ি ফিরব না!’ আন্দোলনকারীরা বলছে, "দোষ আমাদের নয়। দোষ শহীদ রফিক, সালাম, জব্বারদের। তাঁরাই আমাদের আন্দোলন করতে শিখিয়েছেন। তাই বন্ধুর মৃত্যুর বিচার চেয়ে পথে নেমেছি।"

আন্দোলনের জল কোথায় গড়াবে কে জানে। সেই জল ঘোলা হলে, তাতে কারা মাছ ধরবে জানা নেই তাও। জানা নেই, এই আন্দোলনে রাজনীতির রং লাগবে কিনা, লাগলে কতখানি লাগবে। শাসক এই আন্দোলন দমন করতে বা আন্দোলনকে শান্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নেবে—তারও উত্তর দেবে ইতিহাস। কিন্তু, আপাতত কাঁটাতারের এপার থেকে ওপারের এই ছাত্রছাত্রীদের ঢল দেখে বিস্ময় মিছিল করে নেমে আসে চোখে। উপসংহারে যাই থাক, এই আন্দোলনের শুরুটা কিন্তু ঐতিহাসিকই। একটা দেশের অগোছালো, টালমাটাল সড়ক ব্যবস্থাকে সামাল দিতে পথে নেমে এসেছে ভবিষ্যতের নাগরিকেরা। সমস্ত পথচারী, গাড়িরাও যেন স্বীকৃতি দিচ্ছে তাদের এই পরিচালনাকে। হয়ত এভাবে আসলে কোনও বদল হয় না, হয়ত হয়, হয়ত বা আজ নাহলেও এভাবেই হবে একদিন। কে বলতে পারে ভবিষ্যতের কথা? শুধু এই অলীক দৃশ্যগুলো স্থায়ী হয়ে যায় একটা দেশের সামাজিক স্মৃতিতে।

কে যেন বলছিলেন, বাংলাদেশের বুকে আঠারো এসেছে নেমে। 

Developed by DXDasia