
"অন্যবারের মতো স্কুলে গিয়ে আনন্দ করাটা এবার খুব ‘মিস’ করছি"
পৃথিবীতে এমন কিছু শৌখিন অনুভূতির অস্তিত্ব রয়েছে, যেগুলো বদলায় না, যেগুলোর বয়স বাড়ে না, হাজারো বিবর্তনের পরও যেগুলো একইরকম থেকে যায়। নির্দ্বিধায় বলা যায়, সেই অনুভূতিগুলোর একটা- স্কুলের সরস্বতী পুজো। তবে, গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে এবছর অর্থাৎ ২০২১-এ এখনও পর্যন্ত আমরা অনেককিছুই বদলে যেতে দেখলাম। এবছর বদলে গেছে স্কুলপড়ুয়াদের ‘স্বাধীনতা দিবস’ ওরফে সরস্বতী পুজো উদযাপনের ধরণ। করোনার কারণে তাদের আনন্দে এবার ভাটা।
প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী, দীর্ঘ বারো বছরের স্কুলজীবনে এক একটা ধাপে এক এক রকম অভিজ্ঞতা জুড়ে বসে এই দিনটির সঙ্গে। এই একটি দিনকে কেন্দ্র করে কুল খাওয়া বা না খাওয়ার ঝঞ্ঝাট, বছরভোর প্রতীক্ষা, এই একটি দিনেই ‘বোকাবোকা’ স্কুলড্রেস থেকে নিস্তার, স্কুল ছুটির পরও বেশিক্ষণ স্কুলে থেকে পুজোর জোগাড়, না খেয়ে পুষ্পাঞ্জলি, লাইন দিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে পুজোর ভোগ খাওয়া, এই একটি দিনেই প্রিয়-অপ্রিয় বইপত্র বিদ্যাদেবীর চরণে সঁপে ক্ষণিকের নিশ্চিন্তি, এক ছুটে সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে পড়া। এককথায় নিয়মের গণ্ডি পেরিয়ে ছোটদের নির্ভেজাল মুক্ত আনন্দ। যাদবপুরের বাসিন্দা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা মজুমদারের কথায়, “সারাবছর অপেক্ষা করে থাকি সরস্বতী পুজোর জন্য। শাড়ি পড়ে স্কুলে যাব, কত ‘প্ল্যানিং’… এখন তো অনলাইনেই স্কুল, কিন্তু সরস্বতী পুজোর আনন্দ তো অনলাইনে হয় না! এতদিন স্কুল বন্ধ, অন্তত এই একটা দিন যদি যাওয়া যেত… এবছর খুব ‘মিস’ করছি।”
তাহলে, স্কুলে স্কুলে কীভাবে উদযাপিত হচ্ছে সরস্বতী পুজো? কমবেশি সব স্কুলেই কোভিড-বিধি মেনে পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। “প্রতি বছর যেভাবে ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত হত, পুজোর আয়োজনে সামিল হত, সেটা এবার হচ্ছে না। ছাত্রছাত্রীদের সেভাবে স্কুলে আসতে বলা হয়নি। প্রীতিভোজ এবার হচ্ছে না। মূলত শিক্ষক-শিক্ষিকারাই সমস্ত নিয়মবিধি মেনে পুজোর আয়োজন করেছে।” জানিয়েছেন রঘুদেববাটি সাধারণের বিদ্যালয়-এর শিক্ষক অনিমিখ পাত্র।
যাদবপুর বিদ্যাপীঠের সরস্বতী পুজোয় প্রতিবছরই অভিনবত্বের ছোঁয়া থাকে। এবছরও সেই নিয়মে ছেদ পড়েনি, উল্টে পুজোর থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে করোনা পরিস্থিতিই। যাদবপুর বিদ্যাপীঠের শিক্ষক সোমশুভ্র দাশগুপ্তের কথায়, “আমরা সমস্ত কোভিড-বিধি মেনে পুজো করছি। আমাদের থিমেও রয়েছে সেকথা; কীভাবে আগে ক্লাস হত এবং করোনার জন্য পরে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা, এটা ইনস্টলেশনের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে সঙ্গে মাস্ক, ভ্যাকসিন ইত্যাদিও রয়েছে। এসবের মধ্যে একটি প্রদীপ রাখা হয়েছে, যা শিক্ষার আলোকে শত অসুবিধে সত্বেও জালিয়ে রাখার প্রতীক। কয়েকজন ‘এক্স-স্টুডেন্ট’দের নিয়ে আমরা শিক্ষক-শিক্ষিরাই পুজোর আয়োজন করেছি। স্কুলের বাইরে থেকেই প্রতিমা-দর্শন করতে হবে। প্রীতিভোজের ব্যাবস্থা এবছর ব্রাত্য থাকছে।”
আরও পড়ুন: গ্রামোফোন বাজাচ্ছেন বাগদেবী, অন্য হাতে বীণা
এসব দেখে, শুনে, বুঝে একটা কথাই মনে হচ্ছে, এবছর স্কুলে আনন্দ করা থেকে বঞ্চিত থাকলো যেসব ক্ষুদে, কিশোর-কিশোরীরা, তারা নিশ্চয়ই মনে মনে বিদ্যাদেবীর কাছে নালিশ জানিয়েছে, ‘হে দেবী, প্রতিবছর আমাদের স্কুলে এসো তুমি, শুধু করোনাকে আর এনো না।’
