শালরাজা আর সীতার দেশের ‘সত্যি রূপকথা’

‘পুরুল্যায়’ এখনও বেঁচে বাগাল, হাতির পাল, ঠুড়্গার ঝিরিঝির আর হলুদ প্রজাপতি

সীতা পাতাল প্রবেশ করছেন। মাটি তাঁর সন্তানকে মিথ্যে কথার দুনিয়া থেকে দূরে, বুকের ভাঁজে আগলে রাখতে চেয়ে দু-ভাগ হয়েছেন। কিন্তু, সেই মিথ্যে কথার দুনিয়ায় শুধুই মিথ্যুকরা ছিল না, সত্যের পতাকা বয়ে চলা শালরাজাও ছিলেন। শাল-রাজ সীতাকে টেনে রাখতে চেয়েছিলেন কাছে। ‘যেতে নাহি দিব’। তাই, সীতা যখন পাতাল প্রবেশ করছেন শাল তার দু'বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পারেননি শেষ অবধি। সীতার মাথার চুলটুকু ছাড়া আর সবই মিথ্যে কথার দুনিয়া ছেড়ে মাটি-মায়ের বুকে আশ্রয় নিয়েছিলো। আজও দেখবেন শাল তার সে কষ্ট ভোলেননি। মাথায় করে রেখেছেন আদরে পালিত কন্যার মাথার চুল। বিলাপ করেন মেয়ের শোকে এখনও। হাওয়ায় হাওয়ায় সেই কান্না ভেসে ভেসে যায় দিগন্তের এপার-ওপার। সীতার চুলও তখন পালক পিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে যায় আজও।

এমন,  হাজারো ‘সত্যি রূপকথা’রা বেঁচে আছে আযোধ্যার পাহাড় বনের সীতামায়ের সন্তানদের মুখে মুখে। এই রূপকথা শুনতে হলে আপনাকে যেতে হবে ছোটনাগপুর মালভূমির ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে। এই রাজ্যেরই এক লালমাটি-বন-সবুজ টিলা-ঝিরিহিরি নদীর দেশ—পুরুলিয়ায়। তবে, সুমো-স্কর্পিওর চাকায় ধুলো উড়িয়ে এমন রূপকথার হদিস মেলে না। আপনাকে হাঁটতে হবে, পায়ে মাখতে হবে জন্মদাত্রীর অবশেষ। মাখতে মাখতে হয়তো পৌঁছবেন মারাংবুরু নামের কোনও অখ্যাত পাহাড়ে। মারাংবুরুতে পৌঁছলে পরে সহস্র-বছরের অগ্রজের অনুভূতিমালা অবচেতনের পাতাল থেকে উঠে আসবে চেতনে। আপনি নিজে-নিজেই অনুভব করবেন কারা যেন দূর থেকে লক্ষ্য করছে আপনাকে। তাদের বিশাল দেহ পলাশের ফুলের মতন শীতের পলাশ কাণ্ডে লুকিয়ে রয়েছে। সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তার চিহ্ন। মনে হবে, একটু আগেই ঠিক যেখানে আপনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেইখানে তারা কচি বাঁশের আগা ভেঙেছে। খেয়েছে পাতা-ফল, শুঁড় তুলে অভিবাদন করেহে একে-অপরকে। ঐরাবতের পাল। আপনার গায়ে তখন কাঁটা দিয়ে উঠবে নিশ্চিত।

অযোধ্যায় হাঁটাপথে

এই সব ভাবতে ভাবতে, তখন আপনি শালডি গ্রাম থেকে বেশ খানিক দূরে এসে পৌঁছেছেন, প্রায় কিলোমিটার ছয়-সাত। এবার বাতাসে জলের গন্ধ পাবেন। আপনার ব্যাকপ্যাকের বোতলের জলে সেই গন্ধ থাকেনা। আপনি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকবেন সেই গন্ধের উৎস। বর্ষায় গেলে, হয়তো হলুদ প্রজাপতির দূতদল আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সেই অলীক জলের উৎসের দিকে।  পথ কিন্তু কাঁটায় ভরা। আপনার হাত-পায়ে পাহাড়ি জংলি-কাঁটা উল্কি এঁকে দেবে। আপনিও আনন্দে সে উল্কি আঁকিয়ে নেবেন নিজের হাতে। এও তো আসলে প্রকৃতির কথা বলা আপনার সঙ্গে। আসলে যাচাই করে নিচ্ছে। আপনি কি সত্যিই তেমন মানুষ, যে এরপরেও ডাকে সাড়া দেবেন তার!

এতক্ষণে আপনি ক্ষীণ অথচ তেজোময়ী ঠুড়্গার প্রান্তে এসে পৌঁছলেন। ক্ষীণকায়ায় হাঁটু জল পাবেন, তবু মনে হবে অতল। সব নদীই নিজের মতো করে উচ্ছল, অতল। কেন এমন মনে হচ্ছে, তার উত্তর আমার কাছে ছিল না, হয়তো আপনারও থাকবে না। মনের সব উত্তর সবসময় খুজতে নেই। পরে খুঁজবেন, হয়তো হাজার বছরের অগ্রজদের পদচিহ্ন এ ক্ষীণকায়াকে গভীর করে তোলে, আমি জানি না ঠিক। আকাশ উজিয়ে আসা হাতির ডাক শোনার জন্য আপনার কান আকুলিবিকুলি করে উঠতেই, ঠুড়্গার উল্টোপ্রান্তে দেখতে পাবেন তাদের পায়ের ছাপ। আপনার আমার অগ্রজের, হস্তিযূথের, হস্তিযূথের বন্ধু আপনার আমার পূর্বজের। সেই পদচিহ্ন ঠুড়্গা পেরিয়ে মহাদেববেড়ার ঘন জঙ্গলের দিকে চলে গিয়েছে। 

এইবার হাঁটা থামান। অপেক্ষা করুন, কোন বৃদ্ধা অথবা শিশু বাগালের। দেখা পেলে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিন এতক্ষণ যে রূপকথার দেশে আপনি হাঁটছিলেন, তা সত্যি কি না? নাকি স্বপ্ন? মায়া? কথা বলার সময় নিশ্চয়ই আপনার স্বাভাবিক শহুরে বাচনভঙ্গি ধরে রাখতে পারবেন না। আপনার জিভে ফুটে উঠবে পুরূল্যার স্বাদ। বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করুন হস্তিযূথেরকথা। উত্তর পাবেন, বড়ো ভয়, ও বড়ো ভয়। জিজ্ঞেস করুন, তবু এ জঙ্গলে কেন? উত্তর পাবেন – ওদের খারাপ না ভাবলে ওরা কিছু করেনা। জিজ্ঞেস করুন, তবে যে খবরের কাগজে দেখি হাতি ঘর ভাঙে, ধানক্ষেত নষ্ট করে? এবার উত্তর পাবেন, ওদের বড়ো পেটের জ্বালা, কী করবে? ‘আমরা এইটুকুন পেট নিয়ে বাগালি করি, ওদের দোষ কী? জঙ্গল নেই, খাবার পায় না তাই আসে।’

বামনী নদীর ওপরের ড্যাম

এবার আপনার হিংসে হতে পারে। করুণা হতে পারে। বৃদ্ধা অথবা ছোকরার কথায় ঠোঁটের কোণে হাসি আসতে পারে… যা খুশি আসুক, এবার আপনার ফেরার সময় হয়েছে, ফিরতে হবে। ফিরতে হলে টপকাতে হবে দুটো পাহাড়। পাহাড়ের উপর থেকে শালের পর্দা সরিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন। আরো একটু এগিয়ে মহাদেব-বেড়া পেরিয়ে এলে দেখবেন সুমো-স্কর্পিওর সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে মার্বেল লেকের ধার ঘেঁষে। অযোধ্যা-পাহাড়ের কোলে বিখ্যাত ড্যাম।

আপনার ভালো লাগবে না। হঠাৎই, মনের মধ্যে কষ্টের ঘুর্ণি তৈরি হবে। সে ঘুর্ণি আর জোরদার হয়ে যাবে যখন কথা হবে মার্বেল লেকের পাগল পূজারির সঙ্গে। আজ যেখানে কালো টলটলে জল, সেখানেই বছর বারো আগেও গা-ঘেঁষাঘেষিঁ করে দাঁড়াত শাল। তাদের মাথায় সীতার চুল বুলিয়ে দিত বাতাস। এবার বৃষ্টি নামবে হবে মনের ভেতর। আর মেঘ ধরে রাখতে পারবেন না, যখন মার্বেল লেকের খাড়া দেওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন বামনী নদীর ওপরে বিশাল আরও দুটো জলাধার। সেদিন সকালেই তো ওই জলাধারের উপর দিয়ে এসেছেন। আসার সময় গাড়ি থেকে নেমে সেলফি ক্যামেরায় ডিপি তুলেছেন, তুলে দিয়েছেন। তখন তো অসাধারণ সুন্দর দেখাচ্ছিল সে ছবি। লাইকও পড়েছে অনেক… শ’ তিন-চার। আগে চিতাবাঘ, ভালুক আসত জল খেতে। নুন চাটতে। এখন আসে গাড়ি-চাপা ট্যুরিস্ট। ভাঙচুর হবে মনের মধ্যে, যখন নিজেই আবিষ্কার করে ফেলবেন ওই দুটি জলাধারের নিচে আসলে দাফন হয়ে রয়েছে আপনার পূর্বজের ইতিহাস। হস্তিযূথের বৃংহণ হয়তো এবার আপনার অবচেতন শুনিয়ে দেবে আপনাকে। আর্তনাদের মতন।

পাহাড় থেকে নিচে নামতে নামতে ড্রাইভারকে যদি জিজ্ঞেস করে ফেলেন ঠুড়্গার কথা, সে বলবে পরের বার আসুন ঠুড়্গার ওপর– পিপিএসপির চেয়েও বড়ো লেক হবে। তখন আরও ভালো লাগবে। আপনি হয়তো এবার আমার মতোই কেঁদে ফেলবেন সত্যি সত্যি। বুকের ভেতর জমা জল শ্বাসরোধ করে দিতে চাইবে। চাইবে চিৎকার করে বলে উঠতে, ‘না না না। চাই না এ জলাধার।’ হাতিনাদা গ্রামের পাশে ঘুরে-বেড়ানো হাতির পাল, হঠাৎ উঁকি দেওয়া প্যাঙ্গোলিন, সজারু, শালরাজার দেশ, বৃদ্ধা-কিশোর বাগাল ভালো থাকুক। ভালো থাকুন হলুদ প্রজাপতিরা… বন বড়ো দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। নদী ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর কত? ঠুড়্গাও তার নিজের বলা থামিয়ে হয়ে উঠবে বিরাট শান্ত জলাধার! আর, আমরা ভিড় করে তখন…

বামনী নদীর ঝর্না

শালরাজা, সীতামায়ের গপ্পোরা এখনও বেঁচে পুরুলিয়ার এই পাহাড়ি-কোণে। আদিবাসী গ্রামের ঝুপড়িতে, ঠুড়্গার জলে পুষ্ট সবুজ ক্ষেতের ভিতর। আর হয়তো বেশিদিন নেই। এই অঞ্চলে শুরু হলে বলে ড্যামের কাজ। হাজার-হাজার গাছ কেটে-পাহাড় ফাটিয়ে সে এক দক্ষযজ্ঞ। তার আগে, যদি অযোধ্যা হিল-টপ, বাঘমুণ্ডির প্রচলিত পর্যটন-পথ ছেড়ে একবার যেতে চান শালরাজার নিজের রাজত্বে, তাহলে আর দেরি করবেন না। যাওয়া উচিত খুব। নাহলে বুঝতেই পারবেন না, মরে যাওয়ার আগে বনেরা কীভাবে কাঁদে…

কীভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে হাওড়া-চক্রধরপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জারে পুরুলিয়া বা বরাভূম স্টেশন। পুরুলিয়া থেকে 'রাঙা পুরুলিয়া' বাসে অযোধ্যা হিলটপ। কিংবা। গাড়ি ভাড়া করতে হবে। তারপর, পায়ে হেঁটে ঘোরা।

বরাভূম নামলে ট্রেকার যায় অযোধ্যা মোড় অবধি। সেখান থেকে ফের ট্রেকার বা টেম্পোয় হিলটপ। চাইলে পায়ে-পায়েও উঠতে পারেন। 

থাকবেন কোথায়?
অযোধ্যা হিলটপে সরকারি গেস্ট হাউজ, একাধিক হোটেল। ময়ূর পাহাড়ের দিকে আছে ভারত সেবাশ্রম সংঘের ধরমশালাও। 

কী দেখবেন?
অযোধ্যা পাহাড়ে পাখি-পাহাড় ও এদিক-সেদিক। তবে, বাকিটা আপনার মর্জি। পায়ে হেঁটে নিচে না নামলে এই রূপকথা আপনাকে ধরা দেবে না কিছুতেই। 

Developed by DXDasia