
পার্বতী শুধুমাত্র বাউল সাধিকা নন, একজন গল্প-কথকও
সারাদিন মেঘলা আকাশ আর অনবরত বৃষ্টির পর বাঁকা চাঁদের সন্ধেতে মঞ্চে আলোর বিন্দুতে এসে দাঁড়ালেন পার্বতী দাস বাউল (Parvathy Baul)। পর্দা উঠল। পার্বতী শুরু করলেন রাধা বন্দনা (Radha Vandana)। গত ২৩ সেপ্টেম্বর শনিবার রাধাষ্টমীর শুভ লগ্নে তাঁর কণ্ঠ খাদ থেকে ধীরে ধীরে উচ্চাঙ্গে পৌঁছে যাচ্ছে। দশপাক-কুড়িপাক ঘুরছেন, পায়ে ঘুঙুর-খাড়ু, দুই হাতে একতারা-ডুগি। পার্বতীর শরীর ক্রমশ নৃত্যরত। তাঁর শরীরের অভিব্যক্তি আর ভাবমগ্নে দর্শক ক্রমশ ডুবে যাচ্ছেন।

পার্বতী দাস বাউল একজন প্রখ্যাত বাউল সাধিকা তো বটেই, তবে তাঁকে একজন গল্প-কথকও বলা যেতে পারে। তিনি যে সংগীত পরিবেশন করছেন, তার গভীরে গিয়ে প্রাণের কথাগুলি নিংড়ে প্রকাশ করছেন। গানের সঙ্গে সঙ্গে অজস্র গল্পগাথা। কখনও তাঁর শরীরী চলন কত্থকের ভঙ্গিমায়, কখনও তিনি রাধা বন্দনায় হয়ে উঠছেন স্বয়ং রাধা চরিত্র। অভিনয়, নৃত্য এবং গানের সার্থক যুগলবন্দি সাধিকা পার্বতী দাস বাউল (Parvathy Das Baul)।
বাউল সাধিকা ফুলমালি দাসী, সনাতন দাস বাউল এবং শশাঙ্ক গোঁসাই – এই তিন জনের কাছ থেকে বাউল দীক্ষা নেন পার্বতী। এ তো অনেক পরের কথা। আসলে শৈশবে লুকিয়ে থাকা তাঁর নামটি মৌসুমী পাড়িয়াল। দেশভাগের আগে তাঁর পূর্বপুরুষদের বাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের রাউজানের পশ্চিম গুজরার গ্রামের পাড়িয়াল পাড়ায়, এককথায় চট্টগ্রাম। দেশভাগের পর কোচবিহারের দিকে চলে আসেন। তাঁর বাবা ছিলেন ভারতীয় রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ার। মা পরমহংস রামকৃষ্ণদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। তৎকালীন ‘মৌসুমী’ পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী থেকে ভিজ্যুয়াল আর্টের শিক্ষা নেন। পাশাপাশি চলতে থাকে শুদ্ধ মার্গ সংগীতের চর্চা। এমনকি সেখানে কত্থক নাচের তালিমও নেন। পার্বতী বাউল বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন কীভাবে বাউল সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মাল, তার কথা। তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোলো। বলছেন, “বাউল গান আগে শুনতাম না। শান্তিনিকেতনের কলাভবনে পড়ার জন্য পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলাম। হাওড়া থেকে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে উঠি। সেই ট্রেনেই হঠাৎ এক অন্ধ বাউল গান গাইছিলেন। তাঁর হাতে টিনের একটি একতারা। গান শুনতে শুনতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল সুরটা বহুদূর থেকে আসছে। কেমন যেন একটা অনুভূতি গ্রাস করেছিল। আমি যে ট্রেনে চেপে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম। পরে বুঝতে পারি একেই বাউল গান বলে।”

বিশ্বভারতীর কলাভবনে ভিজ্যুয়াল আর্ট নিয়ে পড়ার সময় একদিন হঠাৎ বাউলদের স্কেচ করার একটি অ্যাসাইনমেন্ট পান। সেই শুরু হল বিভিন্ন বাউল আখড়ায় ঘোরাঘুরি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্কেচ। পরিচয় হয় বাউল সাধিকা ফুলমালী দাসীর সঙ্গে। পার্বতীর হাতেখড়ি হল এই ফুলমালীর কাছেই। সেখান থেকে বাঁকুড়ায় সনাতন দাস বাউল। তারপর শশাঙ্ক গোঁসাই। বাউল সাধনাও সংগীতের মতো উচ্চাঙ্গে পৌঁছায় ধীরে ধীরে। পার্বতী অনুভব করেন তাঁর গুরুদের কথা। সেই কথা অনুযায়ী বাউলকে গান গাইতে হয় না, তার মধ্যে গান আপনিই জেগে ওঠে। বাউলকে নৃত্য করতে হয় না, নৃত্য সংঘটিত হয়। তাকে কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে হয় না, যন্ত্রে প্রাণ জেগে ওঠে। পৃথিবীর বহু দেশ পরিক্রমা করেছেন পার্বতী। এবং প্রতিটি উপস্থাপনায় অক্ষরে অক্ষরে এই কথাগুলিই মেনে চলেছেন তিনি। তিনি গান গাইলে ভাবমগ্ন হন। পৃথিবীতে তখন খুনোখুনি নেই, হিংসা নেই, অত্যাচার নেই; তৈত্তিরীয় উপনিষদ অনুযায়ী চারদিকে শান্তি বিরাজ করে — “ওঁ সহনাববতু, সহনৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ/ তেজস্বীনাবধীতমস্তু, মা বিদ্বিষাবহৈ/ ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ।।”
এই শ্লোকে আচার্য ও বিদ্যার্থী উভয়কেই সমভাবে রক্ষার কথা বলা হয়েছে। তুল্যভাবে বিদ্যাফল দান, সমভাবে বিদ্যাফল লাভের সামর্থ্যের কথা বারবার উচ্চারিত হয়। পরস্পরকে বিদ্বেষ না করার কথা বলা হয়। এখানে আচার্য যদি পার্বতী বাউল হন, তবে আমরা অবশ্যই বিদ্যার্থী। এই সুমধুর শান্তির সম্পর্ক রচিত হয় তাঁর অনবদ্য উপস্থাপনায়। তাঁর উপস্থাপনা মানে শুধুমাত্র সংগীত নয়, সেখানে জুড়ে থাকে নৃত্য এবং অভিনয়ও। কিশোরী বয়সে তাঁর কত্থক ও থিয়েটারের তালিম তিনি ব্যবহার করেন প্রতিটি উপস্থাপনায়। তাঁর সমগ্র শরীর কথা বলে, গান গায়। বাউলের যে নাচ, তার মধ্যে একটা মুক্তির উল্লাস থাকে। মঞ্চে নিজের উপস্থাপনা নিয়ে পার্বতী বাউল বলছেন, “বাউল সংগীতের সঙ্গে সমানতালে নৃত্য যেন প্রাণায়ামের মতো, একটা শক্তি তৈরি করে। এটা শুধুমাত্র উপস্থাপনা নয়, তার চেয়েও বৃহৎ কিছু, যেখান থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়। যেন দেহের মধ্যে শক্তির প্রবাহ। যখন এই উপস্থাপনা বিশুদ্ধ ও নিঁখুত হয়, তখন একজন শিল্পী আনন্দ নামক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বাউল সংগীত ও নৃত্যের মূল লক্ষ্য কী! আমি বলব, এটা সম্পূর্ণ Inner-Joy বা অন্তঃস্থিত আনন্দকে উপলব্ধি করা। যিনি সবে শুরু করছেন তাঁর জন্য এই আনন্দ স্বল্প স্থায়ী হয়। আর যিনি বছরের পর বছর এই পথের মধ্যে দিয়ে যান, তখন তিনি এই অন্তঃস্থিত আনন্দের অনুভূতিকে উপলব্ধি করেন। আসলে সকলের মধ্যেই নৃত্য আছে। যেন তাঁর অন্তর সদা নৃত্যরত। এভাবেই শৈল্পিক উপস্থাপনা পৌঁছে যায় আধ্যাত্মিক উপস্থাপনা বা সাধনায়।”

কলকাতার জিডি বিড়লা সভাঘরে এদিন পার্বতী অনুষ্ঠানের মাঝপর্বে ধরলেন ঝুমুর। ঝিঙা ফুল লিলো জাতি কূল গো, ঝিঙা ফুল লিলো জাতি কূল। নৃত্যরত পার্বতীর কণ্ঠের পাশে ভেসে এল বাঁশি, দোতারা, খোল, খঞ্জনী। গান শেষে দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশে বললেন, “এভাবে নিস্তেজ হয়ে বসে থাকলে চলবে? আপনাদের জায়গায় আমি থাকলে এতক্ষণে খুব নাচানাচি করতাম।” শ্রোতা তাঁর কাছে ঈশ্বর সমান। আসলে তিনি বলেন, শুধুমাত্র মানুষ নয়, একটা সামান্য পোকাকেও শ্রদ্ধা করতে হয়। এই গভীরতায় পৌঁছানো ইহলোকের অধিকাংশের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই হিংসা-প্রতিহিংসার মেকি বাজারে পার্বতী বাউলের অমৃত-বাক্য হৃদয়ে প্রবেশ করেও অধরা থেকে যায়। ঝুমুর শেষে একতারা আর ডুগি সহযোগে গাইলেন, “কিছুদিন মনে মনে ঘরের কোণে/ শ্যামের পিরিত রাখ গোপনে/ ইশারায় কইবি কথা গোঠে-মাঠে/ রাই রাই লো-ও-ও-ও-ও/ দেখিস যেন কেউ না জানে/ কেউ না বোঝে কেউ না শোনে…”। পার্বতী দাস বাউল এই গান গাইলে ‘রাই লো’-র টান সমস্ত সীমা অতিক্রম করে অসীমে গিয়ে পৌঁছায়। সুরের মূর্ছনা আমাদের গ্রাস করে। কাঁদায়। অতঃপর তাঁর কণ্ঠে বসত করেন চণ্ডীদাস। জটাধারিণীর সেই সুরে ব্রহ্মাণ্ড উত্তাল হয়ে যায়।
পার্বতী বাউল যখন পলকহীন একতারা নিয়ে গলায় ধরেন, “গোরা যদি হইত আমার কুমকুম চন্দন, আমি অঙ্গেতে মাখি, আমি গৌ-উ-র-র বলে ডাকি”, তখন কি ঘোর নাস্তিকও শ্বেত চন্দন আর গৌর প্রেমে মাতোয়ারা হয়? কী জানি! হয়তো হয়। হয়তো এটাই বাউল সাধনার আনন্দ-যজ্ঞ। আসলে বাউলদের কোনো দেশ নেই, তাঁরা পৃথিবীর সন্তান।
______
পার্বতী বাউল একক/ আয়োজক Senz Melody/ সহযোগিতায় সনাতন সিদ্ধাশ্রম
যন্ত্রানুষঙ্গে নীলাংশুক দত্ত ও সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় (পারকাশন), শুভব্রত সেন (দোতারা), পীযূষ বিশ্বাস (শ্রীখোল), তরুণ (বাঁশি), কিশোরী ও কৃষ্ণকান্তা (সহযোগী কণ্ঠ)
ছবি সৌজন্যে: পার্বতী বাউল
