UNESCO থেকে এল বিশ্বজনীন স্বীকৃতি, দায়িত্ব সামলাতে পারবে তো শতবর্ষীয় বিশ্বভারতী?

ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় শান্তিনিকেতন

ভারতের ৪১তম বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেল শান্তিনিকেতন, নিঃসন্দেহে খুশির খবর। এক্স হ্যান্ডেলে (পূর্বতন টুইটার) ইউনেস্কোর তরফে রবিবারের ঘোষণা অবশ্য গত পঁচিশে বৈশাখই মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছিল। সেই দিনই ইউনেস্কোর উপদেষ্টা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (ICOMOS)-এর তরফে শান্তিনিকেতনের নাম সুপারিশ করা হয়। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মতো বঙ্গদর্শন.কম-এর তরফেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, “বিশ্বভারতী হবে বিশ্বের প্রথম হেরিটেজ বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমান শিক্ষা-গবেষণার মান কেমন?”। ১৭ সেপ্টেম্বর, রবিবার রিয়াধে ইউনেস্কোর ৪৫তম বিশ্ব হেরিটেজ কমিটির বৈঠকে এল চূড়ান্ত স্বীকৃতি। পশ্চিমবঙ্গে একক ভাবে একমাত্র শান্তিনিকেতনই এই গৌরবের অধিকারী হলো। কিন্তু, এমন খুশির দিনেও গত কয়েক বছরের ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি প্রশ্ন তুলছে, এই গৌরব, এই গুরুদায়িত্ব সামলাতে পারবে তো বিশ্বভারতী—রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন?

১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন স্কুল শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা বিশ্বভারতীর। ১৯৫১ সালে তা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। শান্তিনিকেতনের স্থাপত্যে প্রাচ্যের মৌলিকতা দেখেছে ইউনেস্কো। রবীন্দ্র ভাবনা ও সাহিত্যের ছায়ায় ঘরবাড়ি, চিত্রকলা, গৃহসজ্জার সঙ্গে নিসর্গের বিন্যাস ইউনেস্কোর শর্ত পূরণ করেছে। বিশ্বভারতীর শিক্ষাপ্রাঙ্গণের যা 'কোর এরিয়া', তার ৩৬ হেক্টর জমিকেই ঐতিহ্যক্ষেত্রের স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এর মধ্যে শান্তিনিকেতনের আশ্রম, উত্তরায়ণ, কলাভবন, সঙ্গীতভবন প্রাঙ্গন রয়েছে। এই স্বীকৃতির সঙ্গে এও বিশেষ ভাবে মনে রাখতে হবে, যে শান্তিনিকেতন এখন কারুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বা কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর চারণভূমি নয়। সকলের জন্যই শান্তিনিকেতন তথা বিশ্বভারতী, তাকে সেভাবেই সগৌরবে উজ্জ্বল রাখতে হবে। 

শান্তিনিকেতনে প্রথম দূরদর্শন কেন্দ্র স্থাপন করা এবং তার প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, উপস্থাপক পঙ্কজ সাহা। এছাড়াও পেশাজীবনে কলকাতা দূরদর্শনের প্রথম দিন থেকেই রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। স্বীকৃতির খবর পাওয়ার পর, তিনি এ ব্যাপারে বলেন, “শান্তিনিকেতন স্বাভাবিকভাবে আমার কাছে ‘সব হতে আপন’। অল্প বয়সের যোগাযোগের কথা ছেড়ে দিলেও আমার পেশাজীবনে কলকাতা দূরদর্শনের প্রথম দিন থেকেই রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। আমার সৌভাগ্য যে শান্তিনিকেতনে প্রথম দূরদর্শন কেন্দ্র স্থাপন করা এবং তার প্রথম ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেবার সূত্রে আমি শান্তিনিকেতনে বসবাস করেছি এবং শান্তিনিকেতন নিয়ে বহু অনুষ্ঠান রেকর্ডিং করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আজ বাংলার এবং ভারতের পক্ষে খুবই গর্বের বিষয় যে শান্তিনিকেতন আজ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষিত হলো। রবীন্দ্রনাথ ভারতে দূরশিক্ষা Distant Education প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও অগ্রণী পুরুষ। সেই সূত্রে দক্ষিণ কলকাতার একটি কেন্দ্রে আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোর্সে ছাত্র হই বিশ্বভারতী অনুমোদিত অধ্যাপকের কাছে সিলেবাস অনুযায়ী ক্লাস করে, বিশ্বভারতী প্রেরিত প্রশ্নপত্র অনুযায়ী পরীক্ষা দিয়ে বিশ্বভারতীর অধ্যাপকরা আমার পরীক্ষার খাতা দেখেন এবং সেই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হবার সূত্রে আমিও বিশ্বভারতীর  প্রাক্তনী। শান্তিনিকেতন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হওয়াতে আমি খুব আনন্দিত এবং গর্বিত। কিন্তু সেইসঙ্গে শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীর সবাইকে সবিনয়ে মনে করিয়ে দিই যে এতে তাঁদের দায়িত্ব অনেক বাড়লো।”

মনে রাখতে হবে এই স্বীকৃতি বছর-বছর খতিয়ে দেখে ইউনেস্কো। ‘বিশ্ব-ঐতিহ্য’ তালিকা থেকে ছাঁটাই হয়ে যাওয়ার নমুনাও আছে। তাই, খুব আনন্দের বিষয় হলেও দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে গেল, এমনটাই মত বিশিষ্টদের।

পঙ্কজবাবুর শেষ কথাটিই বারবার উঠে আসছে আলোচনায়—দায়িত্ববোধ। মনে রাখতে হবে এই স্বীকৃতি বছর-বছর খতিয়ে দেখে ইউনেস্কো। ‘বিশ্ব-ঐতিহ্য’ তালিকা থেকে ছাঁটাই হয়ে যাওয়ার নমুনাও আছে। তাই, খুব আনন্দের বিষয় হলেও দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে গেল, এমনটাই মত বিশিষ্টদের। বিশ্বভারতীর বর্তমান কর্তাব্যক্তিরা সেই দায়িত্ব কতটা পালন করবে, এ বিষয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। হেরিটেজ ঘোষণা হওয়ার আগেই এ বিষয়ে বঙ্গদর্শন.কম-কে শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার জানিয়েছিলেন, এসব স্বীকৃতি বাইরের জিনিস। বিশ্বভারতীর শিক্ষা আর গবেষণার মান আরও উন্নত না হলে কিছু হবে না। আবার বিশ্বভারতী কৃতি প্রাক্তনী, সংগীতশিল্পী সাহানা বাজপেয়ী-র গলাতেও ধরা পড়েছিল উদ্বেগ। তিনি জানিয়েছিলেন, স্বীকৃতি যথার্থ, এবং তাঁর মতো যাঁরা ওখানে পড়েছেন, তাঁদের কাছে খুবই আনন্দের বিষয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেগাসি কি যথার্থই বহন করছে বিশ্বভারতী, বিশেষত এই সময়ে? আমাদের অনেকের কাছে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের সদুত্তর খোঁজাটাই নৈতিক দায়িত্ব। বিশ্বজনীন রূপ পেতে হলে শুধুমাত্র ইউনেস্কোর ছাপ্পা থাকলেই হয় না। যথার্থ বিশ্বজনীন হতে হয়।

 

দেশবিদেশ থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী একসময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রাক্তনীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্কারবিজয়ী চিত্র-পরিচালক সত্যজিৎ রায়, জয়পুরের রানি তথা কোচবিহারের রাজকন্যা গায়েত্রীদেবী, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি প্রমুখ। এই স্বীকৃতি ধরে রাখতে গেলে রবীন্দ্র ভাবাদর্শের পরিপন্থী পদক্ষেপ বিশ্বভারতীকে এড়িয়ে চলতে হবে। কিন্তু, পড়াশোনার মান নেমে যাওয়াই নয়, শোনা যায় ল্যাব থেকে জিনিসপত্র চুরি যাওয়া, টানা অবস্থান মঞ্চ, মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্মে ব্যাঘাত। এভাবেই দিন কেটেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। আন্তর্জাতিক সম্মানে সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন এই ধরনের ছাত্র আন্দোলন, বিশ্বভারতীর পরম্পরা কি আদৌ সুরক্ষিত? উঠে আসছে নানা প্রশ্ন, নানা মন্তব্য-বক্তব্য। প্রশ্ন উঠছে সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে।

প্রাচীন তপোবন-জীবনের আদর্শেই রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তাঁর বিদ্যালয়কে। রুশো যেমন প্রকৃতির জীবনকেই আদর্শ মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথেরও ধারণা ছিল আরণ্যক জীবন মানুষকে এক আশ্চর্য গতিশক্তি দিয়েছিল, বিশ্বব্যাপী বিরাট জীবনের সঙ্গে এক অবারিত যোগ স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের এই তপোবন-ভাবনাকে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চিন্তার একটি প্রতীক হিসেবে বিচার করা বোধহয় নির্বোধের লক্ষণ। দুঃখের কথা, ওই ভাবনার পিছনে যে তাঁর নিজস্ব প্রকৃতিচিন্তা আর সৌন্দর্যচেতনার প্রভাবই ছিল আসল কথা, তা আজ আলাদা করে আলোচনার বিষয়। মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, আদর্শ বিদ্যালয় হবে ‘নির্জনে মুক্ত আকাশ ও উদার প্রান্তরে, গাছপালার মধ্যে’, শিক্ষার লক্ষ্য হবে : ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে চিত্তের যোগ’; কেবল ইন্দ্রিয়ের বা জ্ঞানের শিক্ষা নয়, ‘বোধের শিক্ষা’। 

ছবিঋণঃ
United Nations India

Developed by DXDasia