
আজ শচীন দেব বর্মনের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী
কারো কাছে তিনি শচীন দেব বর্মন, কারো কাছে এসডি বর্মন। কেউ বা তাঁকে শচীন কর্তা বলে ডাকেন। ভারতীয় সংগীত জগতে তাঁর অবদান কারো অজানা নয়। প্রবাদপ্রতীম গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক তিনি। এক সময়ে বলিউডে গানের সাম্রাজ্য আক্ষরিক অর্থেই শাসন করতেন।
তিনি ছিলেন ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের সন্তান। জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লায়। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ, সেতার বাজানোতেও পারদর্শী। তাঁর কাছেই তালিম শুরু করেন শচীন। তারপর কৃষ্ণচন্দ্র দে, উস্তাদ বাদল খান, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, উস্তাদ আলাউদ্দিন খান এমনকি কাজী নজরুল ইসলামকেও পেয়েছিলেন গুরু হিসেবে। শিখেছিলেন লোকসংগীতও। অল্প বয়স থেকেই লোকসংগীত সংগ্রহ করার নেশা তাঁকে পেয়ে বসেছিল।
১৯২৩ সালে কলকাতার আকাশবাণী বেতারকেন্দ্রে প্রথমবার সংগীত পরিবেশন করেন শচীন দেব বর্মন। তাঁর প্রথম গ্রামাফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। ওই সময় থেকেই গানের পেশাদারি জগতে প্রবেশ করেন। বাংলা ও হিন্দি একের পর এক রেকর্ড বের করতে থাকেন। বাংলা থিয়েটারে কাজ করতেন। বেশ কিছু বাংলা ছবিতে সংগীত পরিচালকের ভূমিকা পালন করেছিলেন তখন – ‘রাজগী’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘মাটির ঘর’, ‘জীবন-সঙ্গিনী’ প্রভৃতি। এরই মধ্যে ছাত্রী মীরা দাশগুপ্তকে বিয়ে করেছেন। ১৯৩৯ সালে রাহুল দেব বর্মনের জন্ম হয়।
শচীন ১৯৪৪ সাল থেকে বোম্বে শহরে বসবাস করতে থাকেন, নতুন অধ্যায় শুরু হল তাঁর জীবনে। অশোক কুমারের দু’টি সিনেমায় প্রাথমিকভাবে কাজ করেন। ১৯৪৭-এ ‘দো ভাই’ সিনেমার জন্য বিখ্যাত হয়ে যান। ওই ছবিতে গীতা দত্তের একটি গান তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। একের পর এক হিন্দি ছবিতে তখন সংগীত পরিচালনার জন্য ডাক পেতে থাকেন। তখন একই সঙ্গে বাংলা এবং হিন্দি সিনেমায় কাজ করতেন।
বলিউডে গান নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন শচীন। বলিউডে তখন যে কোনো গান প্রথমে গীতিকার লিখতেন, তারপর সুরকার সুর দিতেন। শচীন কর্তা শুরু করলেন কথা বসানোর আগেই সুর ঠিক করা। এখনো বলিউডে বেশিরভাগ গানে সুর আগে দেওয়া হয়। ওই সময়ে প্রত্যেক অভিনেতার জন্য প্লেব্যাক গায়ক নির্দিষ্ট করা থাকত। কিশোর কুমার গাইতেন দেবানন্দের জন্য, মহম্মদ রফি গাইতেন শাম্মি কাপুরের জন্য। শচীন দেব বর্মন এই নিয়ম ওলটপালট করে দিলেন। একই সিনেমায় দেবানন্দের জন্য কিশোর ছাড়াও মান্না দে এবং মহম্মদ রফিকে দিয়ে গাওয়ালেন। ‘নটি বয়’ ছবিতে খোদ কিশোর কুমারের জন্য প্লেব্যাক করলেন মান্না দে। ভাবা যায়!
আরও পড়ুন: ‘মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য’ ও মানবেন্দ্র
বলিউডে খ্যাতির শীর্ষে উঠেছিলেন শচীন দেব বর্মন। যদিও প্রবল ধাক্কা খেয়েছেন কয়েকবার। লতা মঙ্গেশকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত শুরু হয়েছিল। যা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। ছেলে রাহুল দেব বর্মন পাশ্চাত্য ধারার সংগীতের প্রয়োগে জোর দিতেন। শচীন একেবারেই পছন্দ করতেন না। দেশীয় সংগীতের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর।
খেলার জগতে শচীনের আগ্রহ ছিল। নিজে ভালো টেনিস খেলতেন। ফুটবলও খেলতেন দুর্দান্ত। আমৃত্যু ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার।
তথ্যঋণ – আশীষ চক্রবর্ত্তী, আলি নওয়াজ।
