জার্মান ভাষায় রবীন্দ্রসংগীত! প্রবাসে মঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত বাংলা ব্যান্ড ‘নস্টালজিয়া’

হৃদয়ে কলকাতা, তাই জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে গড়েছেন বাংলা গানের দল

উপমহাদেশে ব্যান্ড একটা যুগ। আর তা যদি বাংলা ব্যান্ড হয়, তাহলে বাঙালির হিয়া কাঁপবে না! চোখের সামনে এক পলকে চলে আসে মঞ্চ কাঁপানো পারফর্মারদের একঝাঁক মুখ। সেই উদ্দাম কাঁধ ঝাঁকিয়ে নাচ, গিটার ধরে চুল উড়িয়ে নব্য বঙ্গসন্তানদের যৌবনের সেই রং মেখে আজও বাঙালি বসন্ত উদযাপন করে। ভারত হোক বা বাংলাদেশ, প্রবাসী হোক বা ঢাকাইয়া বা কলকাত্তাইয়া – বাংলা ব্যান্ড কিন্তু কয়েকটা প্রজন্ম আছন্ন করে রেখেছিল একটা সময়। এখনও তারা ব্যান্ডের কাছে সমর্পণ করে রেখেছে নিজেদের।

প্রবাসী বাঙালি অর্ণব গুহ তেমনি একজন বাংলা ব্যান্ড প্রেমী। পেশায় জার্মানির ডয়চে ব্যাংকের কর্মী অর্ণব এ শহর থেকে পড়াশুনো আর পেশার দায়ে নির্বাসিত হয়েছেন কবেই। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে বাস করে কলকাতা আর বাংলা ব্যান্ড। তাই জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টেও গড়েছেন বাংলা গানের দল ‘নস্টালজিয়া’। ২০২০-তেই জন্ম হয়েছে নস্টালজিয়ার। প্রায় করোনার বছরই। তাই আপাতত থমকে গেছে চলার পথ। থমকে গেছে রিহার্সাল। কিন্তু বেঁচে রয়েছে স্বপ্নটা। 

সদ্য কলকাতায় অর্ণব এসেছিলেন। বলছিলেন চলার পথের গল্প। আর পাঁচটা বাঙালি ছেলের মতোই মায়ের গান শুনে বা তবলা শিখে বড়ো হয়েছেন। মাঝেমাঝে পাড়া বা স্কুলের ফাংশনে মাইক্রোফোন ধরে গায়ক হয়ে ওঠার অভ্যেস আর স্বপ্ন আঁকড়ে সল্টলেকের ফাল্গুনী আবাসনে আর পাঁচজনের মতোই বেড়ে উঠেছেন। মহীনের ঘোড়াগুলি, পরশপাথর, লক্ষ্মীছাড়া, চন্দ্রবিন্দু, মাইল্‌স, ফসিল্‌স শুনতে শুনতে কবে থেকে যেন নিজের একটা বাংলা ব্যান্ডের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। বেঙ্গালুরুতে চাকরি করতে করতেই ‘আলপিন’ নামে একটি ব্যান্ড শুরু করেন। তারপর আলপিন-এর চলার পথ সংগীত জগতে প্রশস্ত হতে হতেই অর্ণব ততদিনে জার্মানিতে চলে যান। গান লেখা আর সুর করার সুখে ছেদ দিয়ে আবার যাত্রপথ বদল। আবার স্বপ্ন দেখার শুরু। সেটা এবার পূর্ণতা পায় পিয়ালী ভৌমিক, ইন্দ্রনীল রায়ের হাত ধরে। সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী সোনালি নাথ গুহ। শুরু হল নস্টালজিয়া। 

কী পরিকল্পনা? প্রবাসের বাঙালিকে কেমন বাংলা গান শোনাবেন? অর্ণব বলেন, “বাউলের সঙ্গে বাঙালি সর্বত্রই একাত্মবোধ করেন। বাউলের সঙ্গে জ্যাজ-রকের মিশেলে ফিউশন গান মানুষ পছন্দ করেন। সঙ্গে অঞ্জন দত্তের জীবনমুখী গান, বাংলা ব্যান্ডের গানও। অবশ্য মানুষ এখনও পুরোনো হিন্দি গান, রবীন্দ্রসংগীতও ভালোবাসেন শুনতে। ভাষ্যের বুননের সঙ্গে এ সব গান জুড়ে শ্রোতাদের নস্টালজিক সফর করাতে চাই।”
 
ভবিষ্যতে রবীন্দ্রসংগীতকে জার্মানে অনুবাদ করে গাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নস্টালজিয়ার। তাছাড়া রবীন্দ্রসংগীতে আধুনিক গিটার ব্যবহার করে ব্যান্ডের এসেন্স দিয়ে গাইতে চায় নস্টালজিয়া। বৃহত্তর ইউরোপের কাছে রবীন্দ্রসংগীতকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এমন পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নস্টালজিয়া মানে পুরোনো, ভালো স্মৃতি, পুরোনো জিনিসটা ফিরিয়ে আনা। সেই স্মৃতিই প্রবাসে উস্কে দিতে চান অর্ণবের দলবল। সোজা ভাষায়, সাঙ্গীতিকভাবে ফিরে আসা। নিজেদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য তাঁরা নিজেদের পেশার বাইরেও বাংলা গানের চর্চা করেন, সৃষ্টিশীল আদানপ্রদান পৌঁছে দেন প্রবাসীদের কাছে। ব্যান্ডের গান গেয়ে বিখ্যাত হওয়ার লোভ নয়, বরং বাংলা গানকে প্রবাসের দোরে দোরে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আবার শুরু অন্য পথ চলার। অর্ণবের ভাষায়, “যাঁরা ওখানে থেকে বাংলা গান শুনতে পান না, খুব মিস করেন বাংলা গানকে, সেই সব বাঙালিদের পাশাপাশি সবার মধ্যে আমাদের শিকড়ের চেতনা ছড়িয়ে দিতে চাই।”

নিজেদের গান লেখা বা সুর দেওয়ার কথা ভাবছেন? না, এখনই নয়। গত দশ বছর ধরে জার্মানির বাসিন্দা অর্ণব বলেন, “নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে গেলে আগে চেনা জানা গানই আমাদের গাইতে হবে।” তাঁর ব্যাখ্যা, নতুন গান লিখে তাতে সুর সংযোজন করে মানুষের সামনে পরিচয় হিসেবে তুলে ধরতে যথেষ্ট সময় লাগবে। তাই বাঙালির পছন্দের ফেলে আসা গান শুনিয়ে নস্টালজিক করে তুলতে চান বিদেশকে। তারপর শুরু হবে গান লেখা বা সুর সংযোজনের কাজ। 

জার্মানিতে ব্যান্ড কালচার রয়েছে। তবে সেটা জার্মান বা ইংরাজিতে। সেখানেই প্রবাসীদের কাছে নস্টালজিয়ার গুরুত্ব। পঞ্চাশের দশকের মহীনের ঘোড়াগুলির যুগ আজ নেই। পার হয়ে এগিয়েছে অনেকগুলি বছর। চন্দ্রবিন্দু, ক্যাকটাস হইহই করে পঁচিশ বছর কবেই পার করে ফেলেছে। ভেঙে গিয়েছে ভূমির সংসার। আইয়ুব বাচ্চু এবং দোহারের কালিকাপ্রসাদ সকলকে ফাঁকি দিয়ে পরপারের গায়ক। তাও ব্যান্ড বাঙালির হৃদয়ে রয়ে গিয়েছে। সেই স্মৃতি নিয়েই প্রবাসে প্রবাসীদের হাতে বাংলা ব্যান্ডের পত্তন। এমন ব্যান্ড নাকি প্রবাসে এই প্রথম। নস্টালজিয়ার সদস্যদের এমনটাই দাবি। অর্ণব জানান, জার্মানিতে কলকাতা এবং বাংলাদেশের উভয় বাঙালির কাছেই বাংলা ব্যান্ডের গান আজও জনপ্রিয়। তাই ব্যান্ডের গান বলতে শুধু পৃথিবী (মহীনের ঘোড়াগুলি) বা রাত্রি (মরুদ্যান)-র মতো গান নয়, বরং ওপার বাংলার আইয়ুব বাচ্চুর সেই তুমি (এলআরবি), মৌসুমী কারে ভালবাসো তুমি (ফিডব্যাক), ফিরিয়ে দাও (মাইলস) প্রভৃতি গান যেগুলো এখনও মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে।  

প্রত্যেকেই পেশাগত কারণে যথেষ্ট ব্যস্ত থাকেন। তাই পেশাগত জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যান্ডের কথা ভাবছেন। পেশার সঙ্গে প্যাশনকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তাঁরা। সময় বার করে নেওয়ার পক্ষপাতি ব্যান্ডের সদস্যরা সপ্তাহে এক-দু দিন দেখা করে রিহার্সাল করছেন।

আপাতত বিদেশের মাটিতে বাঙালিদের সংযোগের সবচেয়ে বড়ো মাধ্যমই দুর্গাপুজো। খুব শিগগিরই হয়তো বার্লিন বা ফ্রাঙ্কফুটের কোনো দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মঞ্চ মাতাতে নেমে পড়বে বাঙালিদের ব্যান্ড নস্টালজিয়া। এক টুকরো কলকাতা ফুটে উঠবে ইউরোপের বুকেও। সেখানেই বঙ্গসন্তান গাইবেন নিজেদের লেখা গান। শ্রোতারা কয়েক দশক পিছনে হেঁটে খুঁজে পাবেন এ কালের লক্ষ্মীছাড়ার গাবু-ঋষভ, ক্যাকটাসের পটা-সিধু, মাইলসের আহমেদ ভ্রাতৃদ্বয় বা চন্দ্রবিন্দুর অনিন্দ্য-উপলকে। 

Developed by DXDasia