এসডি বর্মনকে সলিল চৌধুরী আশ্বস্ত করে বললেন, “পঞ্চমকে ওর মতো হতে দিন”

আমাদের পুরো হৃদয়টাই যেন বন্ধক আছে রাহুল দেব বর্মনের কাছে

প্রথম বর্ষার জলছাপে ভিজে যাচ্ছেন কোটপ্যান্টের অমিতাভ বচ্চন, তার হাত ধরে নিশ্চিন্তে ভিজছেন মৌসুমী চ্যাটার্জি। কোনোদিন বৃষ্টিতে না ভেজা ঘরের বাধ্য ছেলে বা মেয়েটিও এই দৃশ্যে আর নিজেকে আটকাতে পারছে না যেন। লতা মঙ্গেশকর, কিশোরকুমার যতবার 'রিমঝিম গিরে শাওন' বলে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, জলের ওপর পা ফেলার  ছপাক ছপাক শব্দে ততই ক্রমশ যেন অস্থির হচ্ছে সে মন। আর এসবের মাঝেই অলক্ষ্যে অপলক তাকিয়ে হাসছেন যিনি, তাঁর নামে সুর, গানে সুর, প্রাণে সুর। সুরকে দিয়ে শব্দকে জীবনভর খেলিয়ে বেড়ানো এই মানুষটিই রাহুল দেব বর্মন যিনি নিজেই ভারতীয় সংগীত জগতকে উপহার দিয়ে গেছেন স্বতন্ত্র একটি ঘরানা; ‘আরডিবি’ যুগ। আধুনিকতম সুরকার, গীতিকার নির্বিশেষে সে যুগচিহ্ন আজও বহন করে চলেছেন তাঁদের কাজে, সচেতনে বা অবচেতনে।

যুগের পালে হাওয়া ওঠে। এক একটা শব্দ সে হাওয়ায় আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে ‘ভাইরাল’ হয়। তেমনই ভাইরাল হওয়া একটি শব্দ ‘স্টার কিডস্’; এই অভিধায় আরডি বর্মনকে চিনতে গেলে তা আদতে চরম বোকামির নামান্তর। এটা সর্বৈব সত্য যে মেঠো সুরের রাজা শচীন দেব বর্মনের সন্তান রাহুল দেব সেই অর্থে তারার আলোমাখা পথে সহজেই হাঁটা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সে হেঁটে চলায় তাঁর প্রতিভা ও  নিজস্বতার বয়ান লেখা আছে খুব স্পষ্ট করেই। কাজ পাইয়ে দেওয়া তো দূর বরং এমনও হয়েছে মতের মিল না হওয়ায় এসডি বর্মন স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছেন ছেলেকে, ছেলের গানের সুরে তীব্র ভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ এ আর.ডি’র ‘দম মারো দম’ শুনে বিরক্ত হয়ে শচীনদেব  সুরের জাদুকর সলিল চৌধুরীকে ডেকে বলছেন, “ও আমার পোলা, তোমার চেলা। কী করতাসে আমি বুঝতে পারি না। তুমি ওরে কও”। সলিল চৌধুরী আশ্বস্ত করলেন, “পঞ্চমকে ওর মতো হতে দিন। দেখবেন ও সংস্কৃতি হারাবে না আবার নিজের জায়গাও তৈরি করে নেবে”। আশ্চর্য এই বাবা, ততোধিক আশ্চর্য সেই ছেলে। সলিলবাবুর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। আরডির সুরে বুঁদ হল মানুষ, সুরের মৌতাতে মজে গেল আপামর ভারতবর্ষ। তথ্য বলে মুম্বই ইন্ডাস্ট্রিতে তিরিশ বছর রাজ করে শচীন দেব বর্মন যেখানে ৮৯টি ছবিতে মিউজিক করেছেন, সেখানে বত্রিশ বছরের কাজের জীবনে বাংলা হিন্দি তামিল তেলুগু ওড়িয়া মারাঠি ছবি ধরলে আরডি'র কাজ ৩৭২টি, যার মধ্যে শুধুমাত্র হিন্দি ছবিতেই কাজ ২৯২টি।  এমনই দুরন্ত ছিল রাহুল দেব বর্মনের কাজের গতি।

লোকমুখে প্রচলিত, রাহুল দেব একদম ছোটোবেলায় কান্নার সময়ে অজান্তেই ‘পা’ সুরে কাঁদতেন বলে, অভিনেতা অশোক কুমার তাঁর নাম রাখেন ‘পঞ্চম’। সুরের সেই যেন শুরু। বাবা শচীনদেব ও মা মীরা বর্মনের সুরের ছায়ায় বড়ো হওয়া এই মানুষটি মাত্র ন’বছর বয়সেই প্রথম সুর করে ফেলেছেন, যা পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে ‘ফান্টুশ’ সিনেমায় ব্যবহার করছিলেন এসডি বর্মন। মিউজিক ছিল আরডি'র রক্তে, তবু প্রথাগত সুরের সাধনায় নাড়া বেঁধেছিলেন উস্তাদ আলি আকবর খান, সমতা প্রসাদ প্রমুখ সাধকদের কাছে। এসডি বর্মন, সলিল চৌধুরী প্রমুখ’র সহকারি হিসাবে কাজ করতে গিয়ে রাহুল দেব শিখেছিলেন প্রচুর। ‘চলতি কা নাম গাড়ি’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘তেরে ঘর কে সামনে’ কিংবা ‘গাইড’-এ শচীনদেবের সহকারি হিসাবে কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছিল আরডি’র। এরপর ১৯৬১-তে আসে রাহুল দেবের একক সংগীত পরিচালনায় ‘ছোটে নওয়াব’। তবে আর ডি’র প্রথম একক হিট ১৯৬৬-তে ‘তিসরি মঞ্জিল’ সিনেমার মিউজিক। তবে এখানে শুধু সুরকার হিসেবেই  নয়, গায়ক রাহুল দেবও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সকলকে। রক, জ্যাজ্, ল্যাটিনো, টুইস্ট, পপ, লোকগান, নেপালি মাদল, কাচের গ্লাস, জল ভর্তি বোতল, এমনকি নিজের স্বরগ্রামের আশ্চর্য মিশেলে তৈরি হয়েছে ‘আরডি রিদম্’। রাজেশ খান্নার স্টারডম্,  কিশোরকুমার, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, মহম্মদ রফি'র মতো মহান শিল্পীদের সংগীত জীবনের ‘গোল্ডেন পিরিওড’ গর্বিত হয়েছে আরডি'র সুরে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’ যুগে যুগে মানুষের মনে অনুরণিত হবে যে যে কারণে, তার অন্যতম একটি কারণ নিশ্চয় এই গানে বাজানো পঞ্চমে'র হারমোনিকা। এদেশে রাহুল দেবই প্রথম ইলেকট্রনিক অর্গানের সঙ্গে ভারতীয় শ্রোতাদের পরিচয় ঘটান। চেলো ও বাজ গিটারের সুরও তাঁর হাতেই প্রথম শুনেছে ভারত। শয়নে স্বপনে জাগরণে সুর খুঁজতেন যেন পঞ্চম, তাই কী অনায়াসে কাচের গ্লাসে চামচ ঠুকে আশা ভোঁসলে’কে দিয়ে গাইয়ে নেন ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে যো দিলকো’। ডেস্ক বাজিয়ে রেকর্ড করে ফেলেন ‘মাষ্টারজি কি আ গয়ি চিঠ্ঠি’, জল ভর্তি বোতলের শব্দ ব্যবহার করে কম্পোজ করলেন ‘ও মাঝি রে’। সোডার বোতলে ফুঁ দিয়ে সুর তুললেন ‘শোলে’তে… এরকম যে আরও কত অজস্র চমকপ্রদ বিষয় জড়িয়ে আছে রাহুল দেব বর্মনের সুরে তার ইয়ত্তা নেই। পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের মিশ্রনেও আরডি’র সমস্ত কাজে সবসময় অরিজিনালিটিই খুঁজে পেয়েছেন শ্রোতারা। ‘চিঙ্গারী কই ভড়কে’, ‘তুম কেয়া জানো মোহব্বৎ ক্যায়া হ্যায়’,  ‘তেরে বিনা জিয়া যায়ে না'’, ‘ইয়ে দোস্তি’, ‘তুঝসে নারাজ নহি জিন্দেগি’,  ‘এক চতুর নার’, ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে কোয়ি’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘রৈনা বিতি যায়ে’, ‘মেরে সামনেওয়ালি খিড়কি ম্যায়’… আরডি বর্মনের ক্ষেত্রটা যে দুহাতে বাঁধা যায় না। পুজোর অ্যালবামে এখনও রেট্রো গান হিসেবে বাজে ‘ফিরে এলাম দূরে গিয়ে’, ‘কোথা কোথা খুঁজেছি তোমায়’, ‘মনে পড়ে রুবি রায়’-এর মত অবিস্মরণীয় গান। শচীন ভৌমিকের হাতে বাঙালির চিরকালের রুবি রায় যেন হয়ে ওঠেন পঞ্চমই।

বাবা শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে ছেলে রাহুল দেব বর্মন 

এত সফলতাতেও কালো ছায়া নেমে এসেছিল সময়ের ফেরে, বেশকিছু উল্লেখযোগ্য কাজ না পাওয়া, বেশ কিছু ভাঙন পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সুর নতিস্বীকার করেছিল রাহুল দেব বর্মনের কাছে। আর এ প্রসঙ্গেই ‘নাইন্টিন ফরটি টু আ লাভ স্টোরি’ উল্লেখ্য। ‘কুছ না কহো’-তে নিজেকে যেন সম্পূর্ণ উজাড় করে দিলেন তিনি। এই সিনেমা মানুষ মনে রাখল তাঁর গানের জন্যই। আরডি'র সুরে ‘সময়কা ইয়ে পল/ থামসা গয়া হ্যায়’ যেন সত্যি সত্যি এক স্থির অবয়ব পেল। পেলব করে বলা প্রেমালাপ অমোঘ হয়ে উঠল ‘এক লেড়কি কো দেখা’ কিংবা ‘দিল নে কাহা চুপকে সে’ উচ্চারণে। ‘রুঠ না যানা’য় মুগ্ধ হননি এমন মানুষ বোধহয় নেই কেউ। রাহুল দেব বর্মন এমনই এক মিঠাস সুরের নাম, যে দশকের পর দশক পেরিয়ে আজও যে কোন সুরের জলসায়, গানের রিয়েলিটি শো, অ্যাওয়ার্ড ফাংশানে স্বতন্ত্র স্বপ্নের জাল বুনে চলে।

বেঁচে থাকলে আজকের দিনে আশি বছর পূর্ণ করতেন আরডি। ১৯৯৪-তে তাঁর অকালমৃত্যুর পরও এতগুলো দিন কেটে গেছে। তবু আজকের এই সাউন্ড টেকনোলজির যুগে দাঁড়িয়েও একবাক্যে বলা যায় ইন্ডিয়ান ফিল্ম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে রাহুল দেব বর্মনের কোনও বিকল্প নেই। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁর অমূল্য সব সৃষ্টি। যার জন্য প্রতি পলেই অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতায় আরডিকে ভরিয়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কিছুই থাকে না। 'ইজাজত'-তে, গুলজার সাবের কথায় রাহুল দেব বর্মনের সুরে তাঁকেই যেন বারবার তাই বলতে হয় 'মেরা কুছ সামান্ তুমহারে পাস পড়া হ্যায়'। তবে এক্ষেত্রে আমাদের ‘সামান্ সামান্য নয়, আমাদের পুরো হৃদয়টাই যেন বন্দক আছে রাহুল দেব বর্মনের কাছে।

তথ্য সৌজন্যেঃ আনন্দবাজার আর্কাইভ

Developed by DXDasia