
গানের নেপথ্যে লুকিয়ে বাস্তবের এক নারী
তখন পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশক। সেই যুগে পুজো উপলক্ষ্যে বাজারে আসতো একঝাঁক নতুন গান। কিশোর কুমার, ইলা বসু, সবিতা চৌধুরী, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো কালজয়ী শিল্পীদের ‘পুজোর গান’ ছাড়া আম-বাঙালির শারদোৎসব জমতই না। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে অন্য সব গানের মতোই পুজোর গান পাওয়া যেত ভিনাইলের রেকর্ডে। তারপর সত্তরের দশকে সাউন্ড রেকর্ডিং-এর জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল। গ্রামাফোন রেকর্ডের বদলে চালু হল অডিও ক্যাসেট। ভিনাইলের চাকতি বড়োজোর দু’দিকে মোট দু’টো কি চারটে গান ধরাতে পারত। কিন্তু অডিও ক্যাসেটে দশ-বারোটি গান ধরে যেত সহজেই। অডিও ক্যাসেট আসার পর বাংলায় একের পর এক পুজোর গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হতে থাকল।
পুজোর গানে রাহুল দেব বর্মন প্রথম গেয়েছিলেন ১৯৬৯ সালে। এর আগেই অবশ্য তাঁর দেওয়া সুরে “এই এদিকে এসো, এসো না” কিংবা “যাব কি যাব না ভেবে ভেবে” গানগুলি বাঙালির পুজোকে মাতিয়ে দিয়েছিল। শচীন ভৌমিকের কথার এবং নিজেরই সুরে ১৯৬৯-এর পুজোয় আর ডি বর্মন গাইলেন সেই বিখ্যাত “মনে পড়ে রুবি রায়”। বঙ্গতনয়-তনয়াদের বুকে ঝড় তুলে দিল ট্র্যাজিক প্রেমের গানটি। রুবি রায়ের মধ্যে তখনকার প্রত্যেক যুবক খুঁজে পেতে লাগল নিজের গোপন প্রিয়াকে, নীরবে নিভৃতে এতদিন যাকে সে পুজো করে আসছিল। আসলে প্রত্যেক আনকোরা তরুণের জীবনেই এক বা একাধিক রুবি রায় আছে। তাদের নাম হয়তো আলাদা আলাদা। তবে লুকোনো প্রেমিকটির চেয়ে তারা বয়সে বড়ো, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে তাদের অবস্থান, এবং অল্পবয়সী গোপন অনুরাগীর ব্যাপারে তারা একটু বেশিই উদাসীন। রাহুল দেব বর্মনের গাওয়া সেই প্রথম পুজোর গান এবছর সুবর্ণজয়ন্তীতে পা দিল।

কিন্তু আর ডি বর্মনের সেই গানের রুবি রায় আসলে কে? জানা যায়, গানটি যিনি লিখেছিলেন, সেই শচীন ভৌমিক নিজের জীবনে ছবি রায় নামের একজন মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন, যদিও সেই মেয়ে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং, এটা বলা যেতেই পারেই, রুবি রায়ের আসল নাম ছবি রায়। যে রেকর্ডে “মনে পড়ে রুবি রায়” গানটি ছিল, তারই উল্টো পিঠে “ফিরে এসো অনুরাধা” গানটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই গানটিও অসম্ভব জনপ্রিয় হয় তখন। অনেকেই ভাবতেন, অনুরাধা নামেও হয়তো বাস্তবে কোনো নারী ছিল, যাকে শচীনবাবু চিনতেন। তবে সেরকম কোনো ব্যাপার ছিল না। শচীন ভৌমিকের লেখা প্রথম চিত্রনাট্যটি ছিল ‘অনুরাধা’ ছবির। সেখান থেকেই তিনি গানের জন্য নিয়েছিলেন ‘অনুরাধা’ নামটি। ১৯৭৩ সালে “রুবি রায়”-এর সুরেই ‘অনামিকা’ ছবিতে একটি হিন্দি গান গেয়েছিলেন কিশোর কুমার। সেই “মেরি ভিগি ভিগি সি” গানটিও বেশ জনপ্রিয়।
তথ্যসূত্র – ঠিক যেন ক্যালেইডোস্কোপ, কেয়া মুখোপাধ্যায়; এইবেলা ডট কম।
