রুমটেক মনাস্ট্রি ও লামাদের মুখোশ নৃত্য

রুমটেক মনাস্ট্রির পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে রোমাঞ্চ

ভারতের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ঘুরে এবার চলে এসেছি সিকিম। সিকিম মানে ‘সুখী গৃহ’। সত্যিই এখানকার মানুষজন বড় সুখী। চারিদিক জুড়ে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘ। যেন এক স্বপ্ন-রূপকথার জগৎ সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। ‘গেটওয়ে অব সিকিম’ নামে পরিচিত। সিকিম হয়ত আর পাঁচটা শৈলশহর সিমলা, মানালী, উটি কিম্বা নৈনিতালের মতই কিন্তু এত প্রজাতির হরেক রকমের ফুল আমি আর কোথাও দেখিনি। যেন পুরো শহরটাই আস্ত একটা ফুলের বাগিচা। শুনলাম প্রায় ছয়শো রকমের ফুল ফোটে এখানে। সিকিমের অতীত ইতিহাসের সাথে একাত্ম হয়ে রয়েছে লামাতন্ত্র। আর এখানকার রাজারাও ছিলেন বৌদ্ধ। ইদানীং বৌদ্ধধর্মের প্রতি আমার এক অদ্ভুত আকর্ষণ জন্মেছে। তা পায়ে পায়ে একদিন পৌঁছে গেলাম রুমটেক মনাস্ট্রি। গ্যাংটক থেকে চব্বিশ কিমি দূরে। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মনাস্ট্রি হল এই রুমটেক মনাস্ট্রি। আর প্রথমটি অরুণাচলপ্রদেশে অবস্থিত। রুমটেক মনাস্ট্রি ওঠার পথটি অসাধারণ। তবে বেশ চড়ায় রয়েছে। প্রকৃতিকে নিজের মত করে উপলব্ধি করতে করতে ওপরে ওঠা। পথে দেখা মিলবে লামাদের। বিভিন্ন বয়সের লামা। অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে রয়েছে মুখ জুড়ে। রুমটেক মনাস্ট্রি ঘুরে দেখতে হাতে অনেকখানি সময় থাকা প্রয়োজন। গ্যাংটক থেকে একটি বাস ছাড়ে বিকেলে, রুমটেক থেকে সেটি পরদিন সকালে ফেরে। সেটি করেও যেতে পারেন। রুমটেক মনাস্ট্রির পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে রোমাঞ্চ। মূল প্রবেশদ্বারে চেকিং হয়। দেখাতে হয় পরিচয়পত্র। আর মনাস্ট্রিতে প্রবেশের আগেও হয় আরেকপ্রস্থ চেকিং। এত কড়াকড়ির কারণ, মনাস্ট্রিটি তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত।

মনাস্ট্রিটি প্রায় হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন। চিন তিব্বত দখল করার পর গেলওয়া কর্মাপা সম্প্রদায়ের ষোড়শ গুরু সিকিমে এসে আশ্রয় নেন। সে সময়ই এর  নির্মাণকার্য শুরু হয়। তবে এখানকার আদি গুম্ফাটি নির্মাণ করান নবম গুরু কর্মাপা। যা আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। রাজা চতুর্থ চোগিয়ালের বানানো মনাস্ট্রিটিও ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে। পরে তিব্বতের বিখ্যাত ছোফুক গুম্ফার অনুকরণে তৈরি হয় রুমটেক। ষাটের দশকে সেজে ওঠে রুমটেক। এখানে রয়েছে সোনার একটি বুদ্ধমূর্তি। তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম এর নানান গাঁথা রয়েছে এখানে। অসাধারণ মুর্যা লে গুম্ফাটি সাজানো। আর রয়েছে প্রাচীন পুঁথিপত্রের বিপুল সম্ভার। পালি ভাষায় লেখা। চাইলে পড়া যায়, কিন্তু অনুমতি নিতে হয়, সাথে ভাষা জানাটাও জরুরি। শান্ত পরিবেশ। যেন পুরো পরিবেশই ধ্যানে মগ্ন।

সারাবছরই এই রুমটেক মনাস্ট্রিতে হয় নানান ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠান। যার মধ্যে অন্যতম হল, লামাদের মুখোশ নৃত্য- ‘ছাম’। গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে যে – ছৌ নাচের উৎপত্তি নাকি এই ‘ছাম’ থেকে। প্রতি বছর ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পূর্ণিমারাতে হয় এই নাচ। মনাস্ট্রি ঘুরলে দেখা মিলবে লামা নৃত্যের অসংখ্য মুখোশ। দেখতে দেখতে অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়।

একসময় আমার ধারণা ছিল এখানকার এই ছোট্ট ছোট্ট গেরুয়া জড়ানো ছেলেগুলিও লামা। আসলে কিন্তু তা নয়, এরা এসেছে গুরুগৃহে শিক্ষালাভ করার উদ্দেশ্যে। আর এখানে গেরুয়া হল অনেকটা আমাদের ‘স্কুল ইউনিফর্ম’ এর মত।

বৌদ্ধ সন্নাসীদের শান্ত আশ্রমে কাটালাম বেশ খানিকটা সময়। বেরনোর সময় মন আপনা থেকেই বলে উঠল- ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।’ আমি আবার আসব।

Developed by DXDasia