
প্রতি বছরই প্রায় ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক মহাসাগরগুলিতে এসে মেশে
হালকা, নমনীয়, টেকসই এবং মোটামুটি সব ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য হওয়ার সুবাদে প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে, কিন্তু বায়োডিগ্রেডেবল বা জীবানুবিয়োজ্য না হওয়ার কারণে এটি দূষণও ছড়ায়। বিশ্বজুড়ে প্রতি মিনিটে ১ মিলিয়ন প্লাস্টিকের পানীয় বোতল কেনা হয় এবং প্রতি বছর ৫ ট্রিলিয়ন একবার ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। মোট উৎপাদিত প্লাস্টিকের অর্ধেক একবার ব্যবহার করার জন্য বানানো হয় এবং ব্যবহারের পর সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়। গবেষকদের অনুমান, ১৯৫০-এর গোড়ার দিক থেকে ৮.৩ বিলিয়ন টনেরও বেশি প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই ভাগাড় বা প্রাকৃতিক পরিবেশে মিশে গিয়েছে। নদীগুলি গভীর অভ্যন্তরীণ থেকে সমুদ্রের দিকে প্লাস্টিক বর্জ্য বয়ে নিয়ে যায়, যা সমুদ্র-দূষণের অন্যমত একটি কারণ। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, প্রতি বছরই প্রায় ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক মহাসাগরগুলিতে এসে মেশে।
সম্প্রতি, উত্তর ২৪ পরগনার রহড়ার রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ শতবর্ষ কলেজের (স্বায়ত্তশাসিত), উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তথা বাঙালি বিজ্ঞানী ড. স্বপন কুমার ঘোষের একটি অভিনব উদ্ভাবনের বিষয়টি লক্ষ্য করে দ্য গ্লোবাল ফ্রেটারনিটি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাডেমিক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ড. ঘোষ। তিনি মাশরুম থেকে সবধরনের ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করেছেন যা তাজা কোষগুলিতে অনাক্রম্যতা সরবরাহ করে এবং রোগ প্রতিরোধক কোষগুলির নিউক্লিয়াসকে ধ্বংস করে দেয়। রোগের ভ্যাক্টর নির্মূলের জন্য একটি শক্তিশালী ছত্রাকনাশক আবিষ্কার করেছেন তিনি এবং ব্রিটিশ সাপ্তাহিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচার-এ এই সংক্রান্ত একটি নিবন্ধও প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতে ব্যাপকভাবে জন্মানো একটি ব্রাজিলিয়ান ভেষজ থেকে আর্টারি ব্লকেজ পরিষ্কার করার জন্য একটি শক্তিশালী ওষুধও আবিষ্কার করেছেন তিনি। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল প্লাস্টিক বর্জ্যের বিপদের হাত থেকে স্থায়ী এবং সহজাত সমাধানের উপায় আবিষ্কার করেছেন এই বাঙালি বিজ্ঞানী। গেম-চেঞ্জার হল প্লাস্টিকের মাইক্রোবিয়াল অবক্ষয়, যা সিন্থেটিক পলিমারের অবক্ষয়ের সম্ভাব্য বিকল্প পদ্ধতি। ড. ঘোষ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে এমন একটি ব্যাকটেরিয়া তৈরি করেছেন যা কেবল প্লাস্টিকেই বিকশিত হয়। কীভাবে কাজ করে সেই ব্যাকটেরিয়া?
ভাগাড়ের দূষণ প্রতিরোধের জন্য, একবার ব্যবহার করা যায় এরকম প্লাস্টিকের বর্জ্যগুলি একটি চুল্লীতে ফেলে দেওয়া হয়, ব্যাকটিরিয়াগুলি রাসায়নিকের মাধ্যমে পুরো প্লাস্টিকের ভর নষ্ট করে দেয়, ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে যা সম্পূর্ণভাবে জলে পরিণত হয় এবং সব শেষে সেই জল বের করে দেওয়া হয়। এভাবে জমিতে কোনও বিষক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না আর। এই একই ব্যাকটেরিয়া তরল এবং গুঁড়ো হিসাবে পাওয়া যেতে পারে। পৌরসভার ভ্যাট রিঅ্যাক্টরগুলির পাশাপাশি যা সাধারণ মানুষদেরও কাজে লাগতে পারে। ব্যাকটেরিয়াটি ময়লার স্তুপের উপরে ছিটানো যেতে পারে যা বর্ষার সময় প্লাস্টিক নষ্ট করে দিতে পারবে কারণ জীবানু শুধুমাত্র প্লাস্টিকগুলিতেই বৃদ্ধি পায়।
ড. ঘোষ ২০১২ সাল থেকে এই বিষয়ে কাজ করে চলেছেন এবং প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার জন্য অনুদান চেয়ে সরকারের কাছে প্রকল্পটি জমাও দেন তিনি। বড়ো পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে এই প্রকল্পটি সফল করতে প্রয়োজন প্রায় দশ কোটি টাকা। তবে সরকার তার আবেদনে এখনও সাড়া দেয়নি। এদিকে, কার্বিয়াস, একটি ধনী ফরাসি সংস্থা যা প্লাস্টিক এবং টেক্সটাইল পলিমারগুলিতে প্রয়োগ করা এনজাইমেটিক বায়োপ্রোসেসগুলি আবিষ্কার এবং বিকাশ নিয়ে কাজ করে, তারা এই প্রকল্পটির পেটেন্ট কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে ড. ঘোষ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তিনি দেশবাসীকে তাঁর মূল্যবান উদ্ভাবন উপহার দিতে চান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই আবিষ্কারটি এখনও পর্যন্ত বিশ্বে প্রথম এবং পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করবে।
