হৃষিকেশ মুখার্জীর ‘মুসাফির’-এ ঋত্বিক ঘটকের বাজিমাত

নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার, কিশোর কুমার, সুচিত্রা সেন

লক্ষ লক্ষ ইঁটকাঠের ঘরবাড়ি। তার ভিতর অগণিত মানুষের ঠাসাঠাসি বসবাস। তাদের সুখ দুঃখ, হাসি-কান্নার নির্বাক দর্শক এই মৌন ঘর। যেন মুসাফিরের জীবন — পথ চলতি মানুষ আসে, জিরোয়, অতঃপর চলে যায়। এখানে কারো জন্ম হয়, কারো বিবাহ, কারো মৃত্যু; — বলরাজ সাহানির কণ্ঠে এস্টাবলিশিং শট থেকে ক্যামেরা শিফট করছে একটি অপরিচ্ছন্ন ঘরের দিকে। এরপর শুরু হয় মুসাফিরের জীবনচিত্র —

 বোম্বেতে থাকাকালীন ঋত্বিক ঘটক যে দুটি ছবির চিত্রনাট্য লেখেন, তার একটি বিমল রায় পরিচালিত ‘মধুমতী’ এবং অন্যটি হৃষিকেশ মুখার্জীর ডিরেক্টোরিয়াল ডেবিউ ‘মুসাফির’। ১৯৫৭-তে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির অভিনয় ভূমিকায় ছিলেন তৎকালীন চলচ্চিত্র জগতের একঝাঁক তারকা —  দিলীপ কুমার, কিশোর কুমার, ঊষা কিরণ, নিরুপা রায়, কেষ্ট মুখার্জি এবং সুচিত্রা সেন। সংগীত পরিচালনায় সলিল চৌধুরী-সহ আরও অনেকে। ছবিটির কাহিনি মূলত সমসাময়িক পরিকাঠামোয় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ঘরকে কেন্দ্র করে। ঘরটি যেন নির্বাক থেকেও ভাড়াটিয়াদের বিচিত্র সব আশা আকাঙ্ক্ষা যন্ত্রণার বর্ণনা দেয় এই ছবি মাধ্যমে। বিবরণ দেয় জীবনচক্রের তিন অধ্যায়ের — বিবাহ-জন্ম-মৃত্যু। এক ভাড়াটে চলে যায় অন্য ভাড়াটে আসে। টাইমট্রাভেলের স্থানিক একটি বিন্দুর মতো ঘরটা রয়ে যায়। অন্ধকার গুহার নিষাদে, নদীর শুকনো জমিতে অথবা মাটির তলায় যেমন আমাদের সভ্যতার উপচীয়মান কথকতার জীবাশ্ম ধুলোর নিচে থেকে যায়। টু লেট বোর্ড সভ্যতার প্রতিটি অধ্যায়কে স্বাগত জানায়। খেই হারানো পাথরগুলোকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে বাঙ্ময় করে তোলে। ঋত্বিক এই অচর্চার দুর্নিরীক্ষ্য ভাষা পড়তে জানতেন। জানতেন, বেহাল সমাজব্যবস্থার কলুতে বাঁধা শহুরে কপোত-কপোতীরা ঠিক কতখানি অসহায় —

প্রথম পর্যায়, বিবাহ —

এক নববিবাহিত দম্পতি। শকুন্তলা বর্মা (সুচিত্রা সেন), অজয় শর্মা (শেখর)। বাড়ির অমতে বিবাহ করে বাবার ভয়ে এই ভাড়া বাড়িটিতে আশ্রয় নেয়। শকুন্তলা স্বপ্ন দেখে একদিন সে তার স্বামীর ঘরে স্ত্রীর যথাযথ সম্মান নিয়ে ফিরে যাবে। এই মনস্কামনায় একটি বীজ (sanctified seed) উঠানের এক কোণায় রোপন করে। বীজ ফেটে একদিন অঙ্কুর বেরিয়ে আসবে। পৃথিবীর আলো ছায়া দাবি করবে। বড়ো হবে। আকাশ ছেয়ে তার ডালিতে ডালিতে ফুটে থাকবে রঙিন ফুল। অন্যথায় সব বৃথা। শকুন্তলাও বৃথা। তাঁকে যেনতেন স্বামীগৃহে ফিরতেই হবে। এরপর কিছুদিনের অপেক্ষার মধ্যে অজয়ের অনুপস্থিতিতে তাঁর বাবা-মা (বিপিন গুপ্তা, দুর্গা খোটে) এসে ওঠেন সে বাড়িতে। বৌমার সংস্কারে তারা বিমোহিত, এমন ওয়েলব্রেড পুত্রবধূকে কিনা এতদিন দূরে সরিয়ে রেখেছে! সব রাগ অভিমান ভুলে সসম্মানে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বাড়ির মালিক নতুন ভাড়াটের জন্য টু লেট বোর্ড উল্টে দেয়। শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে বাজতে থাকে,

 

— এক আয়ে এক যায়ে মুসাফির/ দুনিয়া এক সরায়…  জীবন, শহর, সময় থেমে থাকে না।  অবিনশ্বর। বহমান। ধ্রুব।

দ্বিতীয় পর্যায়, জন্ম —

অবসরপ্রাপ্ত এক বৃদ্ধ (নাজির হুসেন) তাঁর সন্তানসম্ভবা বিধবা পুত্রবধূ (নিরুপা রায়) ও ভানু (কিশোর কুমার) এ বাড়িতে আশ্র‍য় নেয়। নিরাশা শোক যন্ত্রণার তারে তারে বাঁধা মানুষের জীবন। সকলেই চায় নিস্তার। মাধববাবু চায় জীবনঝঞ্ঝা থেকে শান্তি। তাঁর পুত্রবধূ চায় আত্মমুক্তি। ভানু চায় চাকরি। একটি চাকরি হয়তো জীবন মৃত্যুর যুযুধান সংগ্রাম থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে। অথবা সাময়িক অব্যাহতি। অথচ, নির্মম ভাগ্য এবং ভোগবাদের দুনিয়া ভানুকে নিরাশার শেষ সোপানে কপর্দকশূন্য আছাড় মারে। যেখান থেকে শূন্যে কেবল অন্ধকার কুয়াশা। ভানু ঝাঁপ দেয়। বিষের বোতল তুলে নেয়, অথচ সে বিষও নাকি নকল। এমতাবস্থায় বেঁচে ওঠার অভিশাপ এবং বেঁচে থাকার আশীর্বাদ দুই যেন ভাগ্যের পরিহাস। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসে। ভানু চাকরি পায়। অন্যদিকে তাঁর বৌদিরও সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। মাধববাবুর বুকের পাথর নেমে যায়। তারাও ফিরে যায় — এভাবেই ‘চক্রবৎ পরিবর্ত্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ’। সুখ-দুঃখের চাকায় জীবন বদলায়। পার্থিব ভৌত অবস্থান কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।

তৃতীয় পর্যায়, মৃত্যু ও পুণর্জন্ম —

তৃতীয় ভাড়াটিয়া হলেন একটি ক্র্যাবি ব্যারিস্টার (পল মহেন্দ্র), তাঁর বিধবা বোন উমা (ঊষা কিরন) এবং তার প্রতিবন্ধী শিশু রাজা (ডেইজি ইরানি)। আগের দুটি পর্বে একটি রহস্যময় বেহালা প্লেয়ারের কথা উঠে আসে। তাঁকেই পরিচয় করানো হয় এই পর্বে। নাম রাজা। যদিও দোকানের চাওয়ালা তাঁকে ডাকে পাগলাবাবু নামে। তাঁর চালচুলোহীন যাপন। আপনা মর্জিকা মালিক, ইচ্ছে হলে বাজায় নয়তো রাতদিন চোলাইয়ের সাগরে ডুবে থাকে, মৃত্যুর অপেক্ষায়। এই উমাকে একদিন রাজা ভালোবেসেছিল। কিন্তু নিজের মারণরোগের কথা শুনে সব ছেড়ে চলে যায়। উমার দাদা তাঁর বিবাহ দেন। অতঃপর অকালে স্বামী হারিয়ে সন্তানের পঙ্গু দুটি পায়ের চিকিৎসার জন্য তারা এ ঘরে আসে। এখানেই প্রকাশ হয় রাজা চরিত্রটি। উমা তাঁকে আজও ভোলেনি। সে চায় তাঁকে সারিয়ে তুলতে যত্ন করতে। রাজা মেনে নেয়। উমার ছেলে রাজার সঙ্গে গল্পে গানে দিন কাটতে থাকে। তাঁর শিশুমনকে আশা দেখায় একদিন নিশ্চয় সে হাঁটবে। উঠানের কোণার গাছটায় যেদিন লাল লাল ফুল ফুটবে সেদিন… এখানে ও’হেনরি-র ‘দ্য লাস্ট লিফ’-এর কথা মনে পড়ে যায়।

“It is the last one… I thought it would surely fall during the night.  I heard the wind.  It will fall today, and I shall die at the same time.  The night passed, but the leaf was still there. ”

সেদিন রাতভর ভায়োলিনের আওয়াজে উমার দাদা তীব্র উন্মাদের মতো ভায়োলিনটিকে ভেঙে ফেলে এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। রাজা ভাঙা বেহালা আর ছর হাতে দিলীপ কুমার, না,  একজন ক্লান্ত বিধ্বস্ত মুসাফির জীবনের সব লেনাদেনা চুকিয়ে ফিরে যাচ্ছেন মহাযাত্রার উদ্দেশ্যে। অন্ধকারে ঝড় তুফানের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে তার ছায়া। ছিঁড়ে পড়ছে অতিথি গৃহের সাইনবোর্ড।  ঝরে যাচ্ছে শেষ ফুলটাও।

এরকম ঝড়-ঝঞ্ঝাহত রাত পেরিয়ে সকাল হয়। উমার ছেলে রাজা ঘুম থেকে উঠে দেখে জানালার বাইরে লাল টকটকে আলোর আকাশটার পাশে অসংখ্য ফুল ফুটে আছে; সে হেঁটে এগিয়ে যেতে চায়। পা-জোড়া স্ব-ইচ্ছায় বাড়িয়ে দেয়। দৈবাৎ পা’দুটির প্যারামবুলেটিং ক্ষমতা ফিরে আসে। সে আনন্দে জানালার দিকে আঙুল তুলে মাকে ডাক দেয়। অথচ সে গাছ ঝড় জলে গতরাতেই মারা গেছে। একইসঙ্গে রাজাও। রাতের অন্ধকারে রাজা ফুল-সহ একটি ডাল হাতে সারারাত বসে থেকেছে জানালার নিচে। সেখানেই শুয়ে থাকতে থাকতে ভোররাতে মারা গেছে। ঠিক যেমন বেহরম্যান অবিরাম তুষারপাতের মধ্যে একটি পাতা এঁকে জনসিকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। রাজাও ওই বাচ্চা শিশুটিকে পঙ্গু জীবন থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল। শেষবারের মতো ক্যামেরা একবার মৃত গাছটির ক্লোজশট আরেকবার রাজার মৃত মুখটির ক্লোজশট নিয়ে মুভ করে বারান্দার উপর। ছোট্ট রাজা হেঁটে যাচ্ছে আলোময় আকাশটার দিকে। যেন আরেক নবজন্মের সূচনা হল একই সকালে।

(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল)

 

 

 

Developed by DXDasia