ব্যস্ত শহুরে জীবনের এক ঘেয়ে ক্লান্তি থেকে দূরে বহু দূরে হারিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য মানুষকে বিবাগী করে তোলে

মানুষ যে কয়েকটা কারণের জন্য ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ে; ‘নির্জন তার খোঁজ’ তার মধ্যে অন্যতম। ব্যস্ত শহুরে জীবনের এক ঘেয়ে ক্লান্তি থেকে দূরে বহু দূরে হারিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য মানুষকে বিবাগী করে তোলে। ঘরছাড়া করে।

কিভাবে পৌঁছোবেন
নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন বা বাগডোগড়া বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে রিশ্যপ যাওয়া যায়। তবে হোটেল থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করাই ভালো। এছাড়া লাভা, কালিম্পং বা লোলেগাঁও থেকেও যাওয়া যায় রিশ্যপ জিপগাড়ি ভাড়া করে।
নিউ-জলপাইগুড়ি -রিশ্যপ: ৫২কিমি
কালিম্পং -রিশ্যপ: ৩১কিমি
লাভা –রিশ্যপ:৬কিমি
লোলেগাঁও -রিশ্যপ: ৪৩কিমি
সতর্ক : প্রয়োজন মত ঠাণ্ডার জামার-কাপড় ব্যবস্থা রাখতে হবে। রুমহিটারের ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখতে হবে হোটেলের সাথে কথা বলে। প্রয়োজন মত ওষুধ সাথে রাখা দরকার। যাদের শ্বাসের সমস্যা আছে; তাদের আগে থেকে তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে যেতে হবে। রিশ্যপে কিছু পাওয়া যাবে না।

সেই রকম কয়েকটা নির্জন জায়গার মধ্যে রিশ্যপ আমার ভীষণ প্রিয়। পশ্চিমবঙ্গের নিউ-জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ছোট্ট পাহাড়ি জায়গা। সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতা ৮৫০০ ফিট। একে গ্রাম বললে ভুল হবে কারণ এখানে কোনও জনবসতি নেই। শুধু এক নৈস্বর্গ শান্তি বাস করে এখানে। ‘রি’ কথাটার মানে পর্বতচূড়া আর ‘শ্যপ’ মানে তিব্বতের পুরনো গাছ। রিশ্যপ খুব বেশি পর্যটকদের মধ্যে প্রিয় হয়ে ওঠেনি। ১৯৯৮ থেকে একে একটি পর্যটন কেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়। তাই খুব একটা পর্যটন আবাসও গড়ে ওঠেনি এখানে। মাত্র দু’টো হোটেল। চারিদিকে পাহাড়ঘেরা – তার মাঝে সবুজ উপত্যকা – এইটুকুই রিশ্যপ।

আমাদের হোটেলটার নাম– ‘নেওড়া ভ্যালি রিসর্ট’। সবুজ ত্রিভুজাকৃতি মাথার ছাদ। আর প্রতিটা ঘর ছোট-ছোট আলাদা আলাদা ‘কটেজ’। কলকাতা থেকে আমাদের বুক করা ছিল। সেই মত বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে হোটেলের গাড়ি এসে আমাদের তুলে নিল। হুড খোলা জিপগাড়ি। এই রাস্তায় জিপগাড়ি ছাড়া আর কোনও গাড়ি চলে না। ধুলোমাখা পথ ছেড়ে গাড়ি যখন ভিতরে ঢুকছে তখন ঘড়িতে দুপুর একটা। বাগডোগরা থেকে রিশ্যপ প্রায় ৩ ঘণ্টার পথ। রাস্তার দু’ধারে ঘন দেবদারু জঙ্গল। তা ছাড়িয়ে একটু এগিয়েই মিলিটারি ব্যারাকস। এর পরই শুরু হল – সবুজ চা-বাগান পথের দু’পাশে। বাঁদিকে দার্জিলিঙের রাস্তা ছেড়ে আমরা আরও সোজা উপরে উঠতে লাগলাম – উত্তরে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে আমরা কিছু খাবার কিনলাম। আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা বাড়তে লাগল। সময়টা ডিসেম্বর। আর তাই আরও ঠাণ্ডা। সাথে কনকনে উত্তরে হাওয়া। আমাদের সঙ্গের চালকটি ভারী ভালো – অমায়িক। নাম চুঙচুঙ ভুটিয়া। ওর বাড়ি কালিম্পঙের লাভা শহরে। ও যাওয়ার পথেই দেখালো অনেকগুলো ঝর্ণা। সবুজ পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে এসেছে নীচে। দূর থেকে যখন রিশ্যপ দেখলাম তখন ঘড়িতে ৫টা। এখানে আস্তে আস্তে সবুজ শেষ হয়ে এসেছে। আলগা সাদা পাথরের রাস্তা। পাহাড় কেটে বানানো। কোনও পাকা রাস্তা নেই। প্রায় ৪ কিমি পথ এ রকম পাথরের উপর দিয়ে গাড়ি চলল দুলতে দুলতে।

হোটেলে যখন পৌঁছুলাম – তখন সূর্য ডুবে গেছে। একেই শীতকাল – বেলা ছোটো আর তার উপর পূর্বের পাহাড়। তাই খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে এলো পাহাড়ের কোলে। এখানে ইলিকট্রিকের ব্যবস্থা জোরালো নয়। ছোট্ট ছোট্ট টিমটিম করে জ্বলছে সাদা আলো ঘরের ভিতর। প্রতিটা কটেজ একে অপরের থেকে অনেকটা দূরে। মাঝে পাথুরে রাস্তা আর সবুজ ছোটো ছোটো গাছের ঝাড়। নানান বাহারী ফুল। প্রতিটা ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দা। সেখানে দু’টো বেতের চেয়ার। কাঠের ঘর। আসবাবপত্র কাঠের। একটা ছোট জানলা। ঘরের দরজাটা ছোটো। মাথা নীচু করে ঢুকতে হয় ভিতরে। ঘরের ভিতর ‘রুম হিটার’ ছাড়া থাকা যায় না। সোয়েটার-জ্যাকেট সমস্ত কিছু চাপিয়েও শীতে একেবারে কাবু হয়ে যাচ্ছিলাম।

পর দিন যখন ঘুম ভাঙ্গলো; তখন ভোর পাঁচটা। আমরা বেরোলাম টিফিন দাঁড়ার উদ্দেশ্যে। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে – ভেজা পাতার উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে যেতে হয় ১ কিমি। এখান থেকে সূর্যোদয় দেখা যায়। পরিষ্কার সাদা তুষারে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখের সামনে। সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে তার উপর – ঠিক যেন হীরের মত। সেখান থেকে নেমে আমরা আরও হেঁটে গেলাম নীচের দিকে। এখানে রাস্তাটা দু’টো ভাগ হয়ে গেছে – একটা গেছে লাভা হয়ে কালিম্পং মূল শহরে আর আরেকটা গেছে লোলেগাওয়ের উদ্দেশ্যে। সমস্ত বাজারের জন্য লাভা বা কালিম্পং-ই যেতে হয়। যাওয়া-আসার পথে একজন পর্যটকও চোখে পড়ল না। রিশ্যপের বৈশিষ্ট্য ওর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য টুকুই শুধু নীরবে উপভোগ করতে হয়। চোখের সামনে তুষার রাজ হিমালয় – চারিদিকে সবুজ বনানী – সাদা খোয়াই ভরা রাস্তা – রঙিন ফুলের ঝাড় – আর ফুলে ফুলে বাহারী প্রজাপতি – সব মিলিয়ে এ যেন এক স্বর্গ রাজ্য। আমরা গাড়ী করে গেলাম একটা ঝর্ণা দেখতে একটু দূরে। সেটা দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হল। রোদ পালিয়ে বিকেল নামল। চারিদিকে কুয়াশার চাদর নেমে আসছিল ধীরে ধীরে। পাহাড়ের চূড়োয় – গাছের মাথায়। বারান্দায় বসে চা-খেতে খেতে দেখছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা কিভাবে রঙ বদলাচ্ছিল। আসলে হিমালয়ের সৌন্দর্য বাকি পাহাড়ের মত নয়। খুব স্নিগ্ধ – সজীব। আর তাই হয়তো এই কারণেই হিমালায়ের টান অমোঘ। বারে বারে ফিরে আসতেই হয় ওর কাছে।

হোটেল থেকে ‘বনফায়ারের’ ব্যবস্থা করেছিল। আমরা গোল হয়ে ঘিরে বসেছিলাম আগুনকে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলল জংলী মুর্গিরোস্ট। কাঠের আগুন প্রায়ই নিবে আসছিল। মাঝে মাঝে কাঠ জ্বেলে দিতে হচ্ছিল। কখন দেখি একটা লোমশ পাহাড়ি কুকুর – লাসা প্রজাতির বোধ হয় – জুটে ছিল পাশে এই শীতের রাতে আমাদের বন্ধু হিসেবে। গুটি শুটি হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে ছিল আগুনের পাশে। রাত যখন ৯টা– আগুন তখন নিবু-নিবু। মাথার উপরে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ। আর অগণিত তারা। সেই তারায় ভরা আকাশের নীচে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। ঠাণ্ডা বাড়ছিল ক্রমশ। এর পর উঠে পড়লাম আমরা। কাল ভোরে চলে যাব কালিম্পং। কিন্তু এই একটা রাতের অসামান্য সুন্দর স্মৃতি মনে থাকবে বহুকাল।

‘ফিরব বললেই ফেরা যায় না-কি’ জানি না; কিন্তু ব্যস্ত শহুরে দূষণের মধ্যে হাঁপিয়ে পড়া প্রাণ যখনই একটু কারও অক্সিজেন খুঁজে ফিরবে; হয় তো এই ছোট্ট স্মৃতি ‘দু’দণ্ড’ শান্তি আনবে মনের ভিতর।

Developed by DXDasia