সব চরিত্র কাল্পনিক : কবি, কবিতার খাতা, দাম্পত্য, প্রেম ও পুনর্বার প্রেম

ফিরে দেখা: ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’

পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাবো,
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাবো জীবন 
এর চোখে ধাঁধা করবো, ওর জল করে দেবো কাদা,

পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাবো দু-কদম।

তুপর্ণ ঘোষের সব চরিত্র কাল্পনিক (Shob Charitro Kalponik/2009) দেখে সবার আগে জয় গোস্বামীর এই কবিতার কথাই মনে পড়লো। কবি ঠিক কেমন মানুষ? কবি কেন খামখেয়ালি? কবির কি অন্য কোনো প্রেমিকা আছে? কবি কি আদৌ তার বিবাহিত স্ত্রীকে ভালোবাসেন? কবি কি আদৌ প্রেম বোঝেন? কবি কি চুরি করে লেখেন? এই সমস্ত প্রশ্নে জর্জরিত করে নির্মাণ করেছিলেন ঋতুপর্ণ তাঁর ১৫তম ছবি ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’।

রাধিকার চরিত্রটির নির্মাণও ভীষণ ভাবে আধুনিক। প্রবাসী বাঙালি। খুব ভালো বাংলা বলতে পারে না, তাই রাধিকার অধিকাংশ সংলাপ ইংরেজিতে। কিন্তু ঋতুপর্ণ তার এই প্রবাসী বাঙালি নায়িকাকে নিয়ে কোন বাংলা দেখতে চেয়েছেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা সাধারণত কাব্যিক নয়। নির্দিষ্ট ন্যারেটিভের নিয়ম মেনেই তিনি ছবি নির্মাণ করেছেন এবং সেই ছবির নির্মাণে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা-ভাবনার ছোঁয়া প্রগাঢ় ভাবে লক্ষ্যণীয়। কিন্তু সব চরিত্র কাল্পনিক সেই সব হিসাবের বাইরে। ছবিতে আমরা মূলত দেখি এক কবি, নাম ইন্দ্রনীল (অভিনয়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) এবং তাঁর স্ত্রী রাধিকার (অভিনয়ে বিপাশা বসু) সংসার ও সম্পর্কের ক্ষয়ে যাবার গল্প। রবীন্দ্র সমকালীন ও পরবর্তী সময়ে কবিদের বাঙালিরা ক্রমেই ভুলতে ভুলতে গেছে। এবং পুঁজিবাদী বাজারে কবি ও কবিতা কেবলমাত্র একটা অতিরিক্ত মাত্র। কিন্তু তবু কবিরা দেখেন, ভাবেন ও লিখে যান কোনো নির্দিষ্ট ফলের প্রত্যাশা না করে। ছবিতে ইন্দ্রনীল চরিত্রের নির্মাণ দেখে বারবার মনে পড়ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথা। কবিরা কেমন হন! খানিক খামখেয়ালি, খানিক বেহিসাবি, খানিক আনমনা। তাই নব বিবাহিত স্ত্রীকে ট্যাক্সিতে বসিয়ে ইন্দ্রনীল একজন বর্ষীয়ান কবিকে তাঁর নতুন কবিতা পড়ে শোনান সারা রাত ধরে, ভুলে যান রাধিকা অপেক্ষা করছে ট্যক্সিতে। কিন্তু তার মানে কি কবি তাঁর স্ত্রীকে ভালোবাসেন না?

কবির প্রেম কেমন? আর পাঁচ জনের মতো নিশ্চয়ই নয়, কারণ কবিরা বোধহয় পার্থিব জগতে ঠিক বাঁচেন না। তাঁদের বিচরণ শব্দে ছন্দে বাঁধা কিছু ভুখণ্ডকে ঘিরে। সেখানেই তাঁদের সংসার, সেখানে এলিয়ে থাকে তাঁদের এলোমেলো প্রেমে মাখা বিছানার চাদর, সিঁদুর লেগে থাকা বালিশের কভারে, আবার তারই পাশ দিয়ে বয়ে চলে নদী, বাড়ির পরিচারিকার ফেলে আসা শৈশব ও তার বিচ্ছিন্ন শিকর ছেড়ে আসার ইতিহাস। কিন্তু ঋতুপর্ণ কবিকে দেখতে চেয়েছেন তাঁর স্ত্রী রাধিকার চোখ দিয়ে। রাধিকার চোখে ইন্দ্রনীল খানিক নির্মম, তাঁর কাছে স্বামীর প্রেম খুবই অবিন্যস্ত, প্রেম ঠিক কর্পোরেট নিয়মের ধার ধারে না। যেন কোন ছিরিছাঁদ নেই। তাই রাধিকা, ইন্দ্রনীলকে ঠিক বুঝতেও পারেন না। কবি যখন চাকরি ছেড়ে “ফুল টাইম” কবিতা লেখার সিদ্ধান্ত নেন, তখন রাধিকা শিশুর মতো কেঁদে ওঠেন, সংসারটা বুঝি ভেসে গেল!

রাধিকার কাম্য একজন দায়িত্ববান পুরুষ। সেই বাসনা পূর্ণ করেন পরিচালক ঋতুপর্ণ। শেখর হল রাধিকার সেই সাধের পুরুষ। কিন্তু এখানে ঋতুপর্ণ ব্যাসদেবের মতোই নিষ্ঠুর। মিলন হয় না শেখর আর রাধিকার।

রাধিকার চরিত্রটির নির্মাণও ভীষণ ভাবে আধুনিক। বাঙালিরা বোধ করি ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম, যারা তাদের প্রদেশ ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে অনায়াসে সংসার পেতেছে। সেই রকমই এক বাড়ির মেয়ে রাধিকা। প্রবাসী বাঙালি। খুব ভালো বাংলা বলতে পারে না, তাই রাধিকার অধিকাংশ সংলাপ ইংরেজিতে। কিন্তু ঋতুপর্ণ তার এই প্রবাসী বাঙালি নায়িকাকে নিয়ে কোন বাংলা দেখতে চেয়েছেন?

ছবির শুরুতে দেখতে পাই, এক ট্রেনের কামরার দৃশ্য। সাধারণত যেরকম গ্র্যান্ড ফ্রেম দিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা শুরু হয়, সেখান থেকে একেবারেই আলাদা। এক অন্যরকম ডিপার্চার বলে চলতে পারে। সামনে একটা প্লাস্টিকের জলের বোতল রাখা, জানলার নীল পরতের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে বাংলার ল্যান্ডস্কেপ। এই দৃশ্য চলেত চলতে আমরা দেহতে পাই, রাধিকার হাত এসে পরে জানলার কাচের ওপর। যেন সেই হাত বাংলাকে ছুঁতে চাইছে। বাংলা আসলে যেন এক কবিতার মতো এবং সেই বাংলার উর্বর জমিতেই জন্ম হয়েছে কত শত কবির। সেই রূপসী বাংলাকেই যেন ফিরে দেখার চেষ্টা করেছেন ঋতুপর্ণ, কিন্তু রাধিকার চোখ থেকে। এই নির্মাণে তবে ঋতুপর্ণ আর সত্যজিতের অনুরাগী ছাত্র থাকেন না। ছবি জুড়ে দেখতে পাওয়া যায় এক অন্য ঋতুপর্ণকে, যিনি ঋত্বিক ঘটকের অনুরাগী। এবং সেই কারণেই বোধকরি অনেক ক্ষেত্রে সব চরিত্র কাল্পনিক ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্যান্য ছবির থেকে অনেকাংশেই আলাদা।

ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে নারী চরিত্রকে মিলিয়ে দেওয়টা ঋত্বিক ঘটকের খুব পছন্দের একটা প্রয়োগ। সেই প্রয়োগ অনেক দিন পরে আবার নিয়ে এসেছিলেন ঋতুপর্ণ তাঁর নিজের মতো করে। দেবীর নির্মাণ কেমন করে করবেন? ছবিতে এক জায়গায় দেখা যায়, রাধিকা খবর পেয়েছে যে হঠাৎই তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু বন্ধু ও কবিতায় মত্ত ইন্দ্রনীল খবর পেয়েও ভুলে যায় সেই খবর দেবার কথা। এখানে প্রথমবার বাংলা ছবিতে নারীর রোষ ব্যক্ত করার জন্য ঋতুপর্ণ করলেন এক অসামান্য প্রয়োগ। মহালয়ার সকালে রাধিকাকে বেরোতে হবে তার মায়ের উদ্দেশে, তাই আবহে বাজছে মহিষাসুরমর্দিনী। তাল মিলিয়ে রাধিকার সাজসজ্জা চলতে থাকে। কিন্তু রাধিকা এখন দুর্গা এবং তার অসুর হল তার খামখেয়ালি কবি ইন্দ্রনীল। মহিষাসুরমর্দিনীতে যখন আবহে দেবী অসুর বধের জন্য তৈরি হচ্ছেন, সেই সময় রাধিকা রাগে ফেটে পড়ে ইন্দ্রনীলের খামখেয়ালিপনার জন্য। কিন্তু সে তখন জানতো না যে শেষবারের মতো তার কবি স্বামীকে দেখছে। আর কোনোদিন তাদের দেখা হবে না। ঠিক কবিতার মতোই কথা কিন্তু এত সহজে ফুরিয়ে যাবে না।

কাজরী কি আসলে রাধিকারই এক প্রতিরূপ নাকি কবির পুরনো কোনো প্রেম? ঋতুপর্ণ ঠিক এখানেই করেন এক অসামান্য প্রয়োগ করেন। কাজরীকে তিনি জীবিত করে তোলেন।

খামখেয়ালি স্বামী বাড়ি ফেরে না, জ্বর হলে ডাক্তারকে ফোন করতে গিয়ে সে বন্ধুকে ফোন করে গল্প করতে শুরু করে, নোট বুকে লেখা কবিতা জঙ্গলে ফেলে এলে রাধিকাকে নিয়ে সে কবিতা খুঁজতে যায়। এই স্বামী ঠিক রাধিকার কাম্য নয়। রাধিকার কাম্য একজন দায়িত্ববান পুরুষ। সেই বাসনা পূর্ণ করেন পরিচালক ঋতুপর্ণ। শেখর (অভিনয়ে যিশু সেনগুপ্ত) হল রাধিকার সেই সাধের পুরুষ। কিন্তু এখানে ঋতুপর্ণ ব্যাসদেবের মতোই নিষ্ঠুর। মিলন হয় না শেখর আর রাধিকার। ইন্দ্রনীল চলে গিয়ে আরও বেশি আপন করে রেখে যায় রাধিকাকে। বারংবার সে দেখতে থাকে তার স্বামীর অবয়ব, কথা হতে থাকে সেই না বলা কথাগুলো নিয়ে, অপ্রকাশিত প্রেমগুলো নিয়ে। কিন্তু তাতে দিনে দিনে অভিমান বাড়তে থাকে রাধিকার। সেই অভিমান কার প্রতি, স্বামীর প্রতি না নিজের প্রতি?

যে বাংলার নির্মাণ আমরা দেখতে পাই, সেটা কি শুধু রাধিকার চোখে দেখা বাংলা, না ইন্দ্রনীলের তৈরি করে দেওয়া চোখে রাধিকার বঙ্গদর্শন? সেই উত্তরটা খোঁজাই হয়তো দর্শকের কাজ। একজন নারীর জীবনে বাস্তুহারা হওয়া খুব সাধারণ একটা বিষয়। তার ভবিতব্যই যেন পিতৃগৃহ ছেড়ে স্বামীগৃহে গমন করা এবং ঋত্বিকের মতোই ঋতুপর্ণ সেই পুরনো সত্যকে ফিরিয়ে আনেন, ভারতীয় রমনীরা বাপের বাড়ি থেকে একবার চলে এলে তারা আর ফিরে যেতে পারে না এবং না ফিরতে পারার বেদনা উদ্রেক করে পরিচালক নিয়ে আসেন দেশভাগের কথা।

ছবির চলনে ঋতুপর্ণ কখনোই আমাদের জানান না যে তাঁর কল্পিত কবি ইন্দ্রনীল উদ্বাস্তু পরিবারের মানুষ কিনা। কিন্তু কবির কবিতা জুড়ে বারবার দেশভাগের কথা উঠে আসতে থাকে। নন্দর মা এখানে সেই দেশভাগের রূপক। দুই বাংলার সাঁকো।

এছাড়াও ইন্দ্রনীলের উঠে আসে আরেকটা বিষয়, তা নিয়ে আলোচনা না করলে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উঠে আসে কবির মিউজ কাজরীর (অভিনয়ে পাওলি দাম) কথা। যার ব্যাপারে রাধিকা বহুবার জিজ্ঞাসা করেছে নীলকে। কে সেই মহিলা? কাজরী কি আসলে রাধিকারই এক প্রতিরূপ নাকি কবির পুরনো কোনো প্রেম? ঋতুপর্ণ ঠিক এখানেই করেন এক অসামান্য প্রয়োগ করেন। কাজরীকে তিনি জীবিত করে তোলেন। পাওলি দামকে আমরা দেখতে পাই পর্দায়। বিপাশা ও পাওলি দুই নারীই একই রকম বলিষ্ঠ। তারা একে অপরের কাছে আসে, কাজরী যেন রাধিকার দুঃখ বুঝতে পারে। কাঁধে হাত বুলিয়ে দেয়। কাজরী হয়তো নীলের সবকটা কবিতার মানস রূপ যা ধীরে ধীরে রাধিকা কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে থাকে। কিংবা কাজরী হয়ে ওঠে রাধিকার সেই অজানা বাংলাদেশ এবং নীলের কবিতার কারুভূমি যেখানে রাধিকা আর কাজরী মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

_________ 
২০০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’। ওই একই বছর ৬২তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে অফিশিয়াল সিলেকশন হয় এই ছবির। প্রদর্শিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও। ২০০৯ সালে সেরা বাংলা চলচ্চিত্র হিসাবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’।

Developed by DXDasia