
হাতি-ঘোড়া-পালকিবাহক-সুন্দরী সব পোড়ামাটির পুতুলের গ্রাম
বোঙা হাতি আর বোঙা ঘোড়ার গ্রাম। বাঁকুড়া জেলার তালডাংরা থানার অন্তর্গত গ্রাম পাঁচমুড়া। বিষ্ণুপুর বেড়াতে গিয়ে পোড়ামাটির সামগ্রী দেখেছি ঢালাও। হার-দুল, হাতি-ঘোড়া, হাঁড়িপাতিল– উজ্জ্বল কষায় রঙ। কখনো বা কালো। কিন্তু সেগুলোর উৎস এই গ্রামটিকে দেখা হয়নি আগে। এবারে বন্ধুবান্ধব মিলে হাজিরা দিলাম গ্রামটির আঙিনায়। আগে থেকে পরিকল্পনা ছিল না। উঠল বাই তো পাঁচমুড়া যাই– বলে বেরিয়ে পড়া।
বিষ্ণুপুর টাউন থেকে ২০-২২ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। গাড়িতে ঘন্টাখানেকের রাস্তা। সে রাস্তায় পেরোতে হবে ঘন নিবিড় শালবন, সোনাঝুরি গাছের সারি। এদিক-ওদিক সতর্কতা, হাতির পাল আসতে পারে। মাঝেমাঝেই পথ আটকাবে মহিষের দল। আর বুড়ো জিরজিরে শরীরের সাঁওতাল ছড়ি বাগিয়ে তাড়াতে থাকবে তাদের। এছাড়া, বাকি সব নিঝুম, শান্ত। পাঁচমুড়া নামের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি বলতে ছিল, রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’। তবে সে তো গ্রাম নয়। পাহাড়। আর তার পাশেই শ্যামলী নদী। এখানে তেমন কোনো নদীও নেই। কিন্তু তাতে কী? পাঁচমুড়া নিয়ে ততক্ষণে তুঙ্গে ছুটেছে কল্পনা। যেতে-যেতে কেবলি মনে হচ্ছে, আশ্চর্য জেলা এই বাঁকুড়া। এর উত্তর, উত্তরপূর্ব দিক নিচু, উর্বর। আর পশ্চিমদিক ক্রমশ উঁচু হয়ে জন্ম দিয়েছে বিহারিনাথের। সুজলা সুফলা বাংলাদেশ হঠাৎ ‘ভৈরবীবেশ’ নিয়েছে তার পশ্চিম উপান্তে। বাঁকুড়াই যেন সেই রূপ পরিবর্তনের সাক্ষী।
হঠাৎ হৈহৈ শব্দে চমকে উঠলাম। ডানদিকে একটা বিশাল মাঠে ফুটবল ম্যাচ। তা দেখতে উপচে পড়েছে রাজ্যের লোক। চা, চানাচুর বিক্রি হচ্ছে। সেখান থেকে বাঁদিকে সোজা গিয়েই পাঁচমুড়া গ্রামের কুম্ভকার-পাড়া। গাড়ি থেকে নামতেই এদিক-ওদিক বাড়িগুলি থেকে ডাক শুনলাম। “এদিকে এসো গো দিদিরা…”
পাঁচমুড়ায় পোড়ামাটির সামগ্রী কিনতে শহর থেকে লোকজন আসে। গ্রামের গহন থেকে শহরে পাড়ি দেয় পাঁচমুড়ার শিল্প। আমাদের দেখেও তারা তেমনি কিছু ভাবলেন। কিন্তু, আমরা যে শুধু দেখতেই এসেছি। &;আমাদের পকেটগুলো তো একেকটা মহাশূন্য।
বোঙা ঘোড়ার পাল
প্রথমে গেলাম, উমা কুম্ভকারের দাওয়ায়। রূপকথার গল্পে যেমন থাকত, রাজার বিপুল সম্পত্তির কথা। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। এখানে গেলে হঠাৎ তেমনি মনে হবে। উঠোনে সার দিয়ে দাঁড়ানো হাতি, ঘোড়া। তাদের গা থেকে ঠিকরে পড়ছে লাল আলো। কী অপূর্ব তার চেহারা। কেউ কেউ তো ঠিক এক মানুষ লম্বা। না জানি কত দিন-রাত এক করে তৈরি হওয়া। দেখে মনে হয়, ক্ষণিকের বিশ্রাম নিতে দাঁড়িয়েছে। একটু পরেই ফের দৌড় দেবে ঘোড়ার দল। আর হাতিও এগোবে শুঁড় দুলিয়ে। এই ঘোড়াগুলির শরীর খানিক ছোটো। কিন্তু বিপুল লম্বা চার-পা।
তৈরি হচ্ছে বোঙা হাতি
জানা গেল, মোট ৮০ঘর কুম্ভকার বর্তমানে রয়েছেন সেই গ্রামে। তবে, তারা সবাই যে আজও পোড়ামাটির মূর্তি তৈরি করেন, এমন নয়। বিষ্ণুপুরের এই ঘোড়াগুলি বা হাতিগুলির নাম ‘বোঙা ঘোড়া’ বা ‘বোঙা হাতি’। বাঁকুড়ায় পাঁচমুড়া ছাড়া, রাজাগ্রাম, হামিরপুর আর সোনামুখিতে তৈরি হয় পোড়ামাটির মূর্তি। তবে, পাঁচমুড়ার কারিগরদের কাছে সেইসব গ্রামের হাতিঘোড়াগুলি খুব একটা দর পায় না। এই গ্রামের বোঙা ঘোড়ার অঙ্গসৌষ্ঠব সত্যিই দেখার মতো।
মনসার চালা ও অন্যান্য পুতুল
আর দেখার মতো মনসার চালা। এখনকার থ্রি-ডি টেকনোলজি হার মানবে এই সুপ্রাচীন শিল্পটির কাছে। উমা কর্মকারের উঠোন পেরিয়ে গেলাম ৭০-বছরের বৃদ্ধ ধীরেন কর্মকারের বাড়ি। কানে শুনতে পান না। কিন্তু হাত আজও অচল নয়। দিব্বি বানিয়ে চলেছেন বোঙা হাতি ও ঘোড়া। কখনো চারমুখো ইয়াবড়ো হাতি। একচালার সপরিবার দুর্গা। ড্যাবাড্যাবা চোখের পেঁচা। এছাড়া সাপ, ব্যাঙ, বিড়াল, কুকুর। অপ্সরা গোছের মাটির মহিলা। নৃত্যের ভঙ্গিতে দাঁড়ানো সুন্দরী রমণী। পালকিবাহক সহ আস্ত পালকি। সে এক আজব দেশ, আজব জগৎ। নড়ে না, চড়ে না। কিন্তু ঘর আলো করে থাকা সেসব মূর্তিরা যেন সব বোঝে।
বিশুদ্ধ এঁটেল মাটিতে তৈরি হওয়া এসব মূর্তি। প্রায় তিন-চার ফুট মাটি খুঁড়লে তবে এই মাটির নাগাল মেলে। আর, সে মাটি চেনে একমাত্র কুম্ভকার। কেমন একটা ভয় হল। মাটি কই আর? সব মাটি বুজিয়ে আমরা তো কংক্রিট করতে লেগেছি। আর ক'বছর পরে, মিলবে তো বিশুদ্ধ এঁটেল মাটি?;
মগ্ন কাজে কারিগর
নভেম্বরের অন্তিম সপ্তাহে কলকাতায় ফ্যান ঘুরলেও, পাঁচমুড়ায় শীত। তাই সন্ধের শুরুতেই বেশ নিঝুম হয়ে আসতে লাগল চারপাশ। লাল রঙের রাস্তার ধারে সুমনের বাড়ি। সুমন পড়ে ক্লাস সেভেনে। তার দিদি শিল্পা পড়ে টেনে। ভাইবোন দুজনেরই শেখা হয়ে গেছে পোড়ামাটির কাজ। ওদের সাথেই আমরা গেলাম ভাটি দেখতে। শিল্পার মা, শালপাতায় ভরিয়ে বড়ো করে তুলছে আগুন। তারপর সেখানেই আস্তে আস্তে পুড়ে লাল হবে হাতি, ঘোড়ার দল। আগুন হতেই সময় নেবে প্রায় ৪-৫ ঘন্টা। তারপর শুরু হবে পোড়ানোর কাজ।পাশে রয়েছে মনসার থান। সেখানে রাশি রাশি হাতি ঘোড়া গড়াগড়ি খাচ্ছে। মনে পড়ল, রাঢ়দেশে রীতি তো এমনই। ধর্মঠাকুরের কাছে বা মনসার কাছে গ্রামের মানুষ হাতি, ঘোড়া মানত করে। মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলে, সেগুলো ঈশ্বরের চরণে যায়। মূলত এই ধর্মীয় আচারটির জন্যই পোড়ামাটির পশু নির্মিত হত আগে। আজ তা বিশ্ববাজারের সামগ্রী ঠিকই। তবে সেই পরম্পরাটি বন্ধ হয়নি। পাঁচমুড়া গ্রামে অবশ্য মূলত মনসার কাছেই প্রার্থনা জানায় মানুষ।
অন্ধকার হয়ে আসছিল। আমাদের ফিরতে হবে। শিল্পা আর সুমনকে টাটা করে আমরা গাড়িতে উঠলাম। ফিরছি। আবার সেই শালবনের অন্ধকার। আমাদের মুখে তখন একটিও শব্দ নেই। চোখ বুজে আছি। আর পোড়ামাটির উজ্জ্বল রঙে দুচোখ যেন ধাঁধিয়ে উঠছে।
