
গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত নেচার জার্নালে
মধুকবি লিখেছিলেন, ‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। বাংলা তার বুকজোড়া রত্নভাণ্ডার উজাড় করে দিচ্ছে সেই আদিকাল থেকে। গ্রামবাংলা আর মফস্সলের শিল্পীরা সেই ভাণ্ডারের ধারক-বাহক। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি কৃষ্টি নান্দনিকতার শিখর স্পর্শ করে। হাতের নিপুণতা আর প্রজন্মলালিত বোধ আর শিল্পবীক্ষায় ঘর সাজাবার জিনিস বা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসগুলি হয়ে ওঠে অনুপম শিল্প। বাংলার লোকশিল্প-এর কথা উঠলে মাদুরশিল্প-এর জন্য আলাদা জায়গা রাখতে হবেই। মেদিনীপুর জেলা মাদুরশিল্পের পীঠস্থান। পূর্ব মেদিনীপুরের সবং মাদুরশিল্প জগৎবিখ্যাত। এছাড়াও মাদুর তৈরি হয় কোচবিহার, বীরভূম, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার বেশ কিছু এলাকায়। বিশেষ একধরনের গাছ চাষ করে, তার থেকে ফাইবার বার করে তৈরি করতে হয় মাদুরকাঠি। বহুদিন ধরেই ঐ গাছটির চাষ এবং তা থেকে মাদুরকাঠি তৈরি করে আসছেন এলাকার মাদুরশিল্পী এবং চাষিরা। কিন্তু এবার তাঁদের হাতে বিকল্প বাড়লো। অন্য আরেক ধরনের গাছের সন্ধান পেলেন তাঁরা, যা দিয়ে তৈরি করা যাবে উন্নত মানের মাদুরকাঠি। সৌজন্যে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Vidyasagar University) বটানি ও ফরেস্ট্রি বিভাগ-এর একদল গবেষক এবং অধ্যাপক। তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন একই গোত্রের একটি ভিন্ন প্রজাতির গাছ, যা থেকে তৈরি করা যাবে উন্নত মানের ফাইবার। যা শুধু মাদুর তৈরিতে নয়, ব্যবহার করা যাবে অন্যান্য শিল্পেও। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালে (Nature Journal)। গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত আছে খড়গপুর আইআইটিও (IIT Kharagpur)। সহায়তা করেছেন লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের (Lady Brabourne College) একজন অধ্যাপিকাও।

গবেষণাপত্রের প্রথম প্রণেতা (First Author) অনুপ কুমার ভূঞ্যা (Anup Kumar Bhunia) বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “২০১৬ সাল থেকে আমি পিএইচডি শুরু করি। আমার বাড়ি সবং-এ। সেখানকার মাদুর খুবই বিখ্যাত। তাই আমার গাইড আমাকে বলেছিলেন, মাদুরের ফাইবার যেই গাছ থেকে তৈরি হয়, তার উপর কাজ করতে। আমরা সেই গাছ আর তার থেকে উৎপন্ন ফাইবারের গুণাগুণ বিশ্লেষণ করতে শুরু করি।” এই গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম সাইপেরাস প্যাঙ্গোরেই (Cyperus Pangorei)। অনুপ জানালেন, এই প্রজাতির গাছটি সবং আর আশেপাশের কিছু এলাকা ছাড়া প্রায় পাওয়াই যায় না। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এই গোত্রেরই অন্য প্রজাতির গাছের সন্ধান করা, যার থেকে সমমানের বা আরও উন্নতমানের ফাইবার তৈরি করা যায়। তাতে শিল্পীদের হাতেও বাড়বে বিকল্প, সেই গাছকে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে অন্যান্য অঞ্চলেও, আর ফাইবারগুলিকে ব্যবহার করা যাবে অন্যান্য শিল্পেও।

খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা পেয়ে যান একই গোত্রের অন্য একটি গাছ। বৈজ্ঞানিক নাম সাইপেরাস প্ল্যাটিসটায়লিস (Cyperus Platystylis)। অনুপদের গাইড, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটানি ও ফরেস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল (Professor Amal Kumar Mondal) বলেন, “নতুন পাওয়া গাছটি আগাছা ধরনের। সবং আর তার আশেপাশের এলাকাতেই পাওয়া যায়। জলা জায়গায় হয়ে থাকে। এতদিন সবাই এটিকে আগাছা বলেই চিনতো। সেই গাছ থেকেই যে এত উন্নত মানের ফাইবার পাওয়া যেতে পারে, তা সত্যিই অভিনব এবং চমকপ্রদ।” তাঁর কথায়, এই গাছটি জলা জায়গায় এমনিতেই জন্মায়। তাই এই গাছটিকে চাষ করারও দরকার পড়বে না। তবে কেঊ যদি চান, তিনি চাষও করতে পারেন।
নতুন আবিষ্কৃত ফাইবারটির পরবর্তী স্তরের বিশ্লেষণ করা হয়েছে খড়গপুর আইআইটির সেন্ট্রাল রিসোর্স ফেসিলিটিতে (Central Resource Facility, CRF)। অনুপ জানান, এই নতুন প্রজাতির গাছটিকে যে তাঁরা ঠিকভাবে চিনেছেন, তার শংসাপত্র দিয়েছে বটানিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (Botanical Survey of India, BSI)। প্রতেকেই এই সাফল্যে খুবই খুশি।
আইআইটি খড়গপুরের অধ্যাপক
এই দলের আরেকজন গবেষক হলেন ধীমান মণ্ডল (Dheeman Mondal)। তিনি ২০১৮ সালে এই গবেষক দলে যোগ দেন। ফাইবারের গুণাগুণ বিচারের জন্য প্রাপ্ত তথ্যগুলিকে বিশ্লেষণ করা ছিলো তাঁর কাজ। তাঁর কথায়, “এই গাছ থেকে নিঃসৃত ফাইবার শুধু মাদুরশিল্পে নয়, ব্যবহার করা যাবে অন্য শিল্পেও। গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করতে ফাইবার ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন কম্পোজিট ইন্ডাস্ট্রিতে (Composite Industry), যেখানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে একটা জিনিস তৈরি হয়, সেখানে বর্তমান সময়ে বেড়েছে প্রাকৃতিক ফাইবারের ব্যবহার। ফাইবার ব্যবহার করা হয় মাদুর ছাড়া অন্যান্য কুটিরশিল্পেও (Cottage Industry)। সেসব ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাবে এই ফাইবারকে।” তিনি আরও জানান যে, এই ফাইবারগুলি বিভিন্ন মাপকাঠিতে প্রচলিত ফাইবারটির থেকেও অনেকক্ষেত্রে এগিয়ে, কিছুক্ষেত্রে প্রচলিত ফাইবারটির সমগোত্রীয়।
অনুপ কুমার ভূঞ্যা
অনুপ ও ধীমান বলেন যে নতুন প্রাপ্ত গাছটির ফাইবার খুবই উচ্চমানের। এর তাপ সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেশি। ফাইবারগুলি দারুণ টেকসই। আর ফাইবারগুলির জলধারণ ক্ষমতাও ভালো। তাই এই ফাইবার অনায়াসে হয়ে উঠতে পারে একটি নতুন প্রাকৃতিক ফাইবার সম্পদ, যা মেটাতে পারবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রগুলিতে প্রাকৃতিক ফাইবারের চাহিদা।
সাইপেরাস প্ল্যাটিসটায়লিস
লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের জুওলজি বিভাগ-এর অধ্যাপিকা এবং বিভাগীয় প্রধান সংযুক্তা মণ্ডল পারুই (Sanjukta Mondal Parui) বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রেজিস্টার্ড গাইড। অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডলের পিএইচডির ছাত্রছাত্রীরা সংযুক্তা মণ্ডল পারুইয়ের গবেষণাগারে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষাও চালান। অধ্যাপিকা সংযুক্তা মণ্ডল পারুই সেসব ছাত্রছাত্রীদের গাইড করেন বিভিন্নভাবে। তিনি বলেন, “এই গবেষণার প্রথম দিকে ফাইবারটির প্রাথমিক গুণ এবং গঠন নির্ণয়ের কাজে আমি যুক্ত ছিলাম। আমার তত্ত্বাবধানে নতুন পাওয়া ফাইবারটির গঠনচরিত্র বিশ্লেষণের কাজটি হয়েছিল। যেমন, ফাইবারটিতে কতটা পরিমাণ এবং কোন রকমের কার্বোহাইড্রেট আছে, কত ধরনের প্রোটিন আছে ইত্যাদি।”

নতুন আবিষ্কৃত ফাইবারটির পরবর্তী স্তরের বিশ্লেষণ করা হয়েছে খড়গপুর আইআইটির সেন্ট্রাল রিসোর্স ফেসিলিটিতে (Central Resource Facility, CRF)। অনুপ জানান, এই নতুন প্রজাতির গাছটিকে যে তাঁরা ঠিকভাবে চিনেছেন, তার শংসাপত্র দিয়েছে বটানিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (Botanical Survey of India, BSI)। প্রতেকেই এই সাফল্যে খুবই খুশি। অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল বললেন, “এই ফাইবারগুলির গুণমান এতটাই উন্নত যে, এটার থেকে তৈরি জিনিস নষ্ট হবে না বহুদিন।” তিনি আরও যোগ করেন, “নেচার জার্নাল গবেষণাপত্র প্রকাশ করার জন্য অনুমোদন দেওয়ার পর তা প্রকাশ করার জন্য সাধারণত বেশ বড়ো অঙ্কের অর্থব্যয় করতে হয়। আমাদের অত আর্থিক সঙ্গতি নেই। সে কথা আমরা জার্নালের কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। আমাদের এই গবেষণাপত্রটি এতটাই অনন্য যে, নেচারের মতন বিখ্যাত জার্নালের কর্তৃপক্ষ আমাদের গবেষণাপত্রটি বিনামূল্যেই প্রকাশ করতে রাজি হয়ে যান। এটা একটা বিরল কৃতিত্ব। আর সব গবেষকেরই ইচ্ছা থাকে, জীবনে অন্তত একটি গবেষণাপত্র নেচার জার্নালে প্রকাশ করার। সেই ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে আমাদের সবার।” ধীমান মণ্ডল বলেন, “আমাদের সবার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।” আবহাওয়াজনিত বিশ্বসংকটে যখন বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন প্লাস্টিকের বদলে প্রাকৃতিক সম্পদের বিবেচনাপূর্ণ ব্যবহারের, তখন একটি নতুন প্রাকৃতিক ফাইবার আবিষ্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, এটা নজর কেড়েছে নেচার জার্নালের কর্তৃপক্ষের। এখন গবেষণাটির পেটেন্ট নেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন তাঁরা। আর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের গবেষণাকে।

অধ্যাপিকা সংযুক্তা মণ্ডল পারুই

অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল, ধীমান মণ্ডল এবং অনুপ কুমার ভূঞ্যা
