
ভেঙে পড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বিপ্লবীদের নিয়ে আর্কাইভ
‘মেঘের গায়ে জেলখানা’
পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ, মাথা-উঁচু বন, স্বচ্ছ বহমান নদী আর জমাট বাঁধা মেঘের সারি, এমনিতেই নেশা বুনে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। উপরন্তু পাশাপাশি যদি হাঁটতে থাকে ইতিহাস, তাহলে প্রকৃতি-সাম্প্রতিক-অতীত মিলেমিশে এক ঘোর বুনে দেবে নিশ্চিত। “বিশ্বাস হয় না? দেখে এসো বক্সায়”, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তো সেই কবেই লিখে গিয়েছেন এ কথা। তাঁর ধারালো গদ্য ‘আমার বাংলায়’ ধরা আছে স্বাধীন বাংলায় ভিন্ন মতের একদল মানুষকে কীভাবে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের সঙ্গে জঙ্গল–ঘেরা বক্সায় রাখা হয়েছিল। পরাধীন ভারতে এখানেই ইংরেজরা আটকে রেখেছিল ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী, সতীশ পাকড়াশী, প্রণব দাশগুপ্তের মতো বিপ্লবীদের। হাজার আবেদনেও টনক নড়েনি সরকারের। এমনকি কবি নিজেও ছিলেন বক্সা দুর্গে বিনা বিচারে আটক বন্দীদের একজন। তাই লেখায় বারবার তুলে ধরেছেন সেইসব স্মৃতিকে। ‘মেঘের গায়ে জেলখানা’, সার্থক সে নামকরণ।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বিজড়িত এই ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্টকে (Historic Buxa Fort) ঘিরেই এবার স্বপ্ন দেখছে পাহাড়ের মানুষজন৷ রাজ্য সরকারের উদ্যোগে সংস্কার করা হয়েছে ধ্বংসপ্রায় বক্সা ফোর্টের৷ ২০২০-র মার্চ থেকে ধ্বংসপ্রায় এই বক্সা ফোর্টের সংস্কারের কাজ শুরু করেছে রাজ্য সরকার ৷ প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহশালা অধিকার এবং তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের তত্ত্বাবধানে কাজ করছে পূর্ত দফতর ৷

রাজ্য বনবিভাগের কর্মকর্তাদের থেকে আরও জানা যায়, ২৬০০ বর্গফুটের বক্সা দুর্গকে বেষ্টন করে গড়ে উঠেছিল এই জাতীয় উদ্যান। ১৯৮৩ সালে এখানে বাঘ সংরক্ষণ করা শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে জঙ্গলের ৩১৪.৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। পাঁচ বছর পর আরও ৫৪.৪৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়। আরও এক বছর পর বক্সা অভয়ারণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় ১১৭.১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এরও বেশ কিছু বছর পরে, ১৯৯৭ সালে বক্সাকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।
ইতিহাসকে বিকৃত না করেই, আধুনিকতার ছোয়া রাখা হয়েছে দুর্গে। সারানো হয়েছে জেলখানার ছাদ, ভেঙে পড়া পাঁচিল। এছাড়াও স্বাধীনতার আগে ও পরে বন্দি বিপ্লবীদের নিয়ে তৈরি হয়েছে আর্কাইভ।

বিশেষ এই উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা খরচ পড়েছে, এমনটাই জানাচ্ছে রাজ্য সরকারের বনবিভাগ। আগামীতে খরচ আরও বাড়বে। কলকাতার ক্যালটেক সংস্থার পক্ষ থেকে আর্কিওলজিস্ট তমাল গোস্বামীর পরামর্শে প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। ইতিহাসকে বিকৃত না করেই, আধুনিকতার ছোয়া রাখা হয়েছে দুর্গে। সারানো হয়েছে জেলখানার ছাদ, ভেঙে পড়া পাঁচিল। এছাড়াও স্বাধীনতার আগে ও পরে বন্দি বিপ্লবীদের নিয়ে তৈরি হয়েছে আর্কাইভ। সরকারি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড ব্যবস্থা এবং রোপওয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে এখানে।
শিয়ালদা বা কলকাতা স্টেশন থেকে ট্রেনে আলিপুরদুয়ার। সেখান থেকে গাড়িতে সান্তালবাড়ি। বাকিটা হাঁটাপথ। বিমানে গেলে বাগডোগরা নেমেই গাড়ি নিতে হবে। খানিক এগোলেই মিলবে কাঙ্খিত হিমালয়। আলিপুরদুয়ার থেকে বক্সার দূরত্ব ওই ৩০ কিমি মতো। জয়ন্তীর দিকে কিছুদূর গেলে সান্তালবাড়ি। গাড়িতে মোটামুটি মিনিট চল্লিশের পথ। এখান থেকেই ওঠা শুরু বক্সাফোর্ট। পায়ে হাঁটা পাকদণ্ডি পথ, দু’পাশে নিঝুম অরণ্য। প্রাকৃতিক অ্যাম্পিথিয়েটার থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁর আওয়াজ, জলপ্রপাতের শব্দ অথবা আচমকা অন্যমনস্ক করে দেওয়া পাখির ডাক। পাখির স্বর্গরাজ্য এই গোটা অঞ্চল। চড়াই ভাঙার কষ্ট আছে ঠিকই তবে প্রাকৃতিক মায়া কখন যে সেসব নিমেষে ফিকে করে দেয় তা বোঝা মুশকিল! তারপর অবশেষে সামনে এসে দাঁড়াবে সেকেলে দুর্গটা। পাথরে তৈরি। ব্রিটিশদের হাতে আসার আগে ছিল ভুটান-রাজাদের তৈরি কাঠ ও বাঁশের দুর্গ। সিল্ক-রুটের কিছু অংশের ওপর নজরদারি চলত এখান থেকে। এই দুর্গ ঘিরে রয়েছে কোচ আর ভুটান রাজাদের বিস্তর সংঘাতের ইতিহাস। ক্রমে এই দুর্গই হয়ে ওঠে ব্রিটিশ আমলের অন্যতম দুর্গম জেলখানা। সময়ের স্রোতে তাও ভেঙে-চুরে যায় একসময়। যদিও এখন গেলে আর ভাঙাচোরা অবয়ব চোখে পড়বে না। সরকারি সহায়তায় চাকচিক্য লেগেছে তাতে।

প্রথম পর্যায়ে সংস্কারের পর সম্প্রতি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয় বক্সা ফোর্টের দরজা (Buxa Fort open for tourists)। আর তাতেই নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেয়েছেন বক্সার বাসিন্দারা৷ আসলে বক্সার মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড বলতে এই পর্যটন। বক্সাকে কেন্দ্র করে প্রচুর মানুষ সান্তালবাড়ি থেকে ট্রেকিং করে বক্সা পাহাড়ে আসেন। এতদিন সংস্কারের কারণে বক্সা ফোর্টে পর্যটকদের ঢোকা নিষেধ ছিল। ছাড়পত্র মিলতেই আবারও বক্সা পাহাড়ের অপরূপ শোভা এবং ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্ট দেখতে প্রচুর মানুষ এখানে আসবেন বলে আশা করছেন পাহাড়বাসী ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। আশাবাদী রাজ্য সরকারের বন বিভাগও।
সূত্র – রাজ্য বনবিভাগ।
