
তাঁকে নিয়ে খুব বেশি চর্চা হয়নি অথচ, তিনি ছিলেন জনগণের শিল্পীর মূর্ত রূপ
“জাগ্রত হল ঘুমন্ত শিল্পীর সত্তা। তাই সে রাজার কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করে ছুটে চলল মন্দির নির্মাণের জায়গায়। সঙ্গী হল দ্বাদশ শত সহকারী শিল্পী। ঘরের মায়া, বউ-এর ভালোবাসা, সন্তানের স্নেহ – কিছুই তাদের আটকে রাখতে পারলো না। সৃষ্টির ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে চলল শিল্পীকুল।” কোনারকের সূর্যমন্দির নিয়ে এমন পংক্তি কি কোনো ঐতিহাসিক বা দার্শনিক বা সাহিত্যিকের না কি কোনও দ্রষ্টার?
আমাদের কাছে তাঁর পরিচিতি চিত্রশিল্পী হিসেবে অথবা কোনো পরিচিতিই নেই …। ইনি শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়।ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার চাপিয়ে দেওয়া সনাতনী অ্যাকাডেমিক আঙ্গিক, ইউরোপীয় চিত্রকলা আত্মস্থ, মুখস্থ বা নকল, নব্য ভারতীয় ঘরানা, স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ আধুনিক ধারার পরবর্তী যে সময়, অর্থাৎ চল্লিশের দশকে ভারতীয় শিল্পীমহলে সামাজিক দায়বোধ একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা নিয়েছিল। সেই সময়েরই উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম দেবব্রত। চল্লিশের দশকে মার্কসবাদে উদ্বুদ্ধ যে-একঝাঁক শিল্পী উঠে এসেছিলেন, তিনি ছিলেন সবার ‘দেবুদা’। তাঁকে নিয়ে সে অর্থে খুব বেশি চর্চা হয়নি অথচ, তিনি ছিলেন জনগণের শিল্পীর মূর্ত রূপ। তাঁর হাতে ধরা থাকত আগুন তুলি।বিশিষ্ট ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী চিন্তামণি কর এক বার বলেছিলেন, ‘দেবু বড়ো বিপজ্জনক জীবন যাপন করে’। পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে, ঠিক কীসের পরিপ্রেক্ষিতে একথা বললেন তিনি?
আরও পড়ুন: রেবতীভূষণের ১০০ আর এক ব্যাগ ‘কার্টুন’
১৯৮৭-র আগস্টে কলকাতায় দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ছবির একটি প্রদর্শনী হয় ‘গ্রাফিক্স টেল দ্য ইন্ডিয়ান পেট্রিয়টিক টেল’ শিরোনামে। ১৯৯৮-৯৯-এর চুয়াড় বিদ্রোহ, ১৮১৯-এর সন্দ্বীপের বিদ্রোহ, ১৮২৫-২৭-এর ময়মনসিংহের প্রথম পাগলপন্থী বিদ্রোহ, ১৮২৭-এর পালকি-বেহারাদের ধর্মঘট ইত্যাদি গণজাগরণগুলি তাঁর ছবিতে খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৪৭-এর ভারতভাগ, তেভাগা আন্দোলন তাঁকে খুব নাড়িয়েছিল। ‘দর্শক’ নামে তাঁর নিজস্ব পত্রিকাটির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে শিল্পের ও জীবনবোধের সংযোগস্থাপনের চেষ্টা করতেন তিনি।
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের তুলিতে তেভাগা আন্দোলন
১৯১৮ থেকে ১৯৯১ এর দীর্ঘ জীবন ছুটে বেড়ানোর। কখনও শখ, কখনো পলায়ন। বাদুড় বাগান থেকে কাশী, সেখান থেকে বেলেঘাটা, সেখান থেকে মেদিনীপুরের পৈতৃক ভিটে, পুনরায় কলকাতা। বেলেঘাটায় স্বদেশি ডাকাতি, মেদিনীপুরে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া, রবীন্দ্রনাথকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে হাওয়া খাওয়ানো, পুলিশের তাড়া খেয়ে শহরের আনাচে কানাচে ছবি এঁকে বেড়ানো, সাত আট বছর বিচিত্র সব চাকরি। আর্ট কলেজে পড়া বন্ধ। বন্ধ হল না ছবি আঁকা। সব কিছু ছেড়ে পুরো সময়ের শিল্পী হওয়া, রাজনৈতিক সংস্রব। কিন্তু সে রাজনীতি গুছিয়ে নেওয়ার জন্য নয়। ছেচল্লিশের দাঙ্গা থামাতে বেলেঘাটার খাল পার হয়ে চলে গিয়েছিলেন যে তরুণ তিনিই তিপান্ন বছর বয়েসে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময় পৌঁছে গেলেন বোমা এবং রঙ তুলি নিয়ে। আর্মিতে চাকরি করার সুবাদে জানা ছিল বোমা – মাইন-এর ব্যবহার, আর মাথায় ছিল বিপ্লবী টম পেইনের জীবনী।
‘বাঘ ও অজন্তা’ বইয়ের একটি অলংকরণ
এমনই অনন্ত – আকর্ষক জীবন কাহিনি শোনা যায় কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের বই ‘আগুন তুলি’-তে। জীবন কাহিনি শুধু নয়, এই বই এর প্রতিটি পৃষ্ঠায় আছে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ছবি। সে ছবিগুলির বেশিরভাগই বিস্মৃত, অনেকগুলিই অপ্রকাশিত। দেবব্রত ভারতীয় শিল্পের তন্নিষ্ঠ দর্শক হিসেবে এঁকেছেন ভারতীয় নৃত্যশৈলীর ছবি, বাঘ – অজন্তা – গুহাচিত্রের প্রতিলিপি, বেনারসের ঘাট থেকে কলকাতার কফি হাউসের জ্যান্ত ছবি। আমরা জানতে পারি দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের লেখা পাঁচটি বইয়ের কথা। যার মধ্যে অন্যতম ‘বাঘ ও অজন্তা’, ‘দুই নায়ক’, ধারা থেকে মাণ্ডু’; যেখানে তিনি শুনিয়েছেন শিল্পের গল্প, ব্যক্তি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, কখনো বা লোককথা – ইতিহাসের কাহিনি। সত্যজিৎ রায় ছাড়া পোর্টেট আঁকিয়েদের মধ্যে এমন দ্রুতি এবং রেখা প্রাধাণ্য যে বিরল তার প্রমাণ সহজেই মিলবে ডজন খানেক মুখাবয়বে।
চণ্ডী লাহিড়ীর তুলিতে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
তথ্যনিষ্ঠ এ গ্রন্থে মূলত সংকলকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন লেখক। ভুলে যাওয়া প্রতিভার বিশ্লেষণের চেয়ে জোর দিয়েছেন তাঁর কথা, তাঁর কাজ তুলে ধরায়। মনে করিয়ে দিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের কথা। শতাধিক ছবির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। আমরা জানি, ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, মার্কসবাদ বা কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন -এগুলির গভীর প্রভাব পড়েছিল শিল্পীদের কাজে। জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ বা সোমনাথ হোরের ছবিতে এগুলো যতটা স্পষ্টভাবে ধরা আছে ততটা হয়তো সেসময়ে অনেকের কাজেই ছিল না। চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোরের মতো দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও শিল্পকর্মে মার্কসবাদের প্রভাব থাকলেও, তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ সদস্য ছিলেন না। তবে, নিজের তুলিটি তৈরি করেছিলেন আগুন দিয়ে। দাহিকাশক্তির জ্বলন আর আলোকিত করার উপাদানে সে তুলি অমূল্য।
তথ্যসূত্রঃ বঙ্গদর্শন আর্কাইভ, নান্দীমৃণাল ওয়ার্ডপ্রেস, আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিসূত্রঃ
http://www.indowindow.com/delhimagazine/sanam/shore/intro.htm
www.abebooks.com/Debabrata-Mukhopadhyay-Selection-Graphics-Santra-Achinta
