রেবতীভূষণের ১০০ আর এক ব্যাগ ‘কার্টুন’

বাংলায় এই প্রথম আয়োজিত হল ‘কার্টুন মেলা’

“বইমেলা, খাদ্যমেলা, হস্তশিল্প মেলা সবাই শুনেছেন…কার্টুনমেলা কখনো শুনেছেন?” – ‘কার্টুনমেলা’ ঘুরে দেখার পর ঠিক এই কথাটিই বলেন শিল্পী সুমন চৌধুরী।  আজ্ঞে হ্যাঁ, বাংলায় এই প্রথম আয়োজিত হল ‘কার্টুন মেলা’। এবছরই বিশিষ্ট কার্টুনিস্ট রেবতীভূষণ ঘোষের শতবর্ষ। শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানিয়েই এই মেলার আয়োজন করেছে কার্টুন দল। যাঁরা শিল্প ভালোবাসেন, ভালোবাসেন কার্টুন, তাঁদের কথায় শহরে এরকম মেলা বিরল।

যেহেতু এই মেলার কেন্দ্রে রয়েছেন রেবতীভূষণ এবং অধুনা তিনি তথাকথিত ‘পপুরালিটি’ থেকে দূরে সরে গিয়েছেন, শুরুতেই তাঁকে নিয়ে দু-চার কথা বলি। রেবতীভূষণ ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র। ‘দেশ’, ‘আনন্দবাজার’, ‘সচিত্র ভারত’ এবং সেই সময়ের নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর ব্যঙ্গচিত্র জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কার্টুনিস্ট তো বটেই ছড়াকার হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। নিজের বিয়ের সময় ‘সাতপাকের পাঁচালী’ নামে একটি বই তিনি প্রকাশ করেছিলেন, যে বইতে শিল্পীকে সরস পরামর্শ দিয়ে অথবা শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছিলেন রাজশেখর বসু, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, সাগরময় ঘোষ, নরেন্দ্র দেব, আশাপূর্ণা দেবী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মনোজ বসু, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী প্রমুখ। তার কয়েকটি নমুনাঃ

‘‘কার্টুন এঁকে সবাইকে তো ব্যঙ্গ করেছেন। ভুলেও যেন গৃহিণীর কার্টুন আঁকতে যাবেন না। গৃহ বিবাদ অনিবার্য। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘মার্জার নিধন কাব্য’র কার্টুন আপনিই এঁকেছিলেন দেশ পত্রিকায়। সে কবিতায় হিতোপদেশটি মনে আছে তো? ‘সাদির পয়লা রাতে মারিবে বিড়াল?’’’ (সাগরময় ঘোষ)

‘‘ছড়ার হুল আর ট্যারা চোখের দৃষ্টিটা ঘরের ভিতর টেনে নিয়ে যেয়ো না।’’(পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়)

‘‘এতদিন তো বাটিতে রং গুললে নানা রকম/ চালিয়ে গেলে তুলি।/ এখন থেকে মনের-ই রং এমন হবে জবর/ আঁকতে না যাও ভুলি।/ যাই কেন না আঁকো তবু/ এইটুকু ঠিক জানি/ আলতো তুলির টানেও পাবো/ গভীর বুকের বাণী।’’(প্রেমেন্দ্র মিত্র)

‘‘একটি চাকায় চলছিলো রথ/ ক্লান্ত তালে মন্থরে।/ জুড়লো এসে আর এক চাকা/ বেদের বাঁধন মন্তরে।/ সবেগে রথ চলবে এবার/ উৎসাহে আর উল্লাসে।/ জয়ধ্বনি দিচ্ছি মোরা,/ আছি যারা আশপাশে।/ তার সাথে থাক আশীর্বাণী/ পথ যেন হয় অবন্ধুর।/ যুক্ত জীবন-যন্ত্রে বাজুক/ সুষমাময় স্নিগ্ধ সুর।’’(আশাপূর্ণা দেবী)

‘‘তুলি কালি রঙ দিয়ে/ হাসি আর খুশিতে/ ছোট বড়ো সকলেরে/ পারো তুমি তুষিতে।/সুধাঝরা এই রাত/ মধুভারে টলমল/ জীবনেরে করো ছবি/ রঙে রসে ঝলমল।’’(নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়)এবার বলবো কার্টুন দল ও কার্টুন মেলার কথা। আগামী বছর বাংলা কার্টুনের দেড়শো বছর। অনেকেই মনে করেন কার্টুন হল ছোটোদের বিষয় – মনোরঞ্জনকারী হাসিঠাট্টা। অথচ ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘নন্টে ফন্টে’, ‘টিনটিন’, ‘টম অ্যান্ড জেরি’, ‘সিনচ্যান’, ‘ডোরেমন’, ‘মার্ভেল’, ‘ডি সি’ আমরা যদি সর্বাধিক জনপ্রিয় কার্টুন গুলোর দিকে তাকাই, দেখবো কার্টুনে অন্তর্নিহিত থাকে সমাজ ও রাজনীতি। এ এমন এক সিরিয়াসনেস যে নির্ভেজাল হেসে ফেলা যায়। স্যাটায়ার।

চারুকলা পর্ষদের প্রতি বছরের চারুকলা মেলায় ছবির, ছবি-আঁকিয়েদের স্টল থাকে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেলায় কার্টুনের স্টল চেয়ে দরখাস্ত দেওয়া হয়। যাঁরা দরখাস্ত জমা দেন তাঁরা দলের নাম দেন ‘কার্টুন দল’। এভাবেই জন্ম কার্টুন দল-এর। শুরুতে সদস্য ছিলেন অনুপ রায়, দেবাশীষ দেব, উপল সেনগুপ্ত, ঋতুপর্ণ বসু আর উদয় দেব। পরে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দেন চণ্ডী লাহিড়ী ও অমল চক্রবর্তী। মেলা শেষে দলের সদস্য সংখ্যা এবং প্রচার-প্রসার বাড়ে। নতুন সদস্য হন অমিতাভ চক্রবর্তী, স্বপন দেবনাথ, তাপস মন্ডল, অনির্বাণ পাল, চিরঞ্জিত সামন্ত, রৌদ্র মিত্র প্রমুখ।

অনেককিছুর সঙ্গে সঙ্গে কার্টুনচিত্রেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তুলনামূলকভাবে কার্টুন বেড়েছে কিন্তু কমেছে ‘স্পেস’ এবং ‘ডেপথ্‌’। তার অন্যতম বড়ো কারণ– সময়ের অভাব। কিছু দেখে তা নিয়ে ভাববার অবসর কমেছে, অভ্যেস পাল্টে গেছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘অতিরিক্ত’ লাভের আশায় ভালো কার্টুনের জায়গা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দিই, ফ্রান্সের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘শার্লি এবদো’ বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রে। এই পত্রিকার সদর দফতরে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছিল। শার্লি এবদোর কয়েকজন কর্মীকে অফিসে ঢুকে গুলিতে ঝাঁঝরা করেছিল জঙ্গিরা। সেই ঘটনা সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। সেই নৃশংস জঙ্গিহানার পরও শার্লি এবদোর সাহসে ভাঁটা পড়েনি। প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার ব্যাপারে বারবার সওয়াল করেছে এই পত্রিকা। আর বারবারই বিতর্কিত বিষয়ে কার্টুন এঁকে তাঁরা খবরের শিরোনামে থেকেছে। কার্টুনই হল সেই শক্তিশালী হাতিয়ার। এই ভাবনাকে সঙ্গে নিয়েই পথ চলছে কার্টুন দল। তাঁদের সেই রুটম্যাপে জায়গা করে নিয়েছে কার্টুন মেলা। কমিক বা ব্যঙ্গচিত্রের প্রচার-প্রসারে শহরে এরকম উদ্যোগ এই প্রথম। বিশেষ সেলফিরও ব্যবস্থা রয়েছে কার্টুন মেলায়। প্রতিদিনই বিশিষ্ট কার্টুনিস্টরা মেলায় উপস্থিত থাকছেন। ফোনের বদলে সামনে থাকবেন কার্টুন দলের শিল্পীরা, চুপচাপ কয়েক মিনিট বসে থাকলেই হাতে পেয়ে যাবেন নিজের ক্যারিকেচার অথবা কার্টুন ‘সেলফি’। সঙ্গে মিলবে তাঁদের সই। রয়েছে বিরল কার্টুন-সহ পোস্টার কেনার সুযোগও। 

লেক মার্কেট লাগোয়া সর্দার শঙ্কর রোডে একটি বই বিপণিতেই (রিড বেঙ্গলি বুক স্টোর) মেলার আয়োজন। কার্টুন দলের এই উদ্যোগে তাঁদের সহযোগী বন্ধু- দ্য বেঙ্গল স্টোর, ছোটা মোটা এবং রিড বেঙ্গলি বুকস। মেলা শুরু হয়েছে ৫ ডিসেম্বর, চলবে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। ‘কার্টুন ফর অল’, এই ভাবনাকে হাতিয়ার করেই এগিয়ে চলেছে বাংলার কার্টুন দল। যেখানে ঢুঁ মারতে পারবেন আট থেকে আশি। প্রথমেই বলা হয়েছে, 'কার্টুন ফর অল' নীতিতে বিশ্বাসী এই দল। সেই কারণে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের বিনিময়ে দেবাশিস দেব, অনুপ রায়, ঋতুপর্ণ বসু কিংবা উদয় দেবের আর্টওয়ার্ক পাওয়া যাবে এই মেলায়। মেলায় ঢুকলেই পাওয়া যাচ্ছে, কার্টুন দলের তরফে একটি বুকমার্ক, যেটির অন্য পিঠে রয়েছে ঋতুপর্ণ বসুর ডুডল। না, এর জন্য তিনি কোনও অর্থ নিচ্ছেন না, এটি উপহার। কার্টুনের জনপ্রিয়তা বর্তমানে কেমন, সোশাল মিডিয়ার হালফিলের ‘মিম’-এর সঙ্গে কার্টুনের পার্থক্যটা কোথায়? এক সাক্ষাৎকারে উদয় দেব বলছিলেন, “এই যে আমরা সবসময় বলি, কার্টুন, ক্যারিকেচার, মিম -এগুলোর কিন্তু একে অপেরর সঙ্গে মিল নেই। আমরা যে কার্টুন নিয়ে কাজ করি তা হল – পলিটিকাল কার্টুন। অনেক সময় বলা হয় কার্টুনের দুটো ভাগ, সামাজিক কার্টুন আর রাজনৈতিক কার্টুন। আসলে, কার্টুনের এরকম কোনও বিভাজন হয় না। কারণ, সমাজ থেকেই রাজানীতির জন্ম। সমাজ বাদ দিয়ে রাজনীতি হয় না। কার্টুন সবসময় সময়ের কথা বলে। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমসাময়িক কার্টুনের প্রেক্ষাপট যদি আমরা না জানি তাহলে তো সেইসময়ের ভৌগলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিল জানতেই পারবো না । একটা কার্টুন বুঝতে গেলে তার নেপথ্য কাহিনিটা বুঝতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে, নাহলে তা কেবলই ছবি হয়ে রয়ে যাবে। মিম আর কার্টুনের বেসিক পার্থক্যটা হল- কার্টুন দীর্ঘজীবি, ‘মিম’ নয়। আর এটা হয়তো শুনতে খারাপ লাগবে, কার্টুন সবার জন্য নয়, যারা পড়াশোনা করে, চোখ-কান খোলা রাখে, শিল্প ভালোবাসে, সংবেদনশীল তারাই বুঝতে পারবে ব্যঙ্গচিত্রের মহিমা।”

এই সময়ে দাঁড়িয়ে যাঁরা কার্টুন শিল্পী হতে চান, তাঁদের গাইড করার চেষ্টা করতে ইচ্ছুক কার্টুন দল। আজ যাঁরা কার্টুনিস্ট বা ইলাস্ট্রেটর হতে চান, তাঁরা শিল্পীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান না। কার্টুন মেলা সেই ব্যারিকেড ভাঙছে। মেলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বেশ কিছু কর্মশালার আয়োজনও করেছেন। প্রশিক্ষক হিসেবে থাকছেন রাজকমল আইচ, দেবাশিষ দেব, উদয় দেব এঁদের মতো গুণী কার্টুনিস্টরাই।

রেবতীভূষণ এবং কার্টুন দল সম্পর্কিত তথ্যঃ আনন্দবাজার, কার্টুনপত্তর, রিড বেঙ্গলি বুকস্‌-এর ফেসবুক পেজ

রেবতীভূষণের আঁকা কার্টুনঃ কার্টুনপত্তর

অন্যান্য ছবিঃ সুমন সাধু

 

Developed by DXDasia