বর্ষার তালে ‘তাল’ মেলাতে পাতে পড়ুক তালের বাহারি পদ

রইলো তালের বড়া, তালের মালপোয়া এবং তাল ক্ষীরের রেসিপি

সেসময়ে ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক বাতির চল ছিল না। দাওয়ায় বসে হ্যারিকেনের আলোয় তালপাতার পাখা টেনে  বাতাস করতেন মা-ঠাকুমারা। বাবুই পাখিরা অসাধারণ শিল্প শৈলী মেনে তালপাতার নিচেই গড়ে তুলতো নিশ্চিন্ত আশ্রয়। গ্রাম বাংলার প্রান্তরে সব গাছ ছাড়িয়ে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতো রবি ঠাকুরের সেই ‘তালগাছ’।  

“তারপর হাওয়া যেই নেমে যায়, পাতা কাঁপা থেমে যায়, ফেরে তার মনটি…”

বর্ষার মরশুমে পাকা তালের স্বাদে মন ফিরতে বাধ্য। কোনো তালের গায়ের রঙ মিশকালো, কোনোটা লালচে। পাকা কালো তালের ওপর বাঙালিদের লোভ সেই আদ্যিকাল থেকে। তাল বলতেই আমরা বুঝি জন্মাষ্টমীতে তালের বাহারি পদ। চৈতন্যদেবকে কত ব্যঞ্জন দিয়ে সেবা করছেন ভক্ত-গৃহিণী, সেখানেও রয়েছে তালের বড়া। গোপালের প্রিয় তালের নানা রকম রান্না করে সাজানো হয় বাঙালি বাড়িতে। তালের বড়া (Taler Bara), তালের ক্ষীর (Taler kshir), তালের মালপোয়া (Taler Malpoya) সহ কতো কি! শুধু গোপাল কেন? এ সব স্বাদে আট থেকে আশি সকলেরই জিভে জল এসে যায়। রইলো তালের তৈরি এই সব সুস্বাদু খাবারের রেসিপি (Recipie)।

 

তালের বড়া 

উপকরণ –

পাকা তাল – একটা

ময়দা – এক কাপ

সুজি অথবা চালের গুঁড়ো – হাফ কাপ

আধখানা নারকেল কোড়া

গুঁড়ো চিনি – ২৫০ গ্রাম চিনি

নুন – এক চিমটি

ভাজার জন্য – সাদা তেল

প্রণালী –

প্রথমেই পাকা তালের খোলা ছাড়িয়ে তার থেকে ভালো করে কাথ বের করে নিতে হবে। তালের মধ্যে যাতে জলের ভাব না থাকে তাই কড়াইয়ে হালকা হাতে নাড়াচাড়া করে নিতে হবে। এরপর একটি অন্য পাত্রে ময়দা, গুঁড়ো চিনি, সামান্য নুন, চালের গুঁড়ো ভালো করে মিশিয়ে, চালনি দিয়ে চেলে নিতে হবে। এতে শুকনো মিশ্রণে কোনো ডেলা থাকে না। এরপর তালের কাথ এবং নারকেল কোড়া ঐ মিশ্রণের সঙ্গে মিশিয়ে হাতের সাহায্যে মিশ্রণটি ভালো করে ফেটিয়ে মেখে নিতে হবে। ফেটানো যত ভালো হবে বড়ার স্বাদ তত ভালো হবে। অন্যদিকে কড়াইয়ে তেল গরম হয়ে গেলে বড়ার আকারে গড়ে তেলে ছাড়তে হবে। দেখবেন বড়া যেন খুব বেশি নরম না হয়। তাহলে তেলে ছাড়ার পর তা ভেঙে যেতে পারে। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আরও একটু ময়দা মিশিয়ে নিতে পারেন। এরপর ডুবো তেলে বড়াগুলি লাল লাল করে ভেজে তুলে নিলেই তৈরি শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় তালের বড়া।

 

তালের মালপোয়া 

উপকরণ –

পাকা তাল – একটা

ময়দা- এক কাপ

সুজি – এক কাপ

দুধ – দেড় কাপ

আধখানা নারকেল কোড়া

গুঁড়ো চিনি – ২৫০ গ্রাম চিনি

সামান্য নুন এবং মৌরি

ভাজার জন্য – সাদা তেল

চিনির সিরার জন্য লাগবে – হাফ কাপ চিনি, হাফ কাপ জল এবং দু-তিনটে ছোটো এলাচ

প্রণালী –

প্রথমে একই ভাবে তালের কাথ বের করে নিতে হবে। অন্যদিকে একটা পাত্রে ময়দা ছেঁকে ঢালতে হবে, তারপর সুজি, নুন, গুঁড়ো চিনি দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে অল্প অল্প করে দুধ যোগ করে ব্যাটারটা বানিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ব্যাটারটা ঢেকে রেখে দিতে হবে। ঘন্টা খানেক পর খানিকটা মজে এলে তাতে তালের কাথটি অল্প অল্প করে দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। মিশ্রণ তৈরি হয়ে গেলে সামান্য মৌরি মিশিয়ে নিতে ভুলবেন না। মালপোয়ার আসল স্বাদ কিন্তু ঐ মৌরিতেই।

অন্যদিকে কড়াইয়ে বেশ খানিকটা সাদা তেল ভালো করে গরম করে নিয়ে গোল ধরনের ছোটো হাতার সাহায্য অল্প করে ব্যাটার দিয়ে মালপোয়াগুলো তৈরি করতে হবে। দেখতেই পাবেন সুন্দর লুচির মতো দুপাশ ফুলে উঠছে, একটু উল্টে পাল্টে হালকা বাদামি করে ভেজে তুলে নিন। মিষ্টি বেশি বা রসালো মালপোয়া ভালো লাগলে চিনি, জল আর ছোটো এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে সিরা তৈরি করে উপর থেকে ছড়িয়ে দিন। ব্যাস, সুস্বাদু তালের মালপোয়া তৈরি। 

তাল ক্ষীর  

উপকরণ –

পাকা তাল – একটা

দুধ – ৫০০ গ্রাম

আধখানা নারকেল কোড়া

গুঁড়ো চিনি – ২৫০ গ্রাম চিনি

পরিমাণ মতো কাজুবাদাম এবং ছোট এলাচ।

প্রণালী –

প্রথমেই তাল ছাড়িয়ে কাথ বের করে কড়াইতে ভালো করে জাল দিতে হবে। যতক্ষণ না তালের কাঁচাভাব কাটবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নাড়তে হবে। তারপর তাতে গুঁড়ো চিনি, কোড়ানো নারকেল এবং এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে নিতে হবে। ভালো করে মেশানো হয়ে গেলে এতে দুধ এবং কাজুর টুকরো দিয়ে কম আঁচে বেশ কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। তবে, খেয়াল রাখবেন কড়াইয়ে যেন লেগে না যায়। এর জন্য একটি হাতার সাহায্যে ক্রমাগত নাড়তে থাকতে হবে। যখন দেখবেন, তালটা আর কড়াইয়ে লাগছে না, তখন বুঝবেন আপনার তাল ক্ষীর একেবারে তৈরি হয়ে গেছে। উপর থেকে নারকেল কোড়া এবং কাজু ছড়িয়ে পরিবেশন করুন সুস্বাদু তাল ক্ষীর।

Developed by DXDasia