এই গরমে ‘বনলতা সেন’-এর মতোই দু-দণ্ড শান্তি দিতে পারে ‘ঘোল’

‘ঘোল’ খাওয়া মানেই নাস্তানাবুদ নয়, বরং গরমের দিনে মন জুড়ানো প্রাণের তৃপ্তি

“দই চাই দই, ভালো দই”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকের সেই দইওলাকে বাঙালিরা সকলেই দিব্যি চেনেন। একটা সময় ছিল যখন একটু গরম পড়লেই গ্রাম-গঞ্জে সময়-অসময়ে এমন হাঁক ভেসে আসত কানে। মেঠো পথ ধরে কাঁধে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দইওয়ালাদের শশব্যস্ত চলনে অভ্যস্ত ছিল বাঙালিরা। কালের বিবর্তনে সেই দইওলারা হারিয়ে গেলেও বাঙালির খাদ্যাভাসে দই-এর চাহিদা হারিয়ে যায়নি কোনোদিনই। পুজোর উপাচার থেকে শুরু করে শেষপাতের মিষ্টিমুখ-সবেতেই জাঁকিয়ে বসে থাকে ‘দই’। তবে আজকের আলোচনা ঠিক দই নিয়ে নয়, বরং বলা ভালো দইয়ের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিয়ে। 

দুধের স্বাদ ঘোলে না মিটলেও, দুধের সব পুষ্টিগুণ কিন্তু ঘোলে সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায়, তা–ও আবার বাড়তি মিল্কফ্যাট বা ননি বাদ দিয়ে।

দারুণ গরমে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত। তার ওপর এই করোনার বাজারেও রাস্তাঘাটে, ট্রেনে-বাসে লোকজনের ঠেসাঠেসি, গাদাগাদি ভিড়। রোদের তাপে মাথা দপদপানি, মাস্কের জ্বালায় শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা, ঠিক এরকম অবস্থায় হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ঢুকতেই যদি হাতে চলে আসে এক গ্লাস অমৃত, একটুও সময় অপচয় না করেই ঢক ঢক করে গলাধঃকরণ। আহা! স্বর্গসুখ যেন একেই বলে। না, এই অমৃতের স্বাদ সমুদ্রমন্থন করে উঠে আসেনি। এসেছে বাড়িতে পাতা টক দই আর নুন, চিনি দিয়ে বানানো শরবত থেকে। শরবতের পোশাকি নাম ‘ঘোল’। এই গরমে, ‘বনলতা সেন’-এর মতোই দু-দণ্ড শান্তি দিতে পারে ঘোল। তবে ঘোল যে শুধুই মনের শান্তি দেয় তা নয়, শরীরের বেশ কিছু অশান্তি দূর করতেও সিদ্ধহস্ত এই পানীয়।

দুধের স্বাদ ঘোলে না মিটলেও, দুধের সব পুষ্টিগুণ কিন্তু ঘোলে সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায়, তা–ও আবার বাড়তি মিল্কফ্যাট বা ননি বাদ দিয়ে। ঘোল বলি আর মাঠা বলি বা ইংরেজিতে বাটার মিল্ক; যুগ যুগ ধরেই এই উপকারী আর সুস্বাদু পানীয় সারা বিশ্বের মানুষই পান করে আসছে আগ্রহভরে। আর গ্রীষ্মের এই দাবদাহে যখন তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে, লেবু চিপে এক গ্লাস ঘোল পান করতে গিয়ে কারও আর দুধের স্বাদের জন্য আফসোস হবে না, এ কথা হলফ করে বলা যায়।

উপকরণ বলতে বিশেষ কিছুই আড়ম্বর নেই। ঘরে পাতা টক দই, পরিমাণ মতো নুন, চিনি আর খানিকটা ঠাণ্ডা জল। ব্যাস!

জলীয় উপাদান বেশি থাকায় ঘোল দইয়ের থেকে শরীরকে বেশি হাইড্রেট করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ঘোলের প্রচুর উপকারিতার কথা রয়েছে। প্রতিদিন একগ্লাস করে ঘোল খেলে শরীরের অনেক সমস্যা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হয় না। এছাড়াও বদহজম রুখতে, শরীরের ফ্যাট গলাতে, হাই ব্লাডপ্রেসারে, রোগা হতে, পেট ঠান্ডা করতে, ক্যালসিয়াম বাড়াতে, মশলাদার খাবার হজম করতে সাহায্য করে ঘোল। এমনকি ক্যন্সার রোগ প্রতিরোধেও বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে ‘ঘোল’। রান্নাতেও বিশেষ ভাবে ব্যবহার করা যায় ঘোল।

কীভাবে বানাবেন?

উপকরণ বলতে বিশেষ কিছুই আড়ম্বর নেই। ঘরে পাতা টক দই, পরিমাণ মতো নুন, চিনি আর খানিকটা ঠাণ্ডা জল (কেউ চাইলে বরফের কুঁচি ব্যবহার করতে পারেন)। ব্যাস!

একটি পাত্রে দইয়ের সঙ্গে স্বাদমতো নুন এবং চিনি দিয়ে খুব ভালো করে ফেটিয়ে নিতে হবে। দই ফেটিয়ে চিনি এবং নুন ভালো করে মিশে গেলে, এতে প্রয়োজন মতো জল মিশিয়ে নিতে হবে। তবে জলের পরিমাণের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে পানীয়টি খুব পাতলা কিংবা খুব ঘন হয়ে না যায়। এরপর একটি কাঁচের গ্লাসে ঢেলে ওপর থেকে চাট মশলা, লেবুর টুকরো অথবা পুদিনাপাতা দিয়ে ইচ্ছেমতো সাজিয়ে নিলেই তৈরি গরমের দিনের মন ভরানো পানীয় ‘ঘোল’। 

ঘোল অতি সুস্বাদু পানীয় হলেও বাংলা ভাষায় ‘ঘোল’ শব্দটি অকারণে নেতিবাচক দোষে দুষ্ট। সাহিত্যের ভাষায় “ঘোল খাওয়ানো” মানেই যেন নাস্তানাবুদ করা। যদিও আজকের প্রজন্ম খুব সচেতন, তাই ভুল করেও ঘোল খেতে তারা নারাজ। তাদের কাছে এই পানীয়ের নাম এখন লস্যি। বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে পথচলতি দোকানে ‘লস্যি’ নামেই বাঙালির চিরাচরিত অভ্যাসকে টিকিয়ে রেখেছে ‘ঘোল’-এর স্বাদ।

Developed by DXDasia