
বিষ্ণুপুরের প্রথম বিষ্ণু মন্দিরের গল্প
মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুর। টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকার্য আর ধ্রুপদী সংগীতের মাধুর্যে যেন স্বপ্ন দিয়ে বানানো এক জনপদ। সেখানে অলিতে গলিতে ইতিহাস কথা বলে। মল্ল রাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুরের পুরোনো স্থাপত্যগুলোতে কান পাতলেই শোনা যায় শতাব্দী পেরোনো সব জানা-অজানা মানুষের ফিসফাস সংলাপ। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ আমলের শুরু পর্যন্ত প্রায় হাজারখানেক বছর ধরে বিষ্ণুপুরের ইতিহাস ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গেছে মল্ল রাজবংশের উত্থান আর পতনের সঙ্গে। আদিমল্ল ছিলেন মল্ল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি লাউগ্রামের শাসক ছিলেন। তাঁর ছেলে জয়মল্ল রাজধানী সরিয়ে এনেছিলেন বিষ্ণুপুরে। কালুমল্ল, কাউমল্ল, ঝাউমল্লের মতো পরের শাসকরা অনেকেই রাজ্যবিস্তারে বেশ নাম করেছিলেন। এই অঞ্চল মোটামুটি ছিল অরণ্যে ঢাকা আর তুর্ক-আফগান সুলতানরাও বিষ্ণুপুরের দিকে কখনও নজর দেননি। তবে মুঘল২ সাম্রাজ্য এই অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। মাঝে মাঝে মুঘল প্রশাসকরা বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের থেকে রাজস্ব দাবি করতেন এবং বিষ্ণুপুরের রাজারা সেই রাজস্ব দিয়েও দিতেন।

মল্ল রাজা হাম্বীর মল্ল দেব বা বীর হাম্বীর ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের সমসাময়িক। ১৫৮৬ সালে তিনি সিংহাসনে বসেন। আফগান বনাম মুঘলদের যুদ্ধে তিনি আকবরের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি বাংলার মুঘল সুবাহদারের কাছে বার্ষিক রাজস্ব জমা দিতেন আর মুঘলের অধীনতাও মেনে নিয়েছিলেন। নরোত্তম দাস (ওরফে বলরাম দাস)-এর লেখা ‘প্রেমবিলাস’ আর নরহরি চক্রবর্তীর লেখা ‘ভক্তিরত্নাকর’ বই থেকে জানা যায়, বৈষ্ণব সাধক শ্রীনিবাস আচার্য ও কিছু ভক্ত যখন বৃন্দাবন থেকে গৌড়ে যাচ্ছিলেন, ওই সময়ে রাজা হাম্বীর তাঁদের ওপর লুঠপাট চালান। কিন্তু শ্রীনিবাসের ভাগবত পাঠ শুনে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে দীক্ষা নিয়ে ফেলেন বৈষ্ণব ধর্মে। এরপর তিনি উপাস্য দেবতা বিষ্ণুর প্রথম যে মন্দিরটি তৈরি করিয়েছিলেন, সেটি হল রাসমঞ্চ।
আরও পড়ুন
বোঙা হাতি-ঘোড়ার দেশ—পাঁচমুড়া থেকে ফিরে
বিষ্ণুপুরের অন্য সব স্থাপত্যের থেকে রাসমঞ্চের গঠন কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি গোটা বাংলা কিংবা সমস্ত ভারতে এই ধরনের স্থাপত্য আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মোটামুটি ১৬০০ সাল নাগাদ এটিকে তৈরি করিয়েছিলেন রাজা বীর হাম্বীর। সারা বছর কিন্তু এখানে কোনো পুজো হত না বা কোনো প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহও ছিল না এখানে। রাস উৎসবের সময় বিষ্ণুপুর শহরের সব কটি রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এখানে সাধারণ ভক্তদের দর্শনের জন্য আনা হত। রাধাকৃষ্ণের মূর্তি অলিন্দে সাজিয়ে করা হত রাসলীলা। ১৬০০ থেকে টানা ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এখানে আয়োজিত হয়েছে রাস উৎসব। তবে এখন সেই উৎসব বন্ধ আছে। দেশি লাল মকরা পাথরে বানানো আসনের উপর গোটা মন্দিরটি সূর্যে পোড়ানো ইটের গাঁথা। মন্দিরের গায়ে রয়েছে টেরাকোটার ফলক আর পাথরের নকশা। স্থাপত্যের একেবারে উঁচুতে দেখা যায় সিঁড়ি দিয়ে ঘেরা মিশরের পিরামিডের মতো একটা চূড়া। চূড়ার নিচে চারটে করে দোচালা আর প্রত্যেক কোণে চারটে করে চারচালা আছে। এগুলো বাংলার নিজস্ব শৈলীতে বানানো। মন্দিরের খিলানওয়ালা দরজাগুলো আবার ইসলামি স্থাপত্যের অনুসরণে তৈরি। এইভাবে তিনটে আলাদা রীতি মিশে গেছে রাসমঞ্চের কাঠামোতে। দূর থেকে বিষ্ণুপুরের রাসমঞ্চকে দেখলে মনে হবে যেন পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠেছে একটা ছোট্ট গ্রাম।
তথ্যসূত্র – বণিক বার্তা, বঙ্গভারতী।
