
এবার স্টল বসেছিল আড়াই হাজার, প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের ভিড়
এবার ২০৬ বছরে পা দিল কোচবিহারের রাসমেলা। ১৮১২ সালের অগ্রহায়ন মাসের কার্তিক পূর্ণিমার সন্ধেবেলা কোচবিহারের রাজা হরেন্দ্রনারায়ণ ভেটাগুড়িতে তাঁর নতুন রাজসভায় পা রাখেন। তখন থেকে ভেটগুড়িতে রাসমেলার আসর শুরু হয়। তারপর ১৮৯০ সালে কোচবিহার শহরে বৈরাগী দীঘির পাশে মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ হলে মেলা ভেটগুড়ির বদলে কোচবিহার শহরেই অনুষ্ঠিত হতে থাকে। তখন প্রথম প্রথম মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলেই মেলা বসত। ধীরে ধীরে মেলার আয়তন বাড়তে থাকলে ১৯১৭ সাল নাগাদ প্যারেড গ্রাউন্ডে মেলা সরে যায়। তখন থেকে ওই জায়গা ‘রাসমেলার মাঠ’ নামে পরিচিতি পেতে থাকে। কুলদেবতা মদনমোহনের নামে চলা রাসের মেলার আয়োজন হত কোচবিহারের রাজপরিবারের তত্ত্বাবধানে। এখন পৌরসভার তরফ থেকে প্রত্যেক বছর মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলাকে বলা যেতে পারে কোচবিহার তথা উত্তরবঙ্গের সবথেকে বড়ো উৎসব।
রাস পূর্ণিমার রাতে মদনমোহন মন্দির চত্বরে রাসচক্র ঘুরিয়ে মেলার উদ্বোধন করা হয়। রাসচক্রটি বৌদ্ধ ধর্মচক্রের আদলে তৈরি। ৮-১০ ফুট ব্যাসের আর ৩০-৪০ ফুট উঁচু বাঁশের তৈরি কাঠামোর ওপর কাগজের ডিজাইন করে এই রাসচক্র তৈরি করে আসছে হরিণ চওড়ার একটি মুসলিম পরিবার। এভাবে কোচবিহারের রাসের মেলায় তৈরি হয়েছে সর্বধর্মসমন্বয়ের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। মন্দির ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি, হতে পারেন তিনি কোনো মন্ত্রী বা জেলাশাসক, রাসচক্র ঘোরানোর পর সাধারণ দর্শনার্থীরাও রাসচক্র ঘোরানোর সুযোগ পান। মদনমোহন মন্দির চত্বরে পূতনা রাক্ষসীর মূর্তি দেখতেও ভিড় হয় প্রচুর। এর পাশাপাশি মন্দিরের পুতুলঘর সাজানো হয় নানা বিচিত্র পৌরাণিক চরিত্রের মডেল দিয়ে।
মেলার আসর বসে দুটো আলাদা জায়গায়। ঠাকুর বাড়ির উঠোনে দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের আয়োজনে চলে কীর্তন, বাউল গান, যাত্রাপালা। আর পৌরসভার তত্ত্বাবধানে থাকে লোকশিল্পীদের পারফরম্যান্স, আধুনিক গান, নাটকের মতো বিনোদনের উপাদান। জিলিপির লড়াই এই মেলার একটা প্রধান আকর্ষণ। বাবুরহাটের জিলিপি, পুণ্ডিবাড়ির জিলিপি, দেওয়ানহাটের জিলিপি – হরেক নাম নিয়ে এই গরমাগরম মিষ্টির বিক্রেতারা একে অপরের সঙ্গে টক্কর দেন। নানান মজাদার খাবার তো থাকেই, এছাড়া শাল, পাথরের বাসনপত্র, প্লাস্টিকের খেলনা, কাঠের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আঞ্চলিক এবং ভিন রাজ্যের বিক্রেতারাও এই মেলাতে জমিয়ে বসেন। এত কিছুর মধ্যেই মেলার নিরাপত্তার দিকে প্রশাসন যথেষ্ট জোর দেয় প্রত্যেকবার। ইতিমধ্যেই রাসমেলার মাঠকে নো স্মোকিং জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। চারদিকে সিসিটিভি ক্যামেরার সঙ্গে প্রচুর সাদা পোশাকের পুলিশ থাকেন মেলার সময়।
গত ২২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার এবছরের মেলা শুরু হয়েছিল। শেষ হয়েছে ৯ ডিসেম্বর রবিবার। লক্ষ মানুষের ভিড়ে এবার দোকানিদেরও বিক্রি হয়েছে প্রচুর। জানা গেছে, এবছর স্টল বসেছিল আড়াই হাজার। বাংলাদেশ থেকে এসেও দোকান সাজিয়েছিলেন বিক্রেতারা। পাশাপাশি ছিল মিউসিক্যাল ডান্স, ড্রাগন ট্রেন, নাগর দোলা, সার্কাস। ছিল নানা স্বাদের বিচিত্র খাবারের পসরা, আসবাব, কাঁসা-পেতলের বাসন, ঘর সাজানোর জিনিস, বিভিন্ন রকমের মূর্তি, হাতের কাজ, শাড়ি, এবং আরো অনেক কিছু। হাতে তৈরি ছোটো ছোটো রাসচক্রও কিনেছেন অনেকে। প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত মেলায় ভিড় ছিল জমজমাট।
