ডুব দে রে মন রামপ্রসাদের শরবতে

বর্ধমান শহরে প্রায় ৫০ বছর ধরে মাতিয়ে রেখেছে রামপ্রসাদের শরবত

চরম গ্রীষ্ম আর মাঝে মাঝে বর্ষার আমেজ। বৃষ্টি হলেও শহর, মফস্বলের কিছু কিছু দোকানে কান পাতলে এখনও দাবদাহের শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে পাওয়া যায়। তাই রামপ্রসাদের শরবতের দোকানে লাইন পড়েছে সারা বছরের মতোই। এই শরবত খেয়ে স্কুল-কলেজ থেকে ফিরে ছাত্রছাত্রীরা জিরোচ্ছেন, অফিস থেকে ফিরে কলিগ-যুগল জিরোচ্ছেন, গৃহকত্রী হেঁশেল ঠেলে চলে আসছেন শরবতে চুমুক দিতে। মনের আরাম, শরীরের আরাম, হৃদয়েরও। প্রায় একবছর ব্যবসায় বেশ টান পড়েছে। আগের মতো দোকানে আর ভিড় হয় না। তবুও বর্ধমানের বুকে রমরমিয়ে আজও সেরার সেরা রামপ্রসাদের শরবত।

বর্ধমান শহরের ভরসা রামপ্রসাদের শরবত আর লস্যি। আর এখন তো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাজির কোল্ড কফিও। দশ টাকায় গ্লাস ভরা তৃপ্তি। আপনি যা খাবেন সবই মাত্র দশ টাকা। টক দই, চিনি আর সামান্য বরফ। ব্যাস, তাতেই প্রাণে পুলক আসে। ডান্ডা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ঘোল। গ্লাসের উপরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কাজু-আমন্ডের কুচি আর ছোটো এলাচের গুঁড়ো। দোকানের মালিক রামপ্রসাদ সাউ এইভাবে বাজিমাত করছেন সাত দশক ধরে। ট্রাডিশন এখনও অক্ষত আছে। বর্ধমানের কার্জন গেট লাগোয়া রামপ্রসাদের এই দোকান। বর্তমানে ব্যবসা সামলান রামপ্রসাদবাবুর নাতি রিকি সাউ। শরবত এখানকার ইউএসপি ঠিকই, তবে এই মুহূর্তে কোল্ড কফির ডিম্যান্ডও কম কিছু নয়। বেলা বারোটার পর থেকেই দোকানে মানুষের আনাগোনা। এখন করোনাবিধির কথা মাথায় রেখে এবং সরকারি নিয়মাবিধি মেনেই চলছে ব্যবসা। আগে ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খেতেন মালিক থেকে কর্মী। ছোটো বড়ো সকলের স্বস্তির চুমুক। এক চুমুকেই কাফি। গ্রীষ্মে রামপ্রসাদী লস্যির ব্যবসা চলে হইহই করে। শীতে একটু কমে এলেও দোকানের বাঁধাধরা কিছু শরবত রসিক আছেন, যারা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা উপেক্ষা করে প্রতিদিন একবার ঢুঁ মারবেনই। দোকানের টিআরপি এখানেই। বর্ধমান শহরে প্রবাদ আছে, রামপ্রসাদের দোকানে শরবত না খেলে নাকি বর্ধমানের আসল স্বাদই চেনা যাবে না। বর্ধমান বলতেই আমাদের যেমন মনে পড়ে সীতাভোগ, মিহিদানা কিংবা ল্যাংচা; তেমনই রামপ্রসাদী শরবত। না পান করলে শহরটাকেই চিনতে পারবেন না। 

এমনিতেই কার্জন গেট বর্ধমানের প্রাণ। সবসময় নাভিশ্বাস ভিড়। এই গেটের ঠিক পাশেই ছোট্ট একটা দোকান। মন জুড়োতে রামপ্রসাদের জুড়ি মেলা ভার। এক ডাকে চেনে গোটা শহর। প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো দোকান। এই শরবতের এত চাহিদা কেন? দোকানের মালিক ও কর্মীদের দাবি কম দাম এবং বেস্ট কোয়ালিটি। খদ্দের বশীকরণ মন্ত্রে কাবু শহরবাসী। শুধুমাত্র এই শহরের মানুষই নন, দোকানে ভিড় জমান অন্য দেশ থেকে আসা সাহেবসুবোরা। বর্ধমান প্রাচীন শহর। সাহিত্য থেকে সংস্কৃতি, সবেতেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। বর্ধমানের মিষ্টি জগতখ্যাত। ভাটা পড়েনি শরবতেও। তবে আরও একটা বিষয় আছে বটে। দোকানের পজিশন। পাশেই আদালত। উকিল-মোক্তারের যেমন ভিড়, ঠিক তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ, তাই ছাত্রছাত্রীর ভিড়। সুপার ডুপার হিট রামপ্রসাদী শরবত আর লস্যি। শীতের কথা উপেক্ষা করে বর্ধমানে যখনই যাবেন একবার রামপ্রসাদের দোকানে আপনাকে ঢুঁ মারতেই হবে। নাহলে ষোলোকলা পূর্ণ হবে না। আপনার রসনাতৃপ্তিতে রামপ্রসাদ কাজু ছড়িয়ে রাখবে। রাখবেই। চেখে দেখবেন।

ছবিঃ স্নেহা সেন

Developed by DXDasia