
সুন্দরের হাতে বিধাতার তুলে দেওয়া রক্ত তুলির আঁচড়ে রচিত হল সাঁওতালি দৃশ্যকাব্য
‘সুন্দরের হাতে রক্তের তুলি দিয়েছে বিধাতা। জানি নে, রাঙা রঙে তুমি কী লিখন লিখতে এসেছ। মালতী ছিল, মল্লিকা ছিল, ছিল চামেলি; সব বাদ দিয়ে এ ফুল কেন বেছে নিলে?-জান? মানুষ না জেনে অমনি করে নিজের ভাগ্য বেছে নেয়’। রঞ্জনের ভালোবাসার রঙ মেখে যক্ষপুরীর অন্ধকার কে টুকরো করে দেওয়ার খেলা চলছে। নেপথ্যের গহীন আঁধার থেকে সাঁওতালি গর্জন ভেসে আসছে- ন…ন্দি…নী। আর বারবার তুমুল স্পর্ধায় সেই গর্জনের প্রত্যুত্তর দিচ্ছে একরত্তি সুন্দর, আরও উচ্চগ্রামে সেই সাঁওতালি উচ্চারণ, রাজা…। ঢোল, মাদল, বাঁশি, আর সাঁওতালি তারবাদ্য ‘বানাম’-এর সুরে সুন্দরের হাতে বিধাতার তুলে দেওয়া রক্ত তুলির আঁচড়ে রচিত হল সাঁওতালি দৃশ্যকাব্য-‘আরা বাহা’। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা এই নাটকের শিরায় শিরায় উদযাপিত হল প্রাণের স্পন্দন, নির্বাসনে গেল জড়ত্ব, পাষাণ।
কথা ছিল শান্তিনিকেতনের অদূরে দ্বারন্দা গ্রামের থিয়েটার কটেজের চারদিক খোলা মাটির মঞ্চে মঞ্চস্থ হবে ‘আরা বাহা’। বাদ সাধল প্রকৃতি। তার নিদারুণ রোষের কবলে পড়ে তুমুল বর্ষণে ভেসে গেল সব আয়োজন। কিন্তু নাছোড় আয়োজক বীরভূম ব্লসম থিয়েটারের কর্ণধার, নাট্যকার, পরিচালক পার্থ গুপ্ত আর তাঁর ফ্রেন্ড-ফিলোজফার-গাইড নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং অতি অবশ্যই এই গ্রুপের নিবেদিত প্রাণ অভিনেতা ও সদস্যগণ। তাঁদের অকুণ্ঠ পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানল প্রতিবন্ধকতা। নির্ধারিত ২১ অক্টোবরের সন্ধ্যায় শান্তিনিকেতনের ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টার( ইজেডসিসি), ‘সৃজনী’-তে আমরা সাক্ষী থাকলাম সাতটি গ্রামের সাঁওতাল কুশীলবদের অভিনীত নাটক ‘আরা বাহা’-র।
‘আরা বাহা’- র অর্থ লাল ফুল। ১৪ টি ছোট ছোট দৃশ্যে রক্তকরবীর নির্যাসকে সাজিয়েছেন নাট্যকার-পরিচালক পার্থ গুপ্ত। এ নাটকের মঞ্চ এবং সংগীত নির্মাণও তাঁর। বীরভূমের ভূমিপুত্র-কন্যাদের দিয়ে গভীর অনুশীলনের রাস্তায় হেঁটেই তাঁর এই ভিন্ন দর্শন ও চিন্তার প্রণয়ন, আদিম চরাচরের উদযাপন- ‘আরা বাহা’।
পার্থ গুপ্ত
পার্থ বললেন, ‘আমি সাঁওতালি ভাষায় রক্তকরবী করছি না, সাঁওতালিতে রক্তকরবী করছি’। দুর্গা বাস্কি, সুরিয়া হেমব্রম, সুনীল বাস্কি, জগন্নাথ কিস্কুদের সংলাপ, সংগীত, কুশীলব সবেতেই আদিম জনজাতির অনিবার্য উপস্থিতি। দৃশ্য বিন্যাসও সম্পূর্ণ স্বকীয়। তাই এই নাটক কোনও ভাবেই নিছক সাঁওতালি ভাষায় অনুবাদ নয়, রক্তকরবীর রঙ প্রাচীন জীবন চর্যার সংস্কৃতির ক্যানভাসে খুঁজে ফেরাও নয়। এ যেন এক স্বাভাবিক উচ্চারণ, আত্মআবিস্কারের খেলা। আসলে ভাষা আর ভাব তো উড়ে এসে জুড়ে বসলেই ‘আরা বাহা’ হয় না। এর পিছনে রয়েছে নাটক নির্মাতার দারিন্দা গ্রামে আশৈশব সাঁওতালিদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। পরবর্তীতে রতন থিয়ামের ছাত্র পার্থর থিয়েটার সহজেই নিজস্ব করিডোর খুঁজে পায় সাঁওতালি সত্তার গর্ভগৃহে। রক্তকরবীর নন্দিনী পরিচালকের কাছে তাই দুশো বছর আগের কোনও সাঁওতালি জনপদের এক কন্যা। তাঁর দাবি রক্তকরবীর ভিতরেই রবীন্দ্রনাথ রেখে গেছেন তার কুশল ইশারা।
আর সেই কন্যা শহুরে ন্যাকামির শিকার নয়, ক্ষমতার অশরীরী চোখে বিষ ঢেলে দিতে পারে তার উচ্চারণ। সারা শরীর দিয়ে দ্রোহ রচনা করতে পারে প্রলম্বিত স্পর্ধায়, রাজা…… । সেই শ্বাসরুদ্ধ উচ্চারণের কাছে নত হয়েও লক্ষ্য করি পিছনে মায়ার চাঁদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, বিক্ষত বিশু খ্যাপা, কিশোরের লাঞ্ছিত মনের শুশ্রূষা হয়ে রাজাকে নিয়ে যাচ্ছে রঞ্জনের দেশে।
পরিচালক বিশ্বাস করেন রক্তকরবীর সেই ব্যাখ্যানে, যে ব্যাখ্যান বলছে, রাজা আর রঞ্জন ভিন্ন নয়, রাজাই রঞ্জন হয়ে ওঠার উদগ্র বাসনা নিয়ে নিজেকে ধ্বংসের আয়োজন করছে। তাই বহির্জাগতিক পলিটিকসের বেড়া অস্বীকার করে ‘আরা বাহা’ নির্দেশ দেয় মানব জমিনের একান্ত ভূমিটিকে স্পর্শ করতে। আমার ভিতরেই রয়েছে রাজা, আমার ভিতরেই রয়েছে রঞ্জন। রাজার নির্দেশে দাপাদাপি করছে সর্দার, টলোমলো পায়ে পরাধীনতার জ্বালায় কাঁপছে ফাগুলাল। এখন কথাটা হচ্ছে, নন্দিনী কবে আসবে, আর রাজাকে রঞ্জনে পৌঁছে দেবে, কবে আত্মবিগ্রহ ভাঙার যুদ্ধ ঘোষণা হবে। ‘আরা বাহা’ শেষ দৃশ্যে তাই কোনও সংলাপ নেই, কেউ নেই, কেবল একটি লাল ফুল, হয়তো রক্তকরবী, ধীরে ধীরে পাষাণ পৃথিবীর প্রাণ জাগিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। কী বলছে সে? বলছে সময় এসেছে, নিজেকে জাগানোর সময়? কী জানি। হয়তো তাই।
