বাঁচো বাঁচো আর বাঁচো, যন্ত্রণাও যেখানে তুচ্ছ হয়ে যাবে এক নিমেষে

কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হল গৌতম ঘোষের নতুন ছবি ‘রাহগির’

একটাই জীবন। তাকে প্রতিদিনের নেশায় উপভোগ করাই হল আসল। কিন্তু এই দুনিয়ায় কজন মানুষই বা জীবনটাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে! যারা জীবনটাকে একটা আকাশ সমান মনে করে, এই সমাজে তারাই হয়তো একা। প্রবল একা। সেখানে প্রেম আসে, প্রেম যায়। মাঝে মাঝে আনন্দে নেচে উঠতে ইচ্ছা করে, মাঝে মাঝে প্রবল কান্না পায়। এই পৃথিবীতে আসলে সমস্ত মানুষই একা। সেই একাকিত্বের বোধ হয়ে নির্মিত হয় এক একটি চওড়া রাস্তা দেখার বিস্তৃতি। গৌতম ঘোষের নতুন ছবি ‘রাহগির’ আসলে কয়েকজন একা মানুষেরই গল্প। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ হলেও, জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ বোধ আছে তাদের। তারা হার মানতে জানে না। তারা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুত্ব পাতাতে জানে। তারা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে জানে, হাত হাত মেলাতে পারে অনায়াসে।

গৌতম ঘোষের ‘রাহগির’ নির্মিত হয়েছে প্রফুল্ল রায়ের ছোটোগল্প ‘বর্ষায় একদিন’ অবলম্বনে। তাঁর নিজস্ব ঘরানায় এই ছবিটি জায়গা করে নিয়েছে মানবিক মূল্যবোধে। এই ছবিতে ঘরের চার দেওয়ালের দৃশ্য কম। অর্ধেকের বেশি জুড়ে আছে পাহাড়ি রাস্তা, বর্ষায় জমে থাকা কাদা, ঝরনা-নদী, লোকগান-নৃত্য, প্রতিবাদ আর বিস্তৃত আকাশ। মূলত তিনটি চরিত্র তিনভাবে নির্মিত। কিন্তু তাদের কেন্দ্র একটাই। একটা অচেনা রাস্তার সফরে তারা তিনজনেই মিলিত হচ্ছে। তারা বন্ধু হয়ে উঠছে। এই সফরের মধ্যিখানে থাকে গ্রাম আর শহরের অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। যেখানে কিছু টাকা অর্জনের জন্য ওরা শহরে যাচ্ছে। আর সেখানেই পরিচালকের মুন্সিয়ানায় কারখানার যন্ত্রের আওয়াজের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পাহাড়ি লোকনৃত্যের রিদ্‌ম। মাত্র তিনটি চরিত্রের মধ্যে পরিচালক গোটা দেশের ছবিটা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। আর ঠিক এখানেই ‘রাহগির’ হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ কনটেম্পোরারি ফিল্ম যাকে আমরা বলি সমকালীন বা একালের চলচ্চিত্র। বারবার গৌতম ঘোষ একটা অস্পষ্ট পুঁজিবাদী গ্রাসের প্রশ্ন তোলেন। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে তিনি প্রকটভাবে প্রেম রাখেননি, কিন্তু আশা রেখেছেন। এই আশা প্রবলভাবে বাঁচার। যন্ত্রণা যেখানে তুচ্ছ হয়ে যায় এক নিমেষে। 

নাথনির স্বামী পঙ্গু। বাড়িতে রয়েছে দুটি ছেলে-মেয়ে। একটু ভাত খাবার জন্য তাকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। অন্যদিকে লাখপতি বাবা-মাকে হারিয়েছেন, বিয়ে করেননি। তার জীবন সম্পূর্ণ একার। গ্রাম থেকে শহরে যাচ্ছেন কিছু রোজগার করতে। ছোটোখাটো কাজ পেলে ঠিক করেছেন শহরেই থেকে যাবেন। চপটলাল সামান্য গাড়িচালক। তার গ্রামের দুই বৃদ্ধ ভিখারি মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। তাই চপটলাল তাদের ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছেন শহরের হাসপাতালে। গল্প এগোয় এভাবেই। তারপর এই তিনজন একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। সাক্ষী থাকে আকাশের কালো মেঘ আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সেই ভটভটির চাকা কাদায় আটকে যায়। এখন উপায়? নাথনি আর লাখপতি এগিয়ে আসে। পিছন থেকে ঠেলা মারে। এইভাবে গোটা রাস্তা তারা শহরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এই যাত্রা যন্ত্রণার নয়, তৃপ্তির। তারা প্রত্যেকেই একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পেরে খুশি। চোখে মুখে তাদের ক্লান্তির ছাপ থাকলেও হাসি ম্লান হয়ে যায়নি কারোর।

গৌতম ঘোষ এই ছবিতে কোনো ভনিতা রাখেননি। যা বলেছেন সবটাই সরাসরি। কিছু মানুষ তো এখনও সত্যিই ভালো আছে। কিছু মানুষ তো এখনও বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। এই ছবির চিত্রগ্রহণ আস্ত একটি চরিত্র হয়ে উঠে আসে। ঝাড়খণ্ডের পাহাড়ি বৃষ্টি, নোংরা কাদা, উঁচু-নিচু রাস্তা সবটাই ভীষণ শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন ঈশান ঘোষ। প্রত্যেকটা ফ্রেম হয়ে উঠেছে দর্শকদের মনের ক্যানভাস। আবহ নির্মাণ গৌতম নিজেই করেছেন। প্রত্যেকটা দৃশ্যের শব্দ অনির্বাণ সেনগুপ্তের হাতে জীবন পেয়েছে। গৌতম ঘোষ বারবার দেশের বর্তমান প্রসঙ্গ নিয়ে সোচ্চার হন তাঁর সিনেমায়। তাঁর ছবিতে প্রেম, সম্পর্ক, যৌনতার মধ্যে মিশে থাকে রাজনীতি। এই ছবিও অনেক সংকেতকে ছুঁয়ে দেশের সত্যি কথাটা বলে যায়। আর তাই তো পিকনিকের মধ্যে একদল তরুণ-তরুণীর উন্মত্ততা নাথনি-লাখপতি-চপটলালের বন্ধুত্বের পাশে ম্লান হয়ে যায়। অকস্মাৎ সেই ক্ষণিক উন্মত্ততার মৃত্যুও হয়। যখন পিকনিক পার্টি থেকে এক একটি লাল-গোলাপি বেলুন এসে নদীতে ভেসে ভেসে যায়, তখন সেই নদীর জল খেয়েই বিশ্রাম নেয় নাথনি আর লাখপতি। আরাম আর তৃপ্তির দ্বন্দ্ব এখানেই।

২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গত ১০ নভেম্বর মাস্টার্স বিভাগে এই ছবিটি দেখানো হল। অনেকদিন পর আবার হিন্দি ছবি নির্মাণ করলেন গৌতম ঘোষ। আর একটা কথা না বললেই নয়, শুধুমাত্র তিলোত্তমা সোমের জন্যই এই ছবি বারবার দেখা যায়।

রাহগির | পরিচালনা ও আবহ- গৌতম ঘোষ | অভিনয়- তিলোত্তমা সোম, আদিল হুসেন, নীরজ কবি | প্রযোজনা- আদর্শ টেলিমিডিয়া প্রা.লি.

Developed by DXDasia