
বিধু বিনোদ চোপড়ার ছবি, অভিনয় করছেন জ্যাকি শ্রফ, সুযোগ এল তাঁর লিপে গান গাওয়া
পঞ্চমদার আজ জন্মদিন। আমার মনে পড়ে যাচ্ছে স্কুল জীবনের কথা। তখন থেকেই রাহুল দেব বর্মন নামটার সঙ্গে আমাদের পরিচয়। তরুণদের একটা নিজস্ব পছন্দের জায়গা থাকে। আরডি বর্মনের থেকে আমরা গানের জগতে নতুন ধারা পেয়েছি। তাঁর এক-একটি ব্যতিক্রমী কাজ, যা আমাদের আশ্চর্য করছে, মুগ্ধ করছে।
আরডি বর্মনের সঙ্গে আমার পরিচয়পর্ব অনেক অনেক পরে। কখনও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক হবে, ভালোবাসা পাবো, স্বপ্নেও ভাবিনি। কপালে ছিল, ঘটে গিয়েছে। আরডি বর্মন তখন ‘১৯৪২ঃ আ লাভ স্টোরি’ ছবি করছেন। জীবনের একেবারে শেষ দিকের কাজ, যে সময়ে তেমন কোনও কাজই তাঁর হাতে ছিল না। এরকম পরিস্থিতিতে বিধু বিনোদ চোপড়ার এই ছবিটির দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হল।
একটা অন্য কাজে আমি মুম্বাই গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর পুজোর গান হবে মুম্বাইয়ে। সুরকার অরূপ-প্রণয়, যাঁরা কুমার শানুর পুজোর গান করে খুব জনপ্রিয় হয়েছিলেন। এঁদের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট করতেন বাবলু চক্রবর্তী, যিনি পঞ্চমদারও সহকারী। আমাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে। পাশের পাড়া সিকদার বাগানে বাবলুদার বাড়ি। তাঁদের সঙ্গে আমার পাড়াতুতো সম্পর্ক। তখন মুম্বাইয়ে বাবলুদার কাকার বিরাট দোকান ছিল। অরূপ-প্রণয়ের সঙ্গে বাবলুদা কাজ করছেন জেনে তাঁকে ফোন করলাম। আগে আলাপ ছিল, আরও ভালো করে আলাপ হল। রেকর্ডিং যখন চলছে, বাবলুদার কথায় কথায় পঞ্চমদাকে বলেছেন যে অরুন্ধতী এসেছে। পঞ্চমদা আর অরুন্ধতী দু’জনেই ত্রিপুরার মানুষ।
আরডি বর্মন তখন ‘১৯৪২ঃ আ লাভ স্টোরি’ ছবি করছেন। জীবনের একেবারে শেষ দিকের কাজ, যে সময়ে তেমন কোনও কাজই তাঁর হাতে ছিল না। এরকম পরিস্থিতিতে বিধু বিনোদ চোপড়ার এই ছবিটির দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হল।
একদিন মুম্বাইয়ের মধুবনী রেকর্ডিং স্টুডিওতে অরুন্ধতীর গান হবে, পঞ্চমদা হঠাৎ সেখানে চলে এলেন। আমরা তো আকাশ থেকে পড়েছি। বাবলুদা বললেন, “তোদের ভাগ্য ভালো। পঞ্চম কখনও কোনো ফ্লোরে যায় না। অরুন্ধতী গান গাইবে শুনে ও এসেছে”। সামান্য কিছুক্ষণ ছিলেন, গান শুনে বললেন, “ওকে, ভেরি গুড”। তারপর বেরিয়ে গেলেন। আমি কথায় কথায় বলেছিলাম, “একটা ছবি যদি তুলতে পারতাম আপনার সঙ্গে!” উনি বললেন, “এখানে না, বাড়িতে এসো”। স্টুডিওর তিনতলা থেকে একতলায় নামতে নামতে আমি ওঁকে বলছি, “আমরা সারা বছর বসে থাকি আপনার কম্পোজিশন শোনার জন্য”। একদিন হঠাৎ করেই পঞ্চমদার তবলাবাদক টুটুনদা আমাকে বললেন, “শিবাজী, তোমার গানের কোনো ক্যাসেট আছে এখানে?” আমি বললাম, “না, ক্যাসেট তো সেরকম সঙ্গে আনিনি। তবে একটা ক্যাসেট আছে, যেখানে আমি হেমন্তদার হিন্দি গানগুলোর বাংলা ভার্সন করেছিলাম”। উনি বললেন, “ওটাই তুমি দাও। পঞ্চমদা চেয়েছেন তোমার গান”। আমি ক্যাসেটটা দিয়ে দিলাম। তখন ছিল দুপুরবেলা। বিকেলে বাবলুদার বাড়ি গিয়েছিলাম। বাবলুদা বললেন, “এই তোমার গান শুনিয়ে গেল পঞ্চম”। আমি তো অবাক।
রাহুল দেব বর্মন
তারপর একদিন পঞ্চমদার বাড়ি গেলাম। তখন তোলা একটিই মাত্র ছবি আমার রয়েছে পঞ্চমদার সঙ্গে। আমি অরুন্ধতী এবং আমার ছোটো ছেলে তখন কোলে। উনি চকোলেট কিনে দিলেন ছেলেকে। সবাই চা খেলাম।
কলকাতায় চলে আসার পরে আরডি বর্মন একদিন ফোন করলেন, “আমি পঞ্চমদা বলছি”। অরুন্ধতী ফোন ধরেছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি, পঞ্চমদা তখন বলছেন, “আরে আমি রাহুল দেব বর্মন বলছি”।
— “হ্যাঁ দাদা বলো”।
— “শিবাজী বাড়ি আছে?”
আমি তখন কলকাতায় ছিলাম না। আসামে একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। অরুন্ধতী সেটাই বলল।
পঞ্চমদা বললেন, “ওকে বোলো আমাকে একটা ফোন করতে। একটা বড়ো কাজের ব্যাপার আছে। যদি হয়, দেখা যাক”।
বাড়িতে ফিরতেই অরুন্ধতী জানাল সবটা। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। সেদিনই রাত্রে ফোন করলাম পঞ্চমদাকে। সেটা ১৯৯২ সাল। পঞ্চমদা বললেন, “তুমি কাল-পরশু নাগাদ বম্বে চলে আসতে পারবে?” আমি বললাম, “হ্যাঁ দাদা, চলে যাব”। উনি বললেন, “চলে এসো। একটা বড়ো কাজ দেখি যদি তোমাকে দিয়ে হয়”। আমি যথারীতি পরের দিন ফ্লাইটে মুম্বাই চলে গেলাম। পঞ্চমদার বাড়িতে যেতে তিনি বললেন, “বিধু বিনোদ চোপড়া একটা ছবি করছেন। এই ছবিতে শুভময় বলে একটা বাঙালি চরিত্র আছে, অভিনয় করছেন জ্যাকি শ্রফ। তাঁর লিপে একটা গান আছে। এঁরা চাইছেন, সেটা হেমন্তদার গায়কি আছে এমন কাউকে দিয়ে যদি গাওয়ানো যায়। তোমার গান ওরা শুনেছে, পছন্দও করেছে। তোমাকে গানটা আজ তুলে দেবো। কালকে বিধু বিনোদ চোপড়া, জাভেদ আখতার – এঁরা সব আসবেন। তোমার গান শুনে এরা অ্যাপ্রুভ করলে দেখো তোমার জীবনে একটা… আর উচ্চারণে খুব জোর দিও। এঁরা উচ্চারণটা নিয়ে ভীষণ কড়াকড়ি করেন। আরেকটা কথা বলে রাখি, তুমি কিন্তু খোলা গলায় গানটা গাইবে”। আমার নিজের উপর একটু হলেও কনফিডেন্স ছিল। তাই আশা ছাড়িনি।
সেটা ১৯৯২ সাল। পঞ্চমদা বললেন, “তুমি কাল-পরশু নাগাদ বম্বে চলে আসতে পারবে?” আমি বললাম, “হ্যাঁ দাদা, চলে যাব”। উনি বললেন, “চলে এসো। একটা বড়ো কাজ দেখি যদি তোমাকে দিয়ে হয়”। আমি যথারীতি পরের দিন ফ্লাইটে মুম্বাই চলে গেলাম।
উনি গানটা শিখিয়ে দিলেন। আমি হোটেলে প্র্যাকটিস করলাম। হারমোনিয়ামও ছিল না তখন। পরের দিন সন্ধেবেলা পঞ্চমদার বাড়ি গিয়ে দেখি, বিশাল ঘরে সবাই বসে আছেন। তখন বিধু বিনোদ চোপড়া সম্পর্কে কিছুই প্রায় জানতাম না। টুটুনদাও ছিলেন। আমাকে বসিয়ে একটা মাইক্রোফোন দেওয়া হল। পঞ্চমদা একটা মাইক্রোফোন আর হারমোনিয়াম নিলেন। ওঁরা সামান্য কথাবার্তার পর গানটা গাইতে বললেন। গান শোনালাম। গান শুনে সবাই বেশ খুশিই হলেন। জাভেদ আখতারজি বললেন, “দাদা, এই গানের শুরুতে একটা শায়েরি আমি দু’লাইন লিখে দিচ্ছি”। বলে তখনই লিখে ফেললেন। পঞ্চমদা সঙ্গে সঙ্গে সুর করে দিলেন।
এই পর্ব মিটে গেল। পঞ্চমদা বললেন, “পুজোর পর আমি একটা প্রোগামে ব্যাংকক যাব। ফিরে এসে তোমার গানটা ধরব। ওরা তোমাকে অ্যাপ্রুভ করেছে”।
লক্ষ্মীপুজোর পরে পঞ্চমদার ফোন এল, “তুমি বম্বে এসো। গানটা রেকর্ডিং করব”। এর মধ্যে আমার যেটুকু প্রস্তুতি নেওয়ার, রেওয়াজ করার, তা করলাম। তারপর আবার মুম্বাইয়ে যাওয়া হল। দুপুরবেলা পঞ্চমদার বাড়িতে খাওয়াদাওয়া।
পঞ্চমদার সঙ্গে একটা গান করতে পেরেছি, তা আমার ভাগ্য। কিন্তু যে মানুষটাকে দেখেছি সামনে থেকে, তিনি বিরাট মাপের সুরকার। সারা বিশ্বে তাঁর খ্যাতি। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন আমার পাড়ার দাদার মতো। একসময় কলকাতায় লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে রকে বসে আড্ডা মারা বাঙালি ছিলেন কিছু, যারা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথা বলতেন অনর্গল। পঞ্চমদা হলেন ঠিক সেইরকম। কী স্নেহ করতেন আমাকে! যেন আমি তাঁর নিজের ছোটো ভাই। একসঙ্গে খেতে বসেছি। পরে জেনেছেন, আমার সুগার আছে। ধমকে বলছেন, “তুমি তো মহা পাজি ছেলে হে, তোমার সুগার আছে বলোনি? যা দিচ্ছে তুমি খেয়ে নিচ্ছ? দু’শোর নিচে যেন সব সময় সুগার থাকে। মদ খাও নাকি?” আমি বললাম, “না দাদা”। “যাক ঠিক আছে, বেঁচে গেছ”। রাঁধুনীকে বললেন, “শিবু, আমি যে ভাত খাই, সে ভাত শিবাজীকে দাও”। পঞ্চমদারও সুগার ছিল। দু’বার মাড় গালা ভাত উনি খেতেন। একেবারে মাই ডিয়ার মানুষ হয়ে গিয়েছেন তখন। একদিন খুব দুঃখ করে বলেছিলেন, "জানো শিবাজী, আমার বাড়িতে রাত ১২টার সময় সন্ধে হত। গাড়ির পর গাড়ির লাইন লেগে যেত। আজকে দ্যাখো কোনো গাড়িই নেই”।
পঞ্চমদার সুরে গাওয়া সেই গান
একদিন সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত পঞ্চমদা তাঁর কালেকশনে যত ওয়েস্টার্ন গান ছিল, সব শোনালেন। গানবাজনা নিয়ে সে কত কত কথা। বারবার দেখেছি, শচীন দেব বর্মনের কথা উনি উল্লেখ করছেন। বাবা বেঁচে থাকতে কতটা সময় দিতে পেরেছেন জানি না। কিন্তু শেষ বয়সে এসে বাবার না থাকা এবং হাতে তেমন কাজ না থাকা এই দুইয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন।
মুম্বাইয়ের ফিল্ম সেন্টার স্টুডিওতে গান রেকর্ডিং হল আমার। কবিতা কৃষ্ণমূর্তি একটা গান ডাব করলেন আমার আগেই। আমার রেকর্ডিং শেষ হল। তখন থেকেই নিজের পুরো নামটা নিয়ে বেশ ভাবছিলাম। ‘শিবাজী চট্টোপাধ্যায়’ লিখলে সবাই জেনে যাবে বাঙালি ছেলে গেয়েছে। হিন্দিভাষীদের মধ্যে গ্রুপ করার ব্যাপার আসবে। পঞ্চমদাকে বললাম, “নামটা কি শুধু ‘শিবাজী’ রাখব?” উনি বললেন, “খেপেছ তুমি? যদি তুমি ‘শিবাজি চট্টোপাধ্যায়’ না লেখো, বাংলায় তোমাকে চিনবে কী করে? বাংলায় কত শিবাজীই তো আছে”। পঞ্চমদা বাড়িতে অত্যন্ত সহজ সরল মানুষ ছিলেন।
মানুষ হিসাবে ছিলেন আমার পাড়ার দাদার মতো। একসময় কলকাতায় লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে রকে বসে আড্ডা মারা বাঙালি ছিলেন কিছু, যারা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথা বলতেন অনর্গল। পঞ্চমদা হলেন ঠিক সেইরকম। কী স্নেহ করতেন আমাকে।
এই ছবিটা মুক্তি পেল ১৯৯৪ সালে। তার ঠিক আগে সেই বছরই পঞ্চমদা হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আগের বছর পুজোতে উনি মুম্বাইয়ে গান করার জন্য ফোন করেছিলেন। আমেরিকা যাচ্ছি বলে দাদার কথা আর রাখতে পারিনি। ফেরার সময় ডিসেম্বরে মুম্বাইয়ে নামি। আমেরিকার লোকজন ওঁর জন্য গিফট পাঠিয়েছিল। কিন্তু এত ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে ভাবলাম, এখন বাড়ি যাই, পরে আবার এসে গিফটটা দিয়ে যাব। সেটা আর পারলাম না। জানুয়ারিতেই উনি চলে গেলেন। উপহারটা আর কোনোদিন দিতে পারিনি। এত দুঃখ পেয়েছি যে বোঝাতে পারব না।
এই গানটা মুক্তি পাওয়ার আগেই ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ ছবি পছন্দ করেছেন মানুষ। আমি হেমন্তদার স্নেহধন্য, সবাই জানে। তার সঙ্গে যোগ হলেন আরডি বর্মন। যত জায়গায় গান গাইতে গিয়েছি, শ্রোতাদের থেকে অনুরোধ এসেছে ১৯৪৬ ছবির হিন্দি গানটা গাওয়ার জন্য। বিশেষ করে অবাঙালিদের মনে দাগ কেটেছিল গানটা।
পঞ্চমদা বেঁচে থাকলে আমি তাঁর খুব কাছের মানুষ হতে পারতাম, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু উনি যা রেখে গিয়েছেন, ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল, ফোক, ওয়েস্টার্ন – বিভিন্ন সংগীত থেকে নির্যাস নিয়ে নতুন যাত্রাপথের সূচনা করে গিয়েছেন, তা আজও সমানভাবে আধুনিক। এখনও সবাই তাঁর মধ্যে বিচরণ করছে। তিনি যুগের থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন, এটা তারই প্রমাণ।
আজ আপনার জন্মদিন পঞ্চমদা। আমার প্রণাম গ্রহণ করবেন।
__________________________
ছবি সৌজন্যে: শিবাজী চট্টোপাধ্যায় এবং অরুন্ধতী হোম চৌধুরী
