বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’ : পুরুলিয়ার রুক্ষতায় ধর্মান্ধতা, বামনদের লড়াই, শরীরের খিদে

আক্ষরিক অর্থেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত রাজনৈতিক সিনেমা বানাতে চেয়েছেন

সিনেমা নয়, রূপোলি পর্দায় কবিতা লিখছেন বুদ্ধদেব। আর রাজনীতি এসেছে খেলাচ্ছলে। যেভাবে আমরা বাঁচি। বাঁচতে শেখাই। স্বপ্ন দেখি৷ অথবা স্বপ্ন দেখার ভান করি। রাজনীতিহীন আমাদের বেঁচে থাকা বৃথা। রাজনীতির অন্দরে ক্রমশ ঢুকলে আমরা দেখতে পাই সমাজ পরিবর্তনের ডাক। শুনতে পাই শিকল ভাঙার গান। আমাদের দৈনন্দিন পথগুলো চওড়া হয়। আর এই যাত্রাপথের সৌন্দর্য উপভোগ করতেন একমাত্র বাঙালি পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। আক্ষরিক অর্থেই তিনি রাজনৈতিক সিনেমা বানাতে চেয়েছেন। যেখানে বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিপক্ষে আপোষহীন লড়াই, উঠে এসেছে প্রায় অচল হয়ে যাওয়া গ্রামীণ শিল্প, প্রাধান্য পেয়েছে ঘরহীন মানুষের ভালোবাসা, শোষক আর শোষিতের দ্রিমিদ্রিমি দ্বন্দ্ব— কান্না সেখানে জরুরি নয়, চোখের উপর চোখ রাখাও তো লড়াইয়ের আরেক নাম। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন ভাষা সংযোজন করেছেন এভাবেই। (বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা)

একটি সাক্ষাৎকারে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বলেছিলেন, “আমি এক ধরনের যথেচ্ছাচারে বিশ্বাসী। খারাপ অর্থে যথেচ্ছাচার বলছি না, ক্রিয়েটিভলি হওয়া দরকার। এটা না হলে ওই চারপাশের ট্র্যাডিশনের মধ্যেই আটকে পড়তে হয়। ট্র্যাডিশন কিন্তু বেশ মতলববাজ। শিখিয়ে দেয় যে, তুমি আমাকেই শুধু জানো। যেই ভয়টাকে ভেঙে কেউ অন্য কিছু করার চেষ্টা করছ, তখনই সে একা হয়ে যাচ্ছে। সে ডিস্ট্রিবিউটর পাবে না, প্রোডিউসার পাবে না। অথচ এভাবেই তো কোনও এক সময় ‘পথের পাঁচালি’ (Pather Panchali) হল। ‘অযান্ত্রিক’ (Ajantrik) হল। বললাম যে একরকম দেখতে দেখতে সেটাই সিনেমা ধরে নেওয়ার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় এটা। নয়তো অধোগতি আরও গতি নেবে।” (বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা)

আক্ষরিক অর্থেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত রাজনৈতিক সিনেমা বানাতে চেয়েছেন। যেখানে বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিপক্ষে আপোষহীন লড়াই, উঠে এসেছে প্রায় অচল হয়ে যাওয়া গ্রামীণ শিল্প, প্রাধান্য পেয়েছে ঘরহীন মানুষের ভালোবাসা, শোষক আর শোষিতের দ্রিমিদ্রিমি দ্বন্দ্ব।

কথামতো বুদ্ধদেব বেরিয়ে এলেন একটা গড়পড়তা ‘অভ্যাস’ থেকে। শেখালেন মুখোশ যেন মানুষের মনেরই এক আয়না। তাই ‘উত্তরা’-র ছোট্ট ম্যাথু নিজেকে বাঁচাতে মুখোশে মুখ ঢাকে৷ ধর্মের নামে কাদা ছোড়াছুড়ি করা সমাজ ছোট্ট ম্যাথুকে জানিয়ে দেয় মুখোশ বিপদে রক্ষা করতে শেখায়। পালিয়ে কিংবা নিজেকে লুকিয়ে আপাতঅর্থে বেঁচে থাকা যায় বটে, কিন্তু সেটা আর বাঁচার মতো বাঁচা হয়ে ওঠে না। সমাজের ঘাতকরা নতুন প্রজন্মের উপর ঢেলে দেয় বিষ। সেই বিষের মাটি থেকে নতুন চারার জন্ম হওয়াটাও তখন স্বপ্নের মতো। ‘উত্তরা’ ছবিতে আমরা পেয়ে যাই, ‘কালোমানুষী’ খ্রিস্টানদের কথা। সমাজ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। তারা ছোটো জাত। অজ গাঁয়ে বাড়ি তাদের৷ পেটে শিক্ষা নেই, খিদে আছে। প্রার্থনাগৃহে তাদের মন টেকে না। সেখান থেকে পালাতে চায়। এই পোড়া দেশ থেকেও পালাতে চায়৷ কারণ তারা প্রথম বিশ্বের স্বাদ পাওয়ার খিদে অনুভব করেছে। তারা জেনেছে আমেরিকা গেলে খাবার জুটবে। পথে পথে আর ঘুরতে হবে না। কিন্তু কীভাবে যাবে আমেরিকা? “আগে কইলকাতা। উখান থেকে বিজলি ট্রেন। তা বাদে সমুদ্র পাইরান চলা পথ।” — ওই মানুষগুলোর চলার পথ এতটাই সহজ। এতটাই সরল৷ কারণ স্বাধীন দেশে কারোর পেটে খিদে থাকলে, তাদের চলার যাত্রাও আপাত সহজ হয়ে ওঠে৷ (বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা)

এই মহাবিশ্বে খানিক সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন বামনরা। ‘উত্তরা’য় বামনদের একটা বড়ো ভূমিকা আছে। লম্বা মানুষের ছোটো মন, আর বেঁটে মানুষের উদারতার তুলনামূলক দৃশ্যায়ন আছে ছবিতে। বামনদের সেই আশ্চর্য গ্রাম, উচ্চতায় সেখানে সবাই ছোটো হলেও স্বপ্নে রয়েছে একটা সুবিশাল রূপকথার জগৎ। আর রয়েছে অন্তর্মুখী ভালোবাসার জেদ। (বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা)

যন্ত্র বিশ্বে মানুষে-মানুষে অথবা প্রাণীতে প্রাণীতে যে সম্পর্কহীনতা— এই স্যাটেয়ারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বুদ্ধদেব। সত্যের ভিতরের সত্যটাকে দেখাতে চেয়েছেন বারবার। সেই সত্যের ভিতর আসে সম্পর্ক, প্রেম, যৌনমিলন কিংবা নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব। ‘উত্তরা’ ছবিতে তাপস পাল এবং শংকর চক্রবর্তী অভিনীত চরিত্রদুটির দ্বন্দ্ব আসলে দুজনের মধ্যে নয়, নিজের, ভেতরের, যা চাপা। যা তারা প্রকাশ করতে চায় মেয়েমানুষের শরীরের মধ্যে দিয়ে। রাগ মেটাতে তারা কুস্তি লড়ে। এই কুস্তির মধ্যে আবার ভালোবাসা আছে। যেমন আছে তাদের বন্ধুত্বে। বন্ধুত্বহীনতায় ভোগে তারা। এ কি উভপ্রেম? সমপ্রেম? সেই ইঙ্গিতও রেখে দেন পরিচালক। (বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা)

‘উত্তরা’ ছবিতে বুদ্ধদেব তৈরি করেন নানান স্তর (Layer)। অর্থাৎ একই দৃশ্যে সমান্তরাল ভাবে দুটি আলাদা ঘটনা দেখানো হচ্ছে। ক্যামেরায় ধরা পড়ছে অমোঘ সেই দৃশ্য। যেমন উঁচু টিলার উপর কুস্তি লড়া দুটি চরিত্র এবং খানিক নিচে রাস্তা দিয়ে গান গাইতে গাইতে চলেছেন লোকশিল্পীরা। অর্থাৎ দুটি ভিন্ন ঘটনা জুড়ে গেল একটাই দৃশ্যে। নির্মিত হল দুটি স্তর। দুটি ঘটনাই যেন ইন্টারলিংক। এ ভাষা বুদ্ধদেবের নিজের। সেইসঙ্গে অবাক করা পুরুলিয়ার ল্যান্ডস্কেপ, একাকিত্ব।

৩০ অগাস্ট, ২০০০ সালে ‘উত্তরা’-র প্রিমিয়ার হয়েছিল ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে (Venice Film Festival)। এবং সেখানে পুরস্কারও পেয়েছিল। এরপর একে একে টরেন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, লস অ্যাঞ্জেলস প্যাসিফিক চলচ্চিত্র উৎসব, বুসান চলচ্চিত্র উৎসবেও দেখানো হয়। সেরা পরিচালনার জন্য ভারতে জাতীয় পুরস্কার (National Award) পান বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের প্রত্যেকটি ছবিই রাজনৈতিক, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই৷ পোড়া রাষ্ট্রে বাস করে যে জাদুবস্তবতার স্বপ্ন বুদ্ধদেব দেখেছিলেন, তার সিকিভাগ ধিকিধিকি আগুন থেকে যাক আমাদের চোখেও। তাঁর চোখের বাইরের দুনিয়ার সৌন্দর্য সুন্দর হলেও, চোখের ভিতর বড়োই নির্মম। যা দেখছি তা কি সত্যিই দেখছি? নাকি কারোর চাপিয়ে দেওয়া সেই দেখা? নিজের দেখার সৌন্দর্যের মাধুর্য এই মহাবিশ্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। যা আমাদের বাঁচতে শেখায়। আর বেঁচে থাকার চেয়ে বড়ো রাজনীতি আর কী আছে?

মাস্টার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত অমর রহে…

Developed by DXDasia