
৮৮ বছরের পুরোনো কমলা সিনেমাহল আজ ইতিহাস হয়ে গেছে
বাড়তে থাকা জনঘনত্বের পুরুলিয়া শহরে হাতে গোনা কয়েকটি যে ফাঁকা মাঠ এখনও ঐতিহ্যবহন করে তার অন্যতম রাস ময়দান। স্বভাবতই শুষ্ক এই মাঠের মাঝামাঝি রয়েছে রাসমঞ্চ। মাঠের তিনদিকে রাস্তা আর একদিকে একটু এগোলেই শহরের আদিতম সিনেমা হল। শ্রীরাম চিত্র মন্দির। প্রতিষ্ঠা ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে। প্রায় ৮৮ বছরের পুরোনো এই হল সক্রিয় নেই বহুবছর হল। অথচ শহুরে আগ্রাসন এখনও গিলে না খাওয়ায় অক্ষত রয়ে গেছে স্থাপত্যটি। হলটির ভালো নাম শ্রীরাম চিত্র মন্দির হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে কমলা সিনেমা নামে পরিচিত। বাইরে থেকে দেখলে এখনও বোঝা যাবে না প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় বন্ধ রয়েছে স্ক্রিনিং।
পুরুলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাড়ার মধ্যে একটি ছিল রাসময়দান তল্লাট। স্থানীয় মানুষদের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল এই হল। লাগোয়া পানের দোকানের মালিক জানালেন, “হল তো বহুদিন চলে না, তবে গোটা পুরুলিয়ার গর্ব ছিল এই হল। এক নামে কমলা সিনেমা যে কেউ চলে আসতে পারত চোখ বুজে। দিনের পর দিন সিট ভর্তি হয়ে যেত। এখন তো আর হলে সেরকম কেউ সিনেমা দেখেন না। তাই লোকসানে উঠে গেছে। যদি লেখেন আমাদের কথাও লিখবেন। আমার এই দোকানও দু’দশক হল।”

রাখাল চন্দ্র নাগ নামক এক বাঙালি ব্যবসায়ীর হাতে প্রতিষ্ঠা এই হলের। ১৯৩১ সালে। সেই সময়ের তুলনায় যথেষ্ট বড়োই ছিল এই হল। পর্দাও নেহাত ছোটো ছিল না। দর্শকদের অভিযোগ ছিল না তেমন। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, প্রোজেকশন রুমের সামনে হলের যে অংশ তাতে একচিলতে খোলা জায়গা বাঁধানো রেলিং দেওয়া, তাতে ছিল গদির ব্যবস্থা। দুপুরের শো-এ বাড়ির মহিলারা এলে এই অংশে বাচ্চাগুলিকে শুইয়ে তাঁরা সিনেমা দেখতেন। এ এক অভিনব চিন্তা। আজ ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে যেখানে সাউথসিটির মতো মল-এ ব্রেস্ট ফিডিং-এর জায়গা নেই বলে বিতর্ক তৈরি হয় সেখানে আজ থেকে ৮৮ বছর আগে পুরুলিয়ায় একটি সিনেমা হলে শিশুদের শোয়ানোর জন্য এই ব্যবস্থার কথা কল্পনাতীত।
জন্মের অন্ধকার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দোতলা বাড়ি। তার পিছনে একটি লম্বা একতলা করিডোর, যার মাথায় এসবেস্ট্সের চাল। একসময়ের রমরমা ব্যবসায় এখন ঝুল বুনছে পরিত্যক্ত মাকড়সার দল। কমলা উঠে গেছে বহুদিন হল। ওই পাড়াতেই পরে তৈরি হয় নিউ সিনেমা। সেই হলও বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। এক ব্যবসায়ী কিনে সেখানে বাড়ি তুলেছেন বছর সাতেক। নিউ সিনেমার এখন আর কোনও অস্তিত্ব নেই। কমলাও আর কতদিন এভাবে থাকবে বলা মুশকিল। স্থানীয় লোকেদের আন্দাজ হয়তো কয়েকবছরে ভেঙে ফেলা হবে, নতুন কনস্ট্রাকশন উঠবে এখানে। কেবল স্মৃতি আর নামে রয়ে যাবে কমলা টকিজ। একটা স্নেহোজ্জ্বল পাড়ার মাঝে বুকে অন্ধকার নিয়ে জেগে থাকতে হবে না এই পুরনো বাড়িকে। হয়তো আসতে আসতে নামও মুছে যাবে। কেউ জানবে না এমন এক হলের কথা, কেউ লিখবে না কোত্থাও আর…
