এ’শহরের ইতিহাস লিখতে পারে উত্তর কলকাতার এই পুজোরা

সুভাষচন্দ্র জড়িয়ে ছিলেন কোনোটায়, কোনও পুজোর জন্মের আড়ালে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন

জমজমাটি বারোয়ারি পুজোর অন্তরঙ্গে ব্রিটিশ-কবল থেকে মুক্ত হওয়ার ডাক। উত্তর কলকাতার পুরোনো বারোয়ারি পুজোগুলোর অধিকাংশেরই জন্মের ইতিহাস এমনটাই। কোনও পুজোয় যুক্ত ছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসু। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে  ঐক্যবদ্ধ হতে চেয়েই কোথাও জন্ম নিল দুর্গাপুজো। কোথাও বা ইতিহাস খানিক আলাদা। অথচ রঙিন। পরম্পরা-ঐতিহ্যের পায়ের ছাপ এখনও স্পষ্ট সেখানে। উত্তর কলকাতার পুজো মানেই ইতিহাসের অলি-গলি বেয়ে হেঁটে বেড়ানো। এইসব পুজোর কারও কারও বয়স একশো পেরিয়েছে। কেউ-কেউ হয়তো বয়সে সামান্য ছোটো। কিন্তু, আসল সমাপতন ইতিহাসের দালানে। আজ তেমনই কিছু পুজোর গপ্পো। শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন, সিকদার বাগান সর্বজনীন, বৃন্দাবন মাতৃমন্দির কিংবা কুমোরটুলি সর্বজনীন— এইসমস্ত পুজোর শরীরেই লেগে আছে ফেলে আসা সময়ের আশ্চর্য সব নক্সা।

বৃন্দাবন মাতৃমন্দির

বঙ্গভঙ্গের পরে ব্রিটিশ-বিরোধিতা তখন আরও তীব্র হয়েছে বাংলার বুকে। এই শহরে বিপ্লবী-কর্মকাণ্ডও শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। এমনই প্রেক্ষাপটে উত্তর কলকাতায় জন্ম হল বারোয়ারি দুর্গাপুজোর। জমিদার-অভিজাত বাড়ির মন্দির-দালানের বাইরে এসে সকলের অধিকারের পুজো। সুকিয়া স্ট্রিটের পাশে বৃন্দাবন মল্লিক ফার্স্ট লেনে ‘বৃন্দাবন মাতৃ মন্দির’-এর দুর্গাপুজো কিংবা শ্যামবাজারের পাশে ‘সিকদার বাগান সর্বজনীন’-এর জন্মও এই ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদের গর্ভেই। একই ইতিহাস অবশ্য টালা বারোয়ারি কিংবা হাতিবাগান সর্বজনীনেরও। দুর্গাপুজোর অন্তরালেই তখন প্রবাহিত হচ্ছিল স্বাধীনতার চাহিদা। আর একটা তাগিদও অবশ্য ছিল বারোয়ারি পুজোগুলোর জন্মের পিছনে। তা হল, জমিদার-উচ্চবিত্ত গৃহস্থদের আওতা থেকে পুজোকে সবার অধিকারের উৎসব করে তোলা। বলা যেতে পারে, দুর্গাপুজোর ব্যাপক অর্থে সামাজিক উৎসব হয়ে ওঠার শুরু তখন থেকেই।

বৃন্দাবন মাতৃমন্দির

 ১৯১০ সাল। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবেই শুরু হল ‘বৃন্দাবন মাতৃ মন্দিরের’ দুর্গাপুজো। উৎসবের আবহে ব্রিটিশ-বিরোধিতার পাঠ। ‘মা’ সেখানে কোথাও গিয়ে যেন বা ‘দেশ’ও। তাই এই পুজোর নামে কোনও ‘ক্লাব’, ‘সংঘ’ লেখা নেই। শুধুই ‘মাতৃ মন্দির’। এই পুজোর ইতিহাস বলতে গিয়ে বারবার সেই স্বদেশি-যুগের কথাই ফিরিয়ে আনছিলেন শিবেন্দু। ‘বৃন্দাবন মাতৃ মন্দির’-এর অন্যতম সংগঠক। ঐতিহ্য তো শিকড়ে মিশে থাকে। তাই হয়তো, ‘থিম পুজোর’ প্রতিযোগিতায় মাথা গলিয়েও ‘বৃন্দাবন মাতৃ মন্দির’ নিজের একটা ঘরানা তৈরি করে নিয়েছে সযত্নে। কলকাতার বিখ্যাত পুজোগুলোর মধ্যে এই পুজোর বাজেট এখনও বেশ কম, ৫ লক্ষ টাকার গণ্ডি ছাড়ায় না কখনও। তার মধ্যেও, প্রতিবছর বাজেট থেকে টাকা বাঁচিয়েই কৃতী, প্রতিভাবানদের স্কলারশিপ দেওয়া হয় পুজো-কমিটির পক্ষ থেকে। এইবছর, সেই স্কলারশিপের পরিমাণ ২ লক্ষ টাকা। শিবেন্দু বলছিলেন, ‘আলোর রোশনাই আরেকটু কম হলে হোক। দরকারে আরো একটু কমুক মণ্ডপের জাঁক। কিন্তু এই স্কলারশিপের টাকা জোগাড়টুকু আমাদের দায়।’

সিকদার বাগান সর্বজনীন

১০৬ বছর বয়স হল সিকদার বাগান সর্বজনীনের। ‘স্বদেশি’ ইতিহাসের গন্ধ এই পুজোর শরীরেও লেগে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ ক্লাব ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল মোহনবাগান। তার দু’বছরের মাথায় পাশের পাড়ায় এই পুজোর জন্ম। আর, এই দুটি ঘটনার সমাপতনের মঞ্চটি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী-জাতীয়তাবাদ। সান্যাল পরিবার, দাস কোম্পানি পরিবার আর দত্ত পরিবার—মূলত এঁদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই শুরু হল এই ‘সর্বজনীন’ উৎসব। একসময়, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন ছবি বিশ্বাস। পরে, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর মতো ব্যক্তিত্বও যুক্ত হয়েছেন এই শতাব্দীপ্রাচীন পুজোর সঙ্গে। উদ্যোক্তা সায়ক দাস বলছিলেন, কোনওদিন এই পুজোয় ছেদ পড়েনি, ঘটপুজোও হয়নি। উল্টে, এই পুজোর প্রতিমাকে ভাসানের সময় পথ ছেড়ে দিতে অন্যত্র সরে গেছে বাগবাজারের গৌরিমাতা উদ্যানের পুজো। এবারের থিম ‘বাবুয়ানি’। উত্তর কলকাতার জিনে একসময় জড়িয়েছিল শব্দটা। যদিও, সিকদার বাগানের পুজোর ইতিহাসে বাবুয়ানি নেই। বরং আছে, আরও অনেক বেশি গৌরবের স্মৃতি।

কুমোরটুলি সর্বজনীনের প্রতিমা, শিল্পী গোপেশ্বর পাল

 

বয়সে খানিক ছোটো হলেও ইতিহাস নিয়ে গর্ব কুমোরটুলি সর্বজনীনেরও কম নয়। ১৯৩১-এ জন্ম। ১৯৩৮ সালে এই পুজোর সেক্রেটারি হন সুভাচন্দ্র বসু। তার আগে এই পুজোর সেক্রেটারি ছিলেন স্যার হরিশঙ্কর পাল। ‘স্যার’ উপাধিতে লুকিয়ে ব্রিটিশ-আনুগত্যের গন্ধ। সুভাষচন্দ্র তাই এই পুজোতে যুক্ত হতে চাননি প্রথমে। কিন্তু, পুজোর সঙ্গে জড়িত অধিকাংশদের দাবি এড়িয়েও যেতে পারেননি শেষপর্যন্ত। এরপর, এক অদ্ভুত বিপদ হানা দেয় এই পুজোয়। পঞ্চমীর রাতে পুড়ে যায় একচালার দুর্গাপ্রতিমা। একরাতে প্রতিমা ফের কী করে বানানো সম্ভব! সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন কিংবদন্তী প্রতিমা-শিল্পী গোপেশ্বর পাল। অনেক কারিগর মিলে একরাতের মধ্যেই আলাদা আলাদাভাবে তৈরি করা হল দুর্গা-লক্ষী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ। কিন্তু, একচালা নয়, এবারে ঠাকুর হল চার-চালা। সেই প্রথমবার চার-চালার ঠাকুর হল কুমোরটুলিতে। যে চার-চালার ঠাকুরই এর পরে ‘ট্রেন্ড’ হয়ে উঠবে কলকাতার পুজোয়। তবে, এই চার-চালার জন্মের ইতিহাসটা এমনই আকস্মিক দুর্ঘটনার ফসল।

কুমোরটুলির পুজোয় অনেক ‘নতুন’ই দেখেছে কলকাতা। গোপেশ্বর পাল ঠিক করেছিলেন বাস্তবানুগ প্রতিমা বানাবেন। শুধু দেবদেবী নন, তাঁদের বাহনদেরও বানাবেন বাস্তবের মতো করেই। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। মাংস নিয়ে, ফটোগ্রাফার নিয়ে চলে গেলেন চিড়িয়াখানায়। ক্যামেরা রেডি করে মাংস ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিলেন সিংহকে। সিংহের ঝাঁপিয়ে পড়ার ছবি দেখে এরপর পুজোয় বানালেন মাটির সিংহ। পরে, পুজোয় অসুরের পেশিবহুল শরীর ফুটিয়ে তুলতে ব্যায়ামবিদ মনোতোষ রায়কে স্টুডিওয় ডেকে পাঠিয়েছিলেন শিল্পী যতীন পাল। এমনই কত বিচিত্র ইতিহাস কুমোরটুলি সর্বজনীনের পুজোকে ঘিরে।

 

শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন

আর, ইতিহাসকে ঘিরেই বেঁচে আছে কলকাতার সবচাইতে পুরোনো বারোয়ারি পুজো ‘শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন’। ১০৯ বছর বয়স হল সাবেক সুতানুটির এই পুজোর। কয়েকজন পাজি ছেলে মিলে পাড়ার এক বাড়ির সামনে ফেলে গেছিল কার্তিক। পাড়ার লোকেরা মিলে ঠিক করেন সবাই মিলে সেই কার্তিকপুজো করবেন। সেই ‘সর্বজনীন কার্তিকপুজো’র পরেই মাথায় আসে, এবার দুর্গাপুজো করলে কেমন হয়? সেই ইচ্ছে থেকেই জন্ম এই বারোয়ারি দুর্গাপুজোর। শুরুতে নাম ছিল শ্যামপুকুর বারোয়ারি। পরে নাম বদলে শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন। এই পুজোয় জন্মলগ্ন থেকেই জড়িয়ে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাতি সুরেশচন্দ্র সমাজপতি কিংবা বিখ্যাত ফুটবলার সন্তোষ মজুমদার(ছোনে)-এর মতো ব্যক্তিত্বরা। তবে, শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীনের প্রাণপুরুষ বলা যেতে পারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে। কিংবদন্তী কণ্ঠ্যশিল্পীর ঘরের পুজো এটি। কলকাতার সবচাইতে পুরোনো পুজো বলেই হয়তো পরম্পরাকে আজও টাল খেতে দেননি উদ্যোক্তারা। এখনও প্রতিমা হয় সাবেকি একচালার। শিউলি ফুলের বোঁটার রঙে প্রতিবার সেজে ওঠেন প্রতিমা। প্রতিমার কাঠামোও একই থাকে প্রতিবছর। মণ্ডপে থিমের বাহার লেগেছে, কিন্তু বদলায়নি পুজোবেদীর মাপজোক। মূল বেদীর উচ্চতা সাড়ে পাঁচ হাত, উচ্চতা চোদ্দ পোয়া। আরও একটা আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য আছে এই পুজোয়। এখানে দুর্গাকে পুজো করা হয় বৈষ্ণব মতে। পুজোর ভোগ রান্না করেন পাড়ার মহিলারা। প্রতিমা-শিল্পী আর ঢাকিরা বংশপরম্পরায় ফিরে-ফিরে আসেন শ্যামপুকুরের এই পুজোয়। প্রতিমা বিসর্জন হয় কেবল কাশী মিত্র ঘাটেই। ঐতিহ্য যেন বারবার তার জন্য পেতে রাখা আসনে এসে বসে পুজোর কদিন। সবটা মিলিয়ে এই পুজোচত্বরে পা রাখলে সেই চলে যাওয়া সময়টা আপনাকে জড়িয়ে ধরবেই। সাবেক কলকাতার, তার পুজোর কত বাহারি গল্পের খোঁজ আপনি পেয়ে যাবেন গলিপথের দেওয়ালে কান পাতলে।

উত্তরের দুর্গাপুজোর গল্পগুলো এমনই। এখানে ভক্তিরসের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায় দেশ-স্বাধীনের স্বপ্ন। মানুষের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠার ইচ্ছে দানা বাঁধে বারোয়ারি ঘিরে। আর, তার সঙ্গে আরও কত ইতিহাসের রং, স্রোত। কলকাতার ইতিহাস লিখতে বসলে এই শহরের দুর্গাপুজোর গল্প এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। থিম পুজোর জাঁকে সেই সাবেক গল্পগুলো মুখ লুকিয়েছে হয়তো। কিন্তু, কে না জানে, ইতিহাস কথা বলে। শুধু কান পেতে রাখা জরুরি। উত্তর কলকাতার অলি-গলির এইসব পুজোরা হল ইতিহাসের সেই কান। অতএব, চলুন শোনা যাক… 

Developed by DXDasia