জন্মের শতবর্ষ পূর্তিতে প্রবাদপ্রতিম লোকশিল্পী অমর পাল

লোকশিল্পী হিসেবে তিনিই প্রথম আকাশবাণীতে গান গেয়েছিলেন

“দেখ ভালো জনে রইল ভাঙা ঘরে,
মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে।”

কী নির্মম সত্যি একথা। ১৯৮০ সালের এই গান দিয়ে এ দুনিয়ার চিরাচরিত রঙ্গের কথা বলে গিয়েছিলেন তিনি। সুরের জাদুতে তুলে ধরেছিলেন সমাজের চিত্রকে। জনপ্রিয় এই গানের পঙক্তিগুলো আজও ভোলেনি বাঙালি। সত্যজিৎ রায়ের জন্মের ১০১ বর্ষ নিয়ে শহর জুড়ে আলোড়ন চলছে, বাঙালি হিসেবে এ নেহাতই গর্বের। অথচ সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) বিখ্যাত ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’র (Hirak Rajar Deshe) বিখ্যাত গান “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়”-র সুরের জাদুকরকে কি ভুলতে বসেছে বাঙালি? এ প্রশ্নটা থেকেই যায়। ক্যালেন্ডার বলছে আজকের তারিখটা ১৯ মে। আজ সেই সুরের নায়কের জন্ম শতবর্ষ।  

লোকশিল্পী হিসেবে তিনিই প্রথম আকাশবাণীতে গান গেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে তাঁর গান প্রথম সম্প্রচারিত হয় রেডিওতে।

১৯২২ সালের বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবেড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন লোকশিল্পী অমর পাল (Amar Pal)।  মাত্র ১০ বছর বয়েসেই হারিয়েছিলেন পিতা মহেশ চন্দ্র পালকে। এরপর থেকেই শুরু তাঁর জীবনসংগ্রাম। দারিদ্রের সঙ্গে লড়তে গিয়ে অবশ্য সুরের জগত থেকে সরে আসেননি তিনি। অমর পালের লোকসংগীতের হাতেখড়ি মা দুর্গাসুন্দরী পালের থেকে। এরপর তিনি ৮ বছর ধরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছোটো ভাই আয়েৎ আলি খাঁ’র থেকে।

দেশভাগের পরে ১৯৪৮ সালে আকাশবাণীর (Akashvani) গীতিকার শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায়। এখানে বেঙ্গল মিউজিক কলেজের (Bengal Music College) অধ্যাপক মণি চক্রবর্তী, সুরেন চক্রবর্তী, ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে লোকসংগীতের তালিম নিতে থাকেন। তারপর আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে প্রথম গান এবং ধীরে ধীরে আকাশবাণীর গ্রেডের শিল্পীর সম্মান লাভ। লোকশিল্পী হিসেবে তিনিই প্রথম আকাশবাণীতে গান গেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে তাঁর গান প্রথম সম্প্রচারিত হয় রেডিওতে।

এভাবেই কিংবদন্তী শিল্পী হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়। অনেক রেকর্ডে গান গেয়ে, অনেক সিনেমায় প্লেব্যাক করে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছেন অমর পাল। প্রচুর গান গেয়েছেন রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। সত্যজিৎ রায় তো বটেই, দেবকীকুমার বসু থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণ ঘোষ পর্যন্ত একাধিক প্রজন্মের গুণী চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। তাঁর গান রয়েছে ‘সাগরসঙ্গমে’, ‘বাবা তারকনাথ’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘শিউলিবাড়ি’র মতো সিনেমায়। যদিও বিভিন্ন স্বাদের গান আমরা তার কণ্ঠ থেকে উপহার পেয়েছি, তবে, সারা বাংলাকে তিনি জয় করেছিলেন প্রভাতী আর ভাটিয়ালিতে। তাঁর গাওয়া “প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে”, “রাই জাগো রাই জাগো”-র মতো বহু গান আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে ‘সঙ্গীত মহাসম্মান’-এ ভূষিত করেছেন। লালন পুরস্কারও তিনি লাভ করেছেন রাজ্য সরকারের থেকে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডিলিট উপাধি। সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার সহ পেয়েছেন দেশ ও বিদেশের আরও অনেক সম্মাননা।

কঠোর সত্যি কথা দিয়ে গান বাঁধার অপরাধে চরণদাসকে মুখ-হাত-পা বেঁধে বনের মধ্যে গর্তে ফেলে দিয়েছিল হীরক রাজার পেয়াদারা। ভয়াবহ শাস্তি হবে জেনেও গান থামাননি চরণদাস। স্বৈরাচারী রাজার দরবারে গিয়ে শাসককে সেই গান শোনানোর সাহস দেখিয়েছিলেন। চরণদাসের গলার স্বর অর্থাৎ লোকশিল্পী অমর পালের সুরের ধ্বনি অত্যাচারী হীরক রাজাও থামিয়ে দিতে পারেননি। অথচ সময়ের কাছে তো আমাদের হাত-পা বাঁধা, তাই শেষ পর্যন্ত  হার মানতেই হল তাঁকে। ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। থমকে গেল এক অনন্ত সুরের যাত্রা।

Developed by DXDasia