ছিল তেজপাতা, হয়ে গেল ‘উপকারী’ বুকমার্ক! নেপথ্যে কলকাতার কলেজ পড়ুয়া প্রিয়াঞ্জলী সেন

তেজপাতা ছাড়াও সুকুমার-সত্যজিৎ-ভান গঘের অভিনব ‘কেমিস্ট্রি’ রয়েছে তাঁর তৈরি বুকমার্কে

কী থেকে যে কী হয়ে যাবে, কিছুই বলা যায় না সে ব্যাপারে। এই তো কিছুদিন আগের কথা। এতদিন যে তেজপাতাকে সাধারণত ভেষজ গুণসম্পন্ন হেঁশেলের সুগন্ধ-বর্ধক হিসেবে জানতাম, তার উপরে নিখুঁত আলপনা দেখে চোখ আটকে গেছিল একটি ফেসবুক পোস্ট-এ। কৌতূহলের বশে পোস্টটির ভূমিকা পড়ে এবং এর নেপথ্যে যিনি, তাঁর সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পারলাম…

প্রিয়াঞ্জলী সেন। থাকেন টালিগঞ্জের কুদঘাট এলাকায়। গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস কলেজের ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী। এবার ফাইনাল ইয়ার। পড়াশোনার ফাঁকেই ছোটোবেলার ভালোলাগাকে নতুন একটা আদল দিতে চান প্রিয়াঞ্জলী। তাঁর কথায়, “ছোটোবেলা থেকেই আঁকা শিখেছি, পরিবার সূত্রেই পাওয়া বলা যেতে পারে। আমার বাবা খুব ভালো ছবি আঁকে, হাতের কাজ চমৎকার। বাবাই প্রথম আঁকাআঁকির সঙ্গে আমার পরিচয় করায়।”

লকডাউনের ওই সময়টায়, বাড়তি সময় পেয়ে যখন অনেকেই তাঁদের ক্রিয়েটিভ দিকগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নিতে শুরু করেছিল, সেই সময় প্রিয়াঞ্জলীও ভেবেছিলেন ছোটো থেকে আঁকা শিখেছেন যখন সেই বিদ্যে কাজে লাগিয়ে ‘ইন্টারেস্টিং’ কিছু করা যেতেই পারে। সেই সুযোগও পেয়ে যান তিনি – হাতের কাছে পেয়ে যান গাছের পাতা। সমস্ত গাছের পাতারই নিজস্ব জ্যামিতিক প্যাটার্ন আছে কিন্তু, এত পাতা থাকতে তেজপাতাই কেন বেছে নিলেন তিনি? শিরোনামে কেনই বা লিখলাম ‘উপকারি’ বুকমার্ক?

প্রিয়াঞ্জলীর কথায়, “আমি দেখেছি গাছের পাতা ব্যবহার করে অনেকেই এখন বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক, শৈল্পিক কাজ করে থাকেন। একদিন কী মনে হল, বাড়ির কাঁঠাল গাছ থেকে ঝরে পড়া একটা পাতায় আঁকতে শুরু করি। সেটাই প্রথম। তারপর একের পর এক কাজ করতে থাকি। তেজপাতার আইডিয়া পাওয়াটা একটা মজার ঘটনা। আমার ছোটো পিসির বাড়িতে তেজপাতার একটা গাছ আছে। সেই পিসি মাকে একবার অনেকগুলো তেজপাতা দিয়ে যান। কাঁচা পাতা। মা প্রতিদিন যত্ন করে সেগুলো রোদে দিত। সেখান থেকেই আমি বড়ো বড়ো তিন চারটে পাতা তুলে নিই। সুন্দর করে আল্পনা এঁকে শুকিয়ে নিই। তারপর সেটা একদিন কী মনে করে বইয়ের পাতার ভাঁজে রেখেছিলাম, দেখলাম বেশ ভালোই লাগছে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তেজপাতার একটা বড়ো গুণ আছে, পোকা লাগা আটকায়। আমি ভাবলাম, বুকমার্ক হিসেবে এর থেকে ভালো আর কীই বা হবে!”

১

২

৩

৪

শুধু তেজপাতার বুকমার্ক নয়, তাঁর তৈরি বুকমার্কে রয়েছেন সুকুমার-সত্যজিৎ – ‘আবোল তাবোল’, ‘ফেলুদা’। বুকমার্ক ছাড়াও পোস্ট কার্ড, গ্রিটিংস কার্ড, পোস্টার এসবও বানাচ্ছেন প্রিয়াঞ্জলী। মগজাস্ত্র ব্যবহার করে সেসব কাজে অদ্ভুত ‘কেমিস্ট্রি’ তৈরি করেছেন। কখনও ভান গঘের ‘স্টারি নাইট’-এর সঙ্গে ‘সন্দেশ’ মিলিয়ে দিয়েছেন আবার, কোনোটায় মিলিয়ে দিয়েছেন পিয়ানো সুরের সঙ্গে ভালোবাসার কথা।   

প্রিয়াঞ্জলী সেন

যেহেতু সোশাল মিডিয়া একসঙ্গে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছনোর সহজ একটা মাধ্যম, তাই একটা সময় সিদ্ধান্ত নেন যে কাজগুলো এক এক করে প্রকাশ করবেন ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে। সেইমতো ফেসবুক পেজ (imperfections.01) খোলেন এবং শিল্পের কদর বুঝবে এরকম কিছু গ্রুপে শেয়ার করেন নিজের কাজ। দারুণ সাড়া মেলে। “বিশেষত তেজপাতার বুকমার্ক-এর জন্য বহু মানুষ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রচুর অর্ডার পাই। এখন আমি অন্যান্য পাতার উপরেও আঁকার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যেই অশ্বত্থ পাতা, কাঁঠাল পাতার উপরে কাজ করেছি। আরও কী কী পাতা আঁকার জন্য ব্যবহার করা যায় তার সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি।” বলছিলেন প্রিয়াঞ্জলী।

অশ্বত্থ পাতার উপরে করা প্রিয়াঞ্জলীর একটি কাজ

নিউটনের আগে গাছ থেকে কেউই আপেল পড়তে দেখেননি এমন তো নয়, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ সূত্রটি কারোর মাথায় আসেনি। আবিষ্কারের নেপথ্যে কাজ করে একটি অনুসন্ধানী বা কৌতূহলী মন। সেরকম ‘মন’ সকলের থাকে না। প্রিয়াঞ্জলী তাঁর অনুসন্ধান জারি রাখুন, পাতায় পাতায় নতুন ভাষার জন্ম হোক। শুভেচ্ছা রইল তাঁর আগামী কাজের জন্য।

 

 

Developed by DXDasia