
ইতিহাস কথা বলে প্রকৃতির সঙ্গে। উপরি পাওনা পাহাড়ি মানুষদের আন্তরিকতা…
১৭৭৪ সাল। বাংলায় মন্বন্তর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খাস দূত জর্জ বোগল চলেছেন তিব্বত। বক্সাদুয়ার হয়ে তিব্বতে ঢুকবেন তিনি। ‘ যে দেশটায় ঢুকতে যাচ্ছি সেখানে এর আগে কোম্পানির কোনও ভৃত্যের, কোনও ইউরোপীয়রই পা পড়েনি।’—লিখছেন বোগল। বক্সার দৃশ্য অবাক করে দিয়েছিল তাঁকে। পাহাড়, তার চুড়ো অবধি পাহাড়ি বন, স্বচ্ছ জলের ছোট্ট নদী, ঝর্না। প্রাকৃতিক অ্যাম্পিথিয়েটার থেকে ভেসে আসছে জলপ্রপাতের ধ্বনি। পাহাড়ে চড়ার আগে একবার পিছন ফিরে তাকান বোগল। টানা সমতলভূমি, বনের ভিতরে সামান্য ফাঁকা জায়গা, নদীর ধারে-ধারে। আর, এতদূর বয়ে আসা পথের সঙ্গে আশ্চর্য বৈপরীত্য সামনের পাহাড়ি-গন্তব্যের। বাংলা সরকারকে লেখা এক নোটে বোগল পরে প্রস্তাব দেবেন, বাংলা-তিব্বত অবাধ বাণিজ্যের স্বার্থে বক্সাদুয়ার ও আশেপাশের দুয়ার এলাকা দখল করে নেওয়া হোক। সে প্রস্তাব অবশ্য কার্যকর হয়েছিল আরও একশো বছর পরে, অ্যাংলো-ভুটান যুদ্ধের পর। বক্সাদুয়ার অন্তর্ভুক্ত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের।
ডুয়ার্সের পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ, মাথা-উঁচু বন, ঝিরি-হিরি নদীতে মুখ দেখা মেঘ এমনিতেই রহস্যের নেশা বুনে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু এরই পাশাপাশি যদি হাঁটতে থাকে ইতিহাস, তাহলে প্রকৃতি-সাম্প্রতিক-অতীত মিলেমিশে এক ঘোর বুনে দেবে নিশ্চিত। ডুয়ার্সের জয়ন্তী, বক্সা, লেপচা-খা এলে এই নেশাকে পাশ কাটিয়ে ফেরার উপায় নেই কিন্তু।

‘মেঘের গায়ে জেলখানা। বিশ্বাস হয় না? দেখে এসো বক্সায়।’ লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর ভারি বাহারি গদ্যে মায়া বেড়ে যায় আরও কয়েকগুণ। ‘স্টেশনগুলোর মজার মজার নাম। তিব্বতিদের দেওয়া। এককালে বাঘের উপদ্রব ছিল, নাম তাই বাঘডোগরা। হাতির অত্যাচার ছিল,তাই হাতিঘিষা। শিকারের ভালো জায়গা, নাম তাই নকসালবাড়ি।’ বইয়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতেই ট্রেন এসে থামবে আলিপুরদুয়ার। হিমালয় মাথা তুলবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে এই তল্লাটে। তবে, আকাশের গায়ে এখনও পাহাড় নেই। তার দেখা মিলবে খানিক এগোলে। এখান থেকে ৩০ কিমির মতো দূরত্ব বক্সার। জয়ন্তীর দিকে কিছুদূর গেলে সান্তালবাড়ি। গাড়িতে লাগবে মিনিট চল্লিশ। পাহাড় শুরু। এখান থেকেই ওঠা শুরু বক্সাফোর্ট, লেপচা খা-তে। পায়ে হাঁটা পাকদণ্ডি পথ। দু’পাশে নিঝুম অরণ্য। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ, আচমকা অন্যমনস্ক করে দেওয়া পাখির ডাক। পাখির স্বর্গরাজ্য এই গোটা অঞ্চল। মাঝেমাঝেই গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে চোখে পড়বে দূরে বিছিয়ে রয়েছে জয়ন্তী ও গদাধর নদী। চড়াই ভাঙার সব কষ্ট উড়িয়ে নেবে ঠাণ্ডা হাওয়া, এই দৃশ্য…

হাঁটতে হাঁটতে একসময় শেষ হবে পথ। সাকুল্যে কিলোমিটার পাঁচেক। সামনেই বক্সাদুর্গ। পাথরে তৈরি। আগে ছিল ভুটান-রাজাদের কাঠ ও বাঁশের তৈরি দুর্গ। সিল্ক-রুটের কিছু অংশের ওপর নজরদারি চলত এখান থেকে। এই দুর্গ ঘিরে কোচ আর ভুটান রাজাদের বিস্তর সংঘাতের ইতিহাস। পরে ব্রিটিশদের হাতে এলে পাথরের কলেবর পায় এই দুর্গ। ক্রমে এ-ই হয়ে ওঠে ব্রিটিশ আমলের অন্যতম দুর্গম জেলখানা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও বন্দি ছিলেন এখানে। রাজবন্দি। এখন অবশ্য দুর্গ বলুন বা জেলখানা—ভেঙে-চুরে গেছে প্রায় গোটাটাই। পাথুরে সিঁড়ির ধাপে পাহাড়ি বুনো ফুল। দেওয়াল ভাঙা। সেই ভাঙা অংশই হয়ে উঠেছে এক অলীক জানলা। ভিতরে ঝোপ-জঙ্গল। জেলখানার সামনের গরাদ নেই আর। তবু, একটা বুকচাপা সময় যেন এখানে এখনও থমকে। দূরে পাহাড়ের গায়ে বনের ল্যান্ডস্কেপ। বন্য জন্তু আছে কিনা প্রশ্ন করলে স্থানীয় মানুষেরা হাসেন। কেউ কেউ বলেন, বাঘ ছাড়ারও কথা হচ্ছে। কবেকার আদিমতা বুকে এখনও শায়িত হিমালয়।

আরও পড়ুন
দিন দুয়েকের ঝালং
এমনিতে বক্সা ছোটোখাটো একটা জনপদ। স্কুলবাড়ি থেকে স্থানীয় বাজার সবই রয়েছে এখানে। বক্সাফোর্টকে পাশে রেখেই একটা রাস্তা সোজা উঠে গেছে পামসায়। আই পামসা আলিপুরদুয়ারের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। পায়ে জোর থাকলে চাইলে ঘুরে আসতেই পারেন। পাহাড়-চুড়ো থেকে ডুয়ার্সের সবুজ হিমালয়ের দৃশ্য… অলীক।

তবে, যেতেই হবে লেপচাখায়। বক্সা থেকেই আরেকটা রাস্তা উঠে এসেছে এখানে। লম্বা চড়াই ভেঙে ঘন্টা দুই-আড়াই চললে তবেই দেখা মিলবে এই পাহাড়ি কন্যের। পথের মাঝে ক্লান্তি উপুড় করতে চাইলে দুদণ্ড জিরিয়ে যান ইন্দ্র থাপার বাড়ি। পাহাড়ি ঝাল লঙ্কা দিয়ে কষা পাহাড়ি মুর্গি খেলে খিদে-ক্লান্তি সব উধাও। গল্পে গল্পে আপনার দেরি করিয়েই ছাড়বেন ইন্দ্র থাপা। তাঁর কবল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে খানিক উঠলেই একটা প্যাগোডা। ব্যাস, আপনি পৌঁছে গেছেন লেপচাখায়। সামনে দিগন্তবিস্তৃত উপত্যকা, জয়ন্তী, সবুজ বনে ঘেরা পাহাড়। এখান থেকেই দেখা যায় পামসার চুড়ো। ওইপারে ভুটান।

লেপচাখায় থাকতে চাইলে চোখে পড়বে ইতি-উতি কয়েকটা হোম স্টে। রাজকীয় পরিষেবা মিলবে না, কিন্তু এই ভুটিয়া মানুষদের আন্তরিকতার দাম যে অমূল্য। মেঘ এসে নামবে পাহাড় চুড়োয়। ঢুকে পড়বে ঘরের ভিতরেও। আপনাকে ভিজিয়ে চলেও যাবে জানলা বেয়ে। রাতের জ্যোৎস্না-নিকোনো আকাশে অঢেল তারা। চাদরে গা ঢেকে আপনার তখন মনে পড়বে জর্জ বোগলের কথা। হয়তো বা তারও আগের স্বাধীন বেপরোয়া পাহাড়ি মানুষদের সাম্রাজ্যের কথা। হয়তো মনে হবে, এ কোনও স্বর্গরাজ্য আসলে। বন মুরগির রোস্ট আর স্থানীয় ভুটানি পিচ ওয়াইনে রাতের রূপকথা ঘন হবে আরও।

ফিরতে ইচ্ছে না করলেও ফিরতে হবেই। এই ফেরাগুলোর জন্যই আরও গাঢ় হয় পিছুটান। নামতে নামতে একপশলা বৃষ্টি এলে পিচ্ছিল হয়ে উঠবে পাথুরে পথ। হঠাৎই যেন অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পেয়ে যাবেন এই রাস্তায়। তারপর, এক্কেবারে ফেরার আগে সান্তালবাড়ি থেকে চাইলে ঘুরে আসতেই পারেন জয়ন্তী বা আলিপুরদুয়ার। বক্সা থেকে ট্রেক করেও আসা যায় জয়ন্তী। নদীর পাড়ে থাকার জন্য বনবাংলোয় রয়েছে। যদি একথালা চাঁদ ওঠে, তাহলে সেই আলোয় জয়ন্তীকে দেখে প্রেমে পড়ে যাবেন নিশ্চিত। ভেঙে যাওয়া একটা পুল, ওপারে বনের কালো রেখা আর স্রোতের শব্দ। কোথাকার কোন সমতলে পড়ে থাকা পোড়া শহরের কথা ভাবলে মনে হবে—জন্মান্তর…
কীভাবে যাবেনঃ
শিয়ালদা বা কলকাতা স্টেশন থেকে ট্রেনে আলিপুরদুয়ার। সেখান থেকে গাড়িতে সান্তালবাড়ি। বাকিটা হাঁটাপথ। বিমানে গেলে বাগডোগরা নেমেই গাড়ি নিতে হবে।
কোথায় থাকবেনঃ
জয়ন্তী, আলিপুরদুয়ারে থাকতে চাইলে বনবাংলো, হোটেল মিলবে। বক্সাতেও থাকার ঘর রয়েছে। লেপচাখায় মিলবে হোম স্টে। তাছাড়া, তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থাও করে দিতে পারেন স্থানীয় গাইড। অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমী হলে মন্দ লাগবে না।
যাওয়ার সেরা সময়ঃ
গোটা বছরই আসা যায় এই অঞ্চলে। তবে, বর্ষাকালে না আসাই ভালো।
